সমকালীন প্রসঙ্গ
আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
কাওসার চৌধুরী
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:২৫ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
সারাবিশ্বে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ফিরতে থাকে। তখনও বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো মানুষ শনাক্ত হয়নি। এমন একদিনে ইতালিফেরত যে যুবকটি ঢাকা বিমানবন্দরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে বাংলাদেশের 'সিস্টেম'কে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেছিলেন, জানি না তিনি এখন বাংলাদেশের কোন জায়গায় আছেন, কেমন আছেন! কামনা করি- তিনি ভালো থাকুন, সুস্থদেহে দীর্ঘজীবী হোন। যুবকটির সেই চিৎকারটি যদিও ছিল ভব্যতাবর্জিত; তবুও আমি বিষয়টিকে খুব বেশি খারাপ চোখে দেখি না। কারণ, তার সেই তীব্র চিৎকারে যতটা না ছিল প্রতিবাদ, তার চেয়েও বেশি ছিল ভয় তাড়ানোর অপচেষ্টা। আমাদের গ্রামদেশের জনজীবনে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন মানুষ রাত্রিবেলা এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে গান গাইতে গাইতে পথ অতিক্রম করত ভূতের (কুসংস্কার) ভয় তাড়ানোর উদ্দেশ্যে। ইতালিফেরত যুবকটির মাঝেও আমি তার ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। মানুষ সবসময় বড় কোনো ঝড়ের পূর্বে কিংবা দুর্যোগকালে মায়ের বুকে ফিরতে চায়। সেই যুবকটিও কিন্তু করোনা বিপর্যস্ত দেশ সুদূর ইতালি থেকে দল বেঁধে দেশে ফিরছিলেন বাংলাদেশের বুকে, মায়ের বুকে নিরাপদ আশ্রয় লাভের উদ্দেশ্যেই! দেশ তাকে ফেরায়নি।
বয়সকালে বিশাল স্বপ্ন নিয়েই মানুষ বৃহত্তর সুখের আশায় ঘর ছেড়েছে যুগে যুগে! এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব দেশ, সব জনপদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদের প্রবাসী মানুষগুলোর মাঝে বড় একটি অংশের মনোবাসনা কিন্তু ওরকমই! সুখের আশাতেই সাত সমুদ্দুর পাড়ি দেওয়া মানুষ ছুটেছে অচেনা-অজানা মাটিতে! ওখানে গড়ে তুলেছে কাঙ্ক্ষিত সুখের ঘর! কিন্তু 'সুখের লাগিয়া যে ঘর বাঁধিনু'- সেটা তো করোনার 'অনলে পুড়িয়া গেল'! সে কারণেই পৃথিবীর সব মানুষ ছুটছে তার নিজ নিজ মাটির কোলে। আমাদের প্রবাসীরাও তাই ফিরে এসেছে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রাস, স্পেন, আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি চীন থেকেও। কারণ কিন্তু একটিই- এই বাংলাদেশ, এই মাটি, এ তো 'আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি'! মৃত্যুর পরে আমি-আপনি তো শুধু সাড়ে তিন হাত মাটির মালিকানা নিয়েই এই পলিমাটিতে শুয়ে থাকব।
কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন- 'বিষণ্ণ আলোয় এই বাংলাদেশ/নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ/প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ-/এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি/যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো/আমি বিষপান করে মরে যাবো'।
মানুষ তাই ছুটছে এই 'সাড়ে তিন হাত ভূমির' কাছে- শেষ আশ্রয়ের প্রত্যাশায়, বাঁচার আশায়। আমাদের চিকিৎসক, নার্স কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীদের কথাই ধরুন না। এই যে তারা মরণব্যাধিকে চ্যালেঞ্জ করেও আর্তমানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা কোনো অর্থবিত্তের জন্য নয় নিশ্চয়ই! অর্থবিত্ত দূরে থাক- এই পরিস্থিতিতে উন্নত বিশ্বের অনেক ডাক্তার, নার্স কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীর অনেকেই যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন এই মরণব্যাধির কাছে, সেখানে মানুষকে সেবা করার মনোবৃত্তি নিয়ে সবাই নেমে পড়েছেন চিকিৎসাকর্মে- এটা কি কম কথা! যদিও চিকিৎসকদের একটি অংশ এখনও নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন সরকারের কাছে কিছু শর্ত এবং নানা দেনদরবার নিয়ে! এদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী গত ৭ এপ্রিল কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কভিড-১৯ মোকাবিলায় যেসব চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, তাদেরকে পুরস্কৃত করার কথা বলেন।
এর মাঝেই সাধারণ মানুষ সীমিত সম্বল নিয়ে দাঁড়িয়েছে লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র মানুষের পাশে। ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যক্তিপর্যায় থেকে ছোট সামাজিক সংগঠনগুলোও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে আর্তমানুষের সেবায়। শুধু মানুষের সেবাই নয়, অভুক্ত পশুপাখিদের খাবারের জোগানও দিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। কে বলে জাতি হিসেবে আমরা সচেতন নই, অগ্রসর নই!
