ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রতিরোধে সবাই এগিয়ে আসছে না কেন

প্রতিরোধে সবাই এগিয়ে আসছে না কেন
×

আবু সাঈদ খান

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০১৯ | ১২:৫৯ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০১৯ | ০৩:০৩

ফকির লালন শাহের আরাধ্য ছিল মানবিক সমাজ। শত বছরের আগে তিনি বলেছেন, 'এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে/ যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রীষ্টান/জাতি গোত্র নাহি রবে।' এমন সমাজ হয়তো দূর অস্ত। তবে সম্প্রীতির সমাজে ঐতিহ্য আমাদের আছে। এখানে সব জাতি-ধর্ম-গোত্রের মানুষ এক মোহনায় মিলেছে। সুফি, বৈষ্ণব, বাউলরা গড়েছেন অসাম্প্রদায়িক মানসভূমি।

ধর্ম বিশ্বাস আমাদের আলাদা হতে পারে। কিন্তু আমরা সবাই এক দেশ-মায়ের সন্তান। আমাদের চেহারা-সুরতেও কোনো প্রভেদ নেই। এ প্রসঙ্গে একজন খাঁটি বাঙালি ও একজন খাঁটি মুসলমানের কথা বলতে চাই। নতুন প্রজন্মের অনেকে তাঁকে নাও চিনতে পারেন। তাঁর নাম ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌। তিনি একাধারে আরবি-ফার্সি; অন্যদিকে সংস্কৃত ও পালি জানতেন। আরও ১৫-১৬টি ভাষায় ছিল পাণ্ডিত্য। লম্বা দাড়িতে মুখমণ্ডল ঢাকা লোকটা কোরআনের তাফসির করতেন, নামাজে ইমামতিও করতেন। তিনি বলেছিলেন, 'আমরা হিন্দু বা মুসলমান সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। মা প্রকৃতি আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে তা ঢাকবার জো-টি নেই।' আমার মনে হয়, 'টাইম মেশিনে' আমরা যদি বড়জোর সাত-আটশ' বছর পেছন থেকে ঘুরে আসতে পারতাম! তখন হয়তো দেখা যেত যে, একই মায়ের স্তন্য পানরত দুটি সন্তানের একটির বংশধররা হিন্দু, অপর সন্তানের বংশধররা মুসলমান। সে যাই হোক, এ দেশের স্বাধীনতার জন্য হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে একসঙ্গে ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে লড়েছি; পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছি। লালন-মাইকেল-রবীন্দ্র-নজরুল-জসীমউদ্‌দীন-জীবনানন্দ আমাদের সবার। এখানে মুসলমান পীরের দরগায় হিন্দু নর-নারী মানত করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজায় মুসলমান যুবকরাও আনন্দে মেতে ওঠে। মুসলমানের ঈদে হিন্দু ও অন্য সম্প্রদায়ের প্রতিবেশী ও বন্ধুরাও আমন্ত্রিত হয়। বড়দিন ও বৌদ্ধ পূর্ণিমাও একইভাবে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার'- এটি আজ আর কেবল স্লোগান নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। হিন্দু ও মুসলমানের সম্প্রীতির অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। হবিগঞ্জের একটি গ্রামে মানুষ একই চত্বরে হিন্দু ও মুসলমানের মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করেছে। একই সঙ্গে শ্মশান ও গোরস্তান। ভোলার বোরহানউদ্দিনের একটি মন্দিরের মেঝেতে খোদিত বাণী-'হিংসা ছাড়রে ভাই/মসজিদ মন্দিরে প্রভেদ কিছু নাই/উভয় স্থান ভক্তগণের/উপাসনার ঠাঁই।'

