ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

দেশীয় পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে আন্তর্জাতিক দরপত্র নয়

দেশীয় পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে আন্তর্জাতিক দরপত্র নয়
×

শহীদ সেরনিয়াবাত ও জহুরুল ইসলাম

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:১৮ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও বিশ্ব এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত কয়েক দশকে বিপুল সক্ষমতা অর্জনকারী বাংলাদেশের মুদ্রণ শিল্পও পড়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রাণঘাতী করোনার কারণে এ শিল্প আজ কর্মহীন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি উপায় হতে পারে দেশের পাঠ্যপুস্তক দেশেই মুদ্রণ করা। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। দেশের সব পাঠ্যপুস্তক যদি দেশেই মুদ্রণ করা হয়, তাহলে তা দেশের মুদ্রণ শিল্পের জন্য হবে বড় প্রণোদনা। দেশের প্রায় সাত হাজার মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান এবং এর ওপর নির্ভরশীল প্রায় চার লাখ কর্মচারীর পক্ষ থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্যকন্যা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমীপে এটাই আমাদের আকুল আবেদন। এর মধ্য দিয়ে দেশীয় মুদ্রণ শিল্পের প্রতি অবিচার ও বঞ্চনারও অবসান হবে।

আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি- বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরই এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিগত ২০১০ শিক্ষাবর্ষ হতে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দেশের সব ছাত্রছাত্রী শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক হাতে পেয়ে আসছে। কিন্তু এই পাঠ্যপুস্তক প্রস্তুত করতে দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো গত ১১ বছর ধরে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। এ বিষয়ে কারও কাছে তার কোনো প্রতিকার না পেয়ে সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছেই আমরা আবেদন জানাচ্ছি।

সবাই জানেন, শুরু থেকেই মাধ্যমিক স্তরের (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত) পাঠ্যপুস্তক স্থানীয় দরপত্রের মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে সুসম্পন্ন হয়ে আসছে। কিন্তু প্রাথমিক স্তরের (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) পাঠ্যপুস্তক আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে মুদ্রণ করা হয়। দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও কেন আন্তর্জাতিক দরপত্র? আন্তর্জাতিক দরপত্রের কারণ হিসেবে আমাদের জানানো হয়, এ কাজে যৎসামান্য পরিমাণ অর্থায়নকারী দাতা সংস্থাগুলোর চাহিদা ও শর্ত।

আমরা মনে করি, যৎসামান্য অর্থায়নকারী দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্বাভাবিক ও অসম শর্তারোপের মাধ্যমে ১০০ শতাংশ খবরদারি আমরা জাতীয় স্বার্থে নীরবে সহ্য করতে পারি না। বস্তুত প্রতিনিয়ত তাদের প্রচেষ্টা থাকে বিদেশি কিছু চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান করা। দুর্ভাগ্যবশত এ কাজে এ দেশেরই কিছু কর্মকর্তা গোপনে সহযোগিতা করে থাকেন। অথচ আন্তর্জাতিক দরপত্রের অসম ও অস্বাভাবিক শর্তের অধীনেই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ৭৮ শতাংশ থেকে শতভাগ কার্যাদেশ পেয়ে যথাসময়ে মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দিয়ে সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

এমন বাস্তবতা উপলব্ধি করে সংশ্নিষ্ট প্রায় সবাই আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিলের পক্ষে মতপ্রকাশ করলেও মাত্র কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আগ্রহে এবং অবোধগম্য কারণে আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র ইতোমধ্যে আহ্বান করা হয়েছে। অথচ উচিত ছিল, দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বিবেচনায় সম্পূর্ণভাবে দেশীয় দরপত্র আহ্বান করা।

মনে রাখতে হবে, দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২০ শিক্ষাবর্ষে শতভাগ পাঠ্যপুস্তক যথাসময়ে ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে দিয়ে সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। দেশের কাগজের মিলগুলো মানসম্মত কাগজ সরবরাহ করে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। আগামী শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ বাবদ সমুদয় খরচ সরকার জাতীয় রাজস্ব তহবিল থেকে নির্বাহ করবে বিধায় কোনো দাতা সংস্থার শর্ত বা খবরদারি থাকার প্রশ্ন থাকে না।

এটাও মনে রাখতে হবে, প্রাণঘাতী করোনার কারণে বহু পণ্যের রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ায় সহায়ক মুদ্রণ সামগ্রীর সরবরাহ আদেশ বাতিল হয়েছে। ফলে দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে কর্মহীন ও আর্থিকভাবে বিপর্যয়ের মুখোমুখি। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও কবে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরে আসবে, আমরা জানি না।

এমন বাস্তবতায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় রাজস্ব ব্যয়ে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ কাজ আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশে চলে গেলে এ কাজের ওপর নির্ভরশীল কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন হবে। কাগজের মিলগুলো কাগজের বাজার হারাবে, কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাবে, সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাবে।

এ অবস্থায় আমাদের রুটি-রুজি এবং ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে আহূত আত্মঘাতী আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিলে প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা বিনীতভাবে কামনা করছি।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতি

আরও পড়ুন

×