ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

লকডাউন সমাপ্তির জটিল সমীকরণ

লকডাউন সমাপ্তির জটিল সমীকরণ
×

জনাথন ফ্রিডল্যান্ড

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:২৫ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সংবাদ সম্মেলন বা প্রতিদিনের ব্রিফিংয়ে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক নেতারা বারবার একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। আর তা হলো- লকডাউন পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটবে কবে? প্রশ্নটি আসলে অবান্তর। মনে করুন, দাবানলের কারণে বন থেকে বাইরে বেরিয়ে আসা ভালুকের ভয়ে একটি পরিবার কোনো এক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ সেখানে থাকার পর পরিবারটি বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। কিন্তু তারা ঠিক জানে না, কখন তারা বের হতে পারবে। তখন তারা জিজ্ঞাসা করবে, কখন ওই এলাকা নিরাপদ হবে? তাদের এই প্রশ্ন অনেক কঠিন। কারণ এর উত্তর আরও কয়েকটি প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে। যেমন :ভালুকগুলো বন্দি হয়েছে কিনা? যদি তা না হয়ে থাকে তাহলে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ওই পরিবারের কাছে যে অস্ত্র আছে তা দিয়েই ভালুককে ধ্বংস করার চেষ্টা হতে পারে। তবে, তার আগে ভাবতে হবে সুরক্ষার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আবার সেখানে ফেরত আসতে হবে কিনা?

একটা বিষয় পরিস্কার, গোটা বিশ্ব আজ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষ এর সমাপ্তি দেখার জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী লকডাউনে আটকে থাকা লোকদের মধ্যে অনেকের ঘরে খাবার নেই। অনেকেই মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাদের কাছে লকডাউন জেলখানার শাস্তির মতো। তাদের জন্য এ অবস্থার পরিসমাপ্তি হওয়া দরকার। সুতরাং এ অবস্থা থেকে বের হতে একটি কৌশল জরুরি। তার আগে লকডাউন কী এবং কেন, তা জানা দরকার। সাধারণত লকডাউনে সবাই বাড়িতে অবস্থান করে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে ধাপে ধাপে লকডাউন শিথিল করা হয়। এর পর আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসি। কিন্তু বর্তমানে যে লকডাউন চলছে, তা সাধারণ কোনো পরিস্থিতির কারণে নয়। চলমান লকডাউন যুদ্ধের মতো। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য করোনা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা কম রাখা। করোনা মোকাবিলায় প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এখনও লকডাউন অবস্থা বিরাজ করছে। ৯১ শতাংশ ব্রিটিশ লকডাউনকে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে এর বিকল্প ভাবার সময় এসেছে। তা হতে পারে ভ্যাকসিন। কিন্তু আমরা জেনেছি, তার জন্য অন্তত ১৮ মাস সময় লাগতে পারে। তাহলে বিকল্প উপায় কী হতে পারে? এখন পর্যন্ত গবেষকরা যা যা জানিয়েছেন, সেগুলোর সবই সামাজিক দূরত্বকে নির্দেশ করে। এর সঙ্গে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন করোনা পরীক্ষার ওপর।

এ ক্ষেত্রে একটি ভুল থেকে যাচ্ছে। তা হলো, কেবল উপসর্গ দেখে পরীক্ষা করা। অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী পাউল রোমার বলেছেন, প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের করোনা টেস্ট করা উচিত। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো জরুরি সেবায় নিয়োজিত যেমন ফার্মাসিস্ট, পুলিশ সদস্য, বাসচালক, শিক্ষক ও রেস্টুরেন্ট কর্মীদেরও করোনা টেস্ট করা দরকার। রোমার মনে করেন, যাদের মধ্যে করোনার উপসর্গ রয়েছে, তারা টেস্ট না করে স্বউদ্যোগে আইসোলেশনে যেতে পারেন। এটি সংক্রামক ভাইরাস। সবার উচিত হবে এ ভাইরাসকে চিহ্নিত করা এবং এর সংক্রমণের মাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়া। এ অবস্থায় দোকান বা রেস্টুরেন্ট চালু করে লাভ হবে না। কারণ আতঙ্কিত মানুষ এসব স্থাপনায় যাবে না। ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নিকোলাস লকার যেমন লিখেছেন- আপনি ততক্ষণ লকডাউন তুলতে পারবেন না, যতক্ষণ ব্যাপকভাবে পরীক্ষা না করছেন।

নোবেলজয়ী রোমার অনুমান করেছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিদিন ২২ মিলিয়ন পরীক্ষার প্রয়োজন। প্রত্যেক আমেরিকানের প্রতি দুই সপ্তাহে একবার পরীক্ষা করার সময় এসেছে। অবশ্য যুক্তরাজ্যে সে অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। করোনা মোকাবিলায় অনেক প্রতিবন্ধকতাই স্পষ্ট। পরীক্ষা, কিটস্বল্পতা রয়েছে। এর পরও আক্রান্তদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক দিক থেকে এ বিষয়ে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এটা আমাদের স্বাভাবিক জীবনে যেতে সহায়তা করবে। যারা সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের সঙ্গে যাদের সংযোগ ঘটেছে তাদেরকে খুঁজে বের করে পরীক্ষা করতে হবে।

এটা সত্য যে, আমরা আজীবন লকডাউন পরিস্থিতিতে থাকতে পারব না। কিন্তু পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদেরকে এটা মানতে হবে। এ জন্য দরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। আর এটা এখনই গ্রহণ করা জরুরি।

গার্ডিয়ানের কলাম লেখক
গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত, ভাষান্তর :মো. সাইফুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×