ক'দিন আগে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্কার সাময়িকীতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলেছেন, 'হিন্দুত্ববাদী চিন্তায় যে ধরনের সংকীর্ণতা আছে, বাংলাদেশের মুসলমানদের চিন্তায় সেই ধরনের সংকীর্ণতা নেই। আমার মনে হয়, বহুমুখী পরিচয় বাংলাদেশের জন্য উপকারী হয়েছে। ভারতে যতদিন পর্যন্ত বহুমুখী পরিচয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংকুচিত করার উদ্যোগ ছিল না, ততদিন সে দেশও বাংলাদেশের মতো উদার ছিল।'

অমর্ত্য সেনের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল ৬ অক্টোবর। এর দুই সপ্তাহ না পেরোতেই ভোলার বোরহানউদ্দিনে একি ঘটল! হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা হলো। যে মন্দিরে সম্প্রীতির বাণী খোদিত ছিল, সে মন্দিরেও দুর্বৃত্তের তাণ্ডব চলল। এটি প্রথম নয়, ইতোপূর্বে কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, যশোরের অভয়নগর, সিলেটের ওসমানীনগর, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। রামু, নাসিরনগর, ওসমানীনগর ও গঙ্গাচড়ার ঘটনার মধ্যে মিল আছে। পার্থক্য শুধু এটুকু- কোথাও সংখ্যালঘু যুবকের ফেসবুকে কাবা শরিফ বা নবীর (সা.) অবমাননাকর ছবি ট্যাগ করা হয়েছে, কোথাও-বা ফেসবুক হ্যাক করে তা করা হয়েছে। এসব ঘটনা দুর্বৃত্তদের কাজ। সরাসরি রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নেই। তবে এসবের পেছনে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দল তো বটেই, এমনকি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। আরও দুঃখজনক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধ ক্ষমতা দিন দিন কমছে।



একদা হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধ বাধিয়েছিল ইংরেজ শাসক। 'ভাগ কর শাসন কর' নীতি নিয়েছিল। সেই ফাঁদে পা দিয়েছিলেন দেশীয় রাজনীতিকরা। এই বিরোধের ভয়াবহ পরিণতির কথা আমরা জানি। ১৯৪৬ সালে কলকাতা, নোয়াখালীসহ নানা স্থানে ভয়াবহ ও বীভৎস দাঙ্গা হয়েছিল। একদিকে হিন্দু গুণ্ডা, অন্যদিকে মুসলমান গুণ্ডারা যে নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে, তা এখনও পড়তে গিয়ে বারবার চোখ ভিজে যায়। তবে ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানি শাসকের পরিকল্পিত দাঙ্গা রুখে দিয়েছিল বাংলার অসাম্প্রদায়িক জনতা। তখন ঢাকার সব দৈনিক পত্রিকা একযোগে সম্পাদকীয় লিখেছিল, 'পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও'। পূর্ব বাংলা রুখে দাঁড়িয়েছিল। রাজনীতিক, ছাত্র-শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, কেরানি, দোকানি সবাই মিলে দাঙ্গাবাজদের মোকাবিলা করেছিলেন। দাঙ্গা ঠেকাতে প্রাণ দিয়েছিলেন বেগম রোকেয়ার ভাবাদর্শে বেড়ে ওঠা, তাঁর ভাগনে লেখক-গবেষক আমির আলী চৌধুরী। ১৯৭১ সালেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা মুক্তিসংগ্রামকে ব্যর্থ করে দিতে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ উস্কে দিয়েছিল। তাতে কাজ হয়নি।

