ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার দীর্ঘ ছায়া

নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার দীর্ঘ ছায়া
×

আহমদ রফিক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০১৯ | ১২:৫৭

বাংলাদেশি সমাজ পচেগলে একসারা হয়ে গেছে। দিনের পর দিন পৈশাচিক নিষ্ঠুরতার কাহিনি প্রকাশিত হচ্ছে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে এবং তা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিতে, নানা পেশার মানুষের মধ্যে। শিক্ষিত-অশিক্ষিতে কোনো ভেদাভেদ নেই। নানামুখী স্বার্থের প্রধান- হোক তা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা পূরণ কিংবা রাজনৈতিক বিরোধিতা বা ভিন্নমত। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতার প্রকাশ অবিশ্বাস্য মাত্রায়।

পাঠকদের স্মরণ থাকতে পারে, বছর কয়েক আগে পরপর কয়েকটি শিশু হত্যা, কিশোর হত্যার ঘটনা- মিথ্যা অভিযোগে পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে (পাম্প করে) অমানুষিক বর্বরতায় হত্যা। সেসব হত্যার দৃশ্য উপভোগ করেছে হত্যাকারীর সমর্থক মানুষজন।

একই সময়ে অনেক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা, যা এখনও চলছে অবিশ্বাস্য বর্বরতায়। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় একটা না একটা বীভৎস খবর চোখে পড়বেই। ছাত্রী বা তরুণী ধর্ষণ, গৃহবধূকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ। কখনও তরুণ বা যুবক, কখনও বয়স্ক মানুষ এ বর্বরতার অপরাধে যুক্ত।

এ কোন বাংলাদেশি সমাজ দেখছি আমরা? আর এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা? কেউ নির্বিকার, অধিকাংশ মানুষ ক্ষুব্ধ। কেউ প্রতিবাদে সোচ্চার। কিন্তু প্রতিকারের পথ খুঁজে পাচ্ছে না। সাময়িক আন্দোলন, মানববন্ধন কিছুই সমাজে প্রভাব ফেলছে না। মানবিকবোধ একেবারে উধাও।

সম্প্রতি বুয়েটে সংঘটিত আবরার হত্যার বর্বরতা শুধু বুয়েটসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী করে তোলেনি, বাংলাদেশি সমাজকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছে। ছাত্রদের প্রতিবাদী বিক্ষোভে আন্তরিক সমর্থন জানিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা- তিনি 'মর্মাহত, ব্যথিত, দুঃখিত'। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাদের শাস্তি হবেই।

তা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে- বুয়েটের সর্বোচ্চ প্রশাসন নির্বিকার, অনড়, অটল। যে ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলকে পর্যন্ত নাড়া দিয়েছে, জাতিসংঘসহ ব্রিটেন ও জার্মানি নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের দলিতমথিত হওয়ার ঘটনায়- সে প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও দায়িত্বহীনতার দায় স্বীকার না  করে বুয়েটের উপাচার্য বহাল তবিয়তে তার ক্ষমতার চেয়ারে আসীন। নীরব শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

দুই.

আবরার হত্যার রাজনৈতিক বর্বরতার জের কাটতে না কাটতেই সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় তুহিন মিয়া নামে ছোট্ট একটি শিশুকে বর্বর পৈশাচিকতায় হত্যা রোমহর্ষক ঘটনা হিসেবেই প্রকাশ পেয়েছে। শিশুটিকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তার পেটেও ছুরির গভীর আঘাত।

সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল যে শিশু, সে কি কখনও ভাবতে পেরেছিল যে, তারই জনক ও পিতৃব্যরা মিলে তাকে নৃশংস নিষ্ঠুরতায় হত্যা করতে পারে এবং হত্যা করে মৃতদেহ বাড়ির পাশে কদমগাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখতে পারে? কিন্তু পেরেছে মানুষ নামের গুটিকয় পিশাচ চরিত্রের অমানুষ। হিংস্র পশুর সঙ্গে তুলনা চলে না এদের। কারণ এরা ভেবেচিন্তে, হিসাবনিকাশ করে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এমন এক অবিশ্বাস্য নারকীয়

ঘটনা ঘটিয়েছে।

বেশ কিছুদিন থেকে বাংলাদেশে সামাজিক দূষণ ও অপরাধপ্রবণতা এক অবিশ্বাস্য মাত্রার শিখর ছুঁয়েছে। অর্থবিত্ত, প্রাপ্তি ইত্যাদি কেন্দ্র করে লোভ-লালসার প্রকাশ এবং গুম, হত্যা, নির্যাতনের মতো ঘটনা তো আকসার ঘটছে এবং তা শ্রেণি নির্বিশেষে। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা- সচ্ছল উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের বখে-যাওয়া তরুণী পরিকল্পিতভাবে তার মা-বাবাকে খুন করেছিল।

আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে প্রতিহিংসাজনিত খুন, অর্থবিত্তপ্রাপ্তির লোভে খুন, তর্ক-বিতর্কে সহপাঠীকে খুন, চলন্ত বাসে ধর্ষণ শেষে তরুণী খুন বাংলাদেশের সমাজচিত্রটিকে দিনের পর দিন কলঙ্কিত করে চলেছে। আর বাসের হেলপার? তিনি তো এক শক্তিমান সম্রাট।

