অন্যদৃষ্টি
কার খাবার কে খায়
মীর আব্দুল আলীম
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:২৪ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মানুষ অসহায়, কাজ নেই, অনেকের ঘরে খাবারও নেই। এই সংকট মোকাবিলায় নিম্ন আয়ের মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে সরকার। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। গরিব মানুষের যাতে খাদ্যে সংকট না হয় এ জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু হতদরিদ্র কিংবা শ্রমজীবী অসহায় মানুষের ত্রাণ লুটপাটে বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন একশ্রেণির অসাধু জনপ্রতিনিধি, যাদের সঙ্গে প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্তাব্যক্তির জড়িত থাকার খবর পাওয়া গেছে সংবাদমাধ্যমে। প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে ত্রাণ চুরির ঘটনা। ওএমএসে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা। ওএমএসের চাল ও ত্রাণ চুরির সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাই সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধি- এই অভিযোগ পুষ্ট। যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুয়ারে দুয়ারে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর কথা বলেছেন, সেখানে এই চাল চোরের দল, ওএমএম ও ত্রাণের মাল লুটেপুটে খাচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে চাল চোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ বিষয়েও সরকারপ্রধানেরই দৃষ্টি রাখতে হয়! প্রশ্ন জাগে, তাহলে অন্যরা কী করেন?
কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। অভিযোগ ওঠা জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে তথ্যপ্রমাণসহ প্রতিবেদন চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকদের কাছে প্রেরণ করেছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে বরখাস্ত ও আটক করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে সরকার দফায় দফায় বাড়িয়েছে সাধারণ ছুটি। দীর্ঘদিন কাজকর্ম না থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছে দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ। শ্রমজীবী এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সরকার প্রশংসা কুড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত-দিন কাজ করে যাচ্ছেন। কতকের ক্ষেত্রে ত্রাণ বিতরণে কিছুটা ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। দেশের বেশ কিছু স্থানে কতিপয় ইউপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ত্রাণ বিতরণের নামে আত্মসাৎ করছেন। ওইসব অঞ্চলের দিনমজুর মানুষের মাঝে বাড়ছেই ত্রাণের জন্য হাহাকার। সরকারের মহৎ প্রচেষ্টা যাদের কারণে ভেস্তে যাচ্ছে, তারা জনশত্রু। তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর দণ্ড নিশ্চিত করতেই হবে।
কেবল এ দেশেই দুর্নীতি হয় তা কিন্তু নয়। পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি দুর্নীতি আছে। এই কথাটির আপেক্ষিক সত্যতা মেনে নিয়েও, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতির ব্যাপকতাকে অস্বীকার করার কোনো অজুহাত দাঁড় করানো যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই দুর্নীতি জনগণের মনে ব্যাপক হতাশাবোধের জন্ম দিয়েছে। দুর্নীতির এই থাবা থেকে কীভাবে মুক্ত হওয়া যায়, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে- কেন দুর্নীতি হয় বা দুর্নীতি বিস্তারের প্রক্রিয়া কীভাবে বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে সচেতন সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সার্বিকভাবে দেখলে দুর্নীতির ব্যাপকতার সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি সম্পর্ক আছে বলে প্রতীয়মান হয়। এই অবক্ষয় রোধ করতে হবে। কারও কারও কাছে এ ধারণা ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে যে, সমাজে নীতিবান হয়ে থাকার মাঝে কোনো গৌরব নেই বরং আছে বহু ভোগান্তি। সমাজের সুশীল অংশেও ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা পরিস্কার নয়। অন্যদিকে বেআইনি পথে থাকার সুবিধা রয়েছে অনেক। কারও কারও মনে এই ধারণা যত বিস্তৃত হচ্ছে, হতাশা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে আমজনতার বিরূপতা বেড়ে যাচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক সময় খেদোক্তি করে বলেছিলেন 'চাটার দল' সব চেটেপুটে খেয়ে ফেলেছে। আজকের বাস্তবতাও যেন তাই। সরকারের এত কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও থেমে নেই দুর্নীতিবাজরা। দুর্নীতিবাজ আর চোরদের দুর্গন্ধ আমাদের গায়ে আর না লাগুক। এদেশ হোক দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ। অসাধুদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারেই রয়েছে প্রতিবিধান।
সমাজকর্মী
[email protected]