মনে পড়ে, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আগে স্বৈরশাসক এরশাদ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে কূটকৌশলে মুসলিম সেন্টিমেন্টকে উস্কে দিয়েছিলেন, গুণ্ডা লেলিয়ে মন্দিরে হামলা চালিয়েছিলেন। তখন সংগ্রামরত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বাম নেতাকর্মীরা একযোগে মোকাবিলা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক যে, এখন এমন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ নেই। তদুপরি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় সংশ্নিষ্টতার প্রমাণ মিলছে। গত ২০ অক্টোবর বোরহানউদ্দিনে সংঘটিত হামলায় যুবদল ও শিবিরের নেতাদের নেতৃত্ব দেওয়ার ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। বোরহানউদ্দিনে পৌর যুবলীগের আহ্বায়কের ছোট ভাইও গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তানটি কেন মিছিলে গিয়েছিলেন? তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কেনই-বা সমাবেশ-মিছিলের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল? বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের ফেসবুক হ্যাক করে নবী (সা.) সম্বন্ধে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, বিপ্লব তা পুলিশকে জানান। এটি যে দুই মুসলিম যুবকের কাণ্ড, তা পুলিশ অবহিত হয়েছিল। বোরহানউদ্দিনের ওসি তা ধর্মীয় নেতাদের জানিয়েছিলেন। তারপর তাদের সমাবেশ-মিছিল করা কি যৌক্তিক ছিল? আর তা যখন করা হলো, তখন ওই দুই মুসলিম যুবকের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠল না কেন? নিশানা হলো হিন্দুরা। এটি অন্যায়। যুক্তির খাতিরে ধরে নিলাম, বিপ্লব অপরাধী। ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের দায় কেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর গড়াবে? এমন অন্যায় কোনো ধর্মই সমর্থন করে না। এটি অসৎ উদ্দেশ্যে যে করা হয়েছিল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

পুলিশ কেন অনুমতি দিল? বলা হচ্ছে, বিনা অনুমতিতে তারা মাইক লাগিয়েছিল। তা খুলে ফেলার ক্ষমতা কি পুলিশের ছিল না? যেখানে বিরোধী দলের সভার অনুমতি পেতে পুলিশের দরবারে বারবার ধর্ণা দিয়ে কাজ হয় না, সেখানে সভার আয়োজন দেখে অনুমতি দিয়ে দিলেন। আর ধর্মীয় নেতারা বললেন, কিছু হবে না। তাতে পুলিশ কর্মকর্তারা বিশ্বাস করলেন? আমরা জানতে চাই, কেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি-মন্দিরে পাহারা নিয়োগ করা হলো না? এর জবাব পুলিশকে দিতে হবে।

জবাব দিতে হবে জনপ্রতিনিধিদেরও। কী ভূমিকা নিয়েছিলেন তারা? পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে জেনেও স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আজম কেন এলাকায় গেলেন না? তার জবাবে বলেছেন, 'শুক্রবার থেকেই তিনি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। পুলিশ ও বিশিষ্ট আলেমদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিষয়টি স্পর্শকাতর উল্লেখ করে তিনি সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। ... সংঘাতের ঘটনা ছিল অপ্রত্যাশিত, চিন্তার বাইরে। ধারণা ছিল, বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে।' (প্রথম আলো, ২৪ অক্টোবর ২০১৯)। এমপির কথা বলে কথা!

বলা প্রয়োজন যে- জমি, লুটপাট বা ধর্মান্ধতার কারণে কেউ এমন ঘটনা ঘটাতে পারে। কিন্তু প্রতিরোধে সবাই এগিয়ে আসছে না কেন? তবে সবার মানবিক চেতনা কি ভোঁতা হয়ে গেছে? তা বলা যাবে না। অন্ধকারে আশার আলো দেখিয়েছেন এক দম্পতি। ২৩ অক্টোবরের ডেইলি স্টার হেলাল ও ফারজানা দম্পতির কথা লিখেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা প্রতিবেশীর বাড়ি রক্ষার চেষ্টা করেছেন। শেষ রক্ষা করতে পারেননি। তবু আমি মোহাম্মদ হেলাল ও ফারজানা ফেরদৌসীকে সালাম জানাই। ওই দিন যদি আশপাশের নর-নারীরা ওদের মতো এগিয়ে আসত, রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিরা যদি প্রতিরোধে সক্রিয় থাকত, তাহলে দুর্বৃত্তরা পালানোর পথ পেত না।

পরিশেষে বোরহানউদ্দিনের ঘটনার বিচার ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। চাই সব মানুষের নিরাপদ বাংলাদেশ।

সাংবাদিক ও লেখক
[email protected]



আরও পড়ুন

×