সম্প্রতি একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় দুই কলামব্যাপী সংবাদ শিরোনাম : 'ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি/চাকার নিচে কলেজছাত্র'। ঘটনা গাজীপুরে। ছাত্রদের সঙ্গে গাড়ির হেলপারদের এই তর্ক-বিতর্ক আজকের নয়, বহুদিনের। এ ক্ষেত্রে কলেজছাত্রটির অর্ধেক ভাড়া দিতে চাওয়া নিয়ে তর্কের জেরে বাসের হেলপার (চালকের সহকারী) ছাত্রটিকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। বাসের চাকায় পিষ্ট ছাত্রটি মারা যায় (১৬.১০.২০১৯)। বাসচালক ও সহকারীদের এ জাতীয় নিষ্ঠুরতা দীর্ঘদিন ধরে চললেও এর প্রতিকার দেখা যায় না। পরিবহন খাতে স্বেচ্ছাচারিতা, অনাচার ও নিষ্ঠুরতা যেন এক সামাজিক প্রতিকারহীন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

কিন্তু বহু নিষ্ঠুরতাকে ছাড়িয়ে গেছে আবরার হত্যার ঘটনা। সম্ভবত ছাড়িয়ে গেছে সুনামগঞ্জে বাবা-চাচার হাতে শিশু তুহিন হত্যার মতো পৈশাচিক ঘটনা। প্রতিক্রিয়ায় একজনের মন্তব্য- 'এরা কি জন্তু-জানোয়ার?' আমার বরাবরের বক্তব্য- পশু সমাজ নিজেদের মধ্যে এত নিষ্ঠুর নয়। এক শ্রেণির মানুষ জন্তু-জানোয়ারেরও অধম। তাদের কী নামে অভিহিত করা যায়, তা আমাদের জানা নেই। তাদের 'অমানুষ' বললেও তাতে বোধহয় সঠিক পরিচয় নির্ধারিত হয় না।

পিতার যে সস্নেহ হাত আদরে-সোহাগে শিশুসন্তানকে কোলে তুলে নেয় এবং সেটাই চিরকালীন সামাজিক রীতিনীতি ও বাস্তবতা; পিতার সেই হাত সন্তান হত্যার রক্তধারায় দূষিত- এমন ঘটনার কথা ভাবা যায় না। এ অপরাধের শাস্তি চরম দণ্ড তথা মৃত্যুদণ্ডও বোধহয় যথেষ্ট নয়।

তিন.

একটি সমাজ কতটা দূষিত হলে, কতটা অবক্ষয়ে জীর্ণ হলে, কতটা মানবিক মূল্যবোধহীনতায় নিষ্ঠুর হলে এ জাতীয় ঘটনা সম্ভব তা হিসাব করে মেলানো কঠিন। আমাদের প্রশ্ন, কেন, কী কারণে এ সামাজিক অস্থিরতা? কেউ বলেন, সুশাসনের অভাব; কারও মতে, অপরাধের বিচারহীনতা, সমাজে অপরাধ ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির মতো বহুবিধ কারণ সমাজকে অস্বাভাবিক ও অস্থির করে তুলেছে। সুস্থ চিন্তা, ন্যায়নীতিনিষ্ঠ আচার-আচরণ নির্বাসনে গেছে। তাই সমাজে নৈরাজ্য প্রাধান্য পেয়েছে বলে মানুষের আচরণে স্বাভাবিকতা হারিয়ে গেছে। গেছে অনেকের ক্ষেত্রে।

সামাজিক অস্থিরতার পটভূমিতে বাংলাদেশি সমাজে এক শ্রেণির মানুষের এই অস্বাভাবিক আচরণই সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্র, তরুণ, রাজনৈতিক কর্মী থেকে বয়স্ক মানুষ এ অস্বাভাবিকতা থেকে মুক্ত নয়। শিক্ষায়তনগুলোতে সুস্থ পরিবেশের অভাব। ধর্মীয় শিক্ষায়তনগুলো পর্যন্ত দূষণ ও দুর্নীতিতে ভারাক্রান্ত। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীর  নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড তো ঘটনার একটি, সিন্ধুতে বিন্দুবৎ।

এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দরকার যেমন একদিকে রাজনৈতিক সুশাসন, সুবিচার ইত্যাদি; তেমনি দরকার সুস্থ, আদর্শবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার-প্রচেষ্টা। আদর্শবাদী তারুণ্যকেই এ ক্ষেত্রে অগ্রচারীর বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। তা না হলে এ নৈরাজ্য চলতে থাকলে স্বাভাবিক সমাজব্যবস্থার সুস্থতা একসময় ভেঙে পড়বে। আমরা কি সেই ভয়ানক দিনটির জন্য অপেক্ষা করব?

শিশু তুহিন হত্যা সম্পর্কে একটি সংবাদ শিরোনাম :'মানুষ এত নিষ্ঠুর হয়!' না, মানব স্বভাব বা মানব প্রকৃতি ও মানবধর্ম তা বলে না। কেউ হয়তো একে নিষ্ঠুরতার বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে চাইবেন। কিন্তু অনুরূপ বা সমচরিত্রের ঘটনা কিন্তু কম নয়। এগুলো সমাজে অস্বাভাবিক পরিবেশ প্রভাবের পরিণাম- এক ধরনের ব্যাধির বিস্তার। দ্রুত এ অস্বাভাবিকতার আবর্জনা সাফ করার কাজে হাত লাগানো অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক
রবীন্দ্র গবেষক, কবি

আরও পড়ুন

×