সংবাদকর্মীরাও থেমে নেই কোথাও। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও সংবাদমাধ্যমগুলো চালু রেখে সারাদেশে তথ্য সরবরাহ গতিশীল রেখেছেন। কোথাও কারও ভুলভ্রান্তি-অনিয়ম দেখলেই সংবাদকর্মীরা খামচে ধরে তা শুধরিয়ে নিচ্ছেন যথাসম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা উল্টালেই দেখা যায়, দেশের সব স্তরের মানুষের সে কী আকুতি দেশের মানুষের জন্য! সেটা কি শুধু নিজেকে কিংবা তার স্বজনকে বাঁচানোর জন্যই? 'সাড়ে তিন হাত ভূমি' আজ আত্মোপলব্ধির গভীরতম স্তরে পৌঁছে দিয়েছে মানুষকে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাতের ঘুম হারাম করে করোনা প্রতিরোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যে 'প্রয়োজনীয় সামগ্রী' পৌঁছে দিচ্ছে আন্তরিকতায়, তার অন্যতম কারণটিও কিন্তু সেই বাক্যের মর্মার্থের মাঝেই নিহিত- এই মাটি এবং মানুষের জন্য ভালোবাসা।
জানা যায়, গত মার্চ মাসের শুরু থেকে সেই মাসের শেষাবধি কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি স্বদেশে ফিরে এসেছেন। এই বিশাল সংখ্যার মানুষের মাঝে শুধু অল্প সংখ্যক মানুষ বাদে বাকিদের কেউই প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকেননি। সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় চীন থেকে যাদের দেশে ফিরিয়ে আনে, তারা বাদে বাকিরা কেউই স্বইচ্ছায় প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা হোম কোয়ারেন্টাইনে গেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না! স্বদেশে ফিরে আসা প্রবাসীরা বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মেলামেশা করেছেন অবাধে। ফলে এই রোগের সংক্রমণ কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছে বলে অভিযোগ আছে। সত্যতা যাই হোক, আমরা এখন করোনাভাইরাসের কমিউনিটি সংক্রমণের শিকার হয়ে পড়েছি, এটাই বাস্তবতা!
এ রকম অবস্থায় আমাদের যা করণীয়, সেটা সরকারের পক্ষ থেকে বিরামহীনভাবে বলে দেওয়া হচ্ছে নানা মাধ্যমে। সেই নির্দেশনাগুলো আমাদের অবশ্যই মানতে হবে, যদি আমরা নিজের জীবনকে ভালোবাসি। মনে রাখা প্রয়োজন, এই ভূখণ্ডটি আমার আপনার সকলের। বাঁচা-মরা যাই হোক, আমার শেষ আশ্রয়স্থল কিন্তু এই বাংলাদেশ। এটা 'আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি'। এর কোনো বিকল্প নেই।
প্রামাণ্য চিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা
