জেলহত্যা দিবস: স্বজনের স্মৃতি
বাবার দেওয়া রঙিন কলমগুলো
রওশন আখতার রুমি
রওশন আখতার রুমি
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০১৯ | ২২:৫৩
আমার বাবা এএইচএম কামারুজ্জামানের কথা সব সময় মনে পড়ে। ৩ নভেম্বর বিশেষ করে মনে পড়ে। ওই দিন আরও তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে বাবাকে হারিয়েছিলাম আমরা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক অবস্থায় ঘাতকদের বুলেটে শহীদ হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান। নিজেদের হাতে স্বাধীন করা একটি দেশে কেন তাদের এভাবে প্রাণ দিতে হলো? তারা তো নিজেদের জীবনের সোনালি সময় দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ গড়ে তোলার মহান ব্রত নিয়েছিলেন। তারপরও তাদের খুন হতে হলো। তাও আবার জেলের ভেতর! এখন মনে হয়, বাবাকে আর কিছুদিন যদি বেশি পেতে পারতাম!
আমার বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, তখনও তাকে যে খুব কাছে পেয়েছি, এমন নয়। তিনি ছিলেন সবার, জনগণের। আলাদা করে পরিবারকে দেওয়ার মতো সময় তার ছিল না। সব বাড়িতে যেমন একজন 'গৃহকর্তা' থাকেন, আমাদের বাড়িতে তেমন ছিল না। রাজশাহীর বাড়িতে পারিবারিক আবহও কতখানি ছিল, এখন ভাবতে অবাক লাগে। সব সময় সব ধরনের মানুষ আসত, যেত। আমরা বাবাকে আলাদা করে পেতামই না।
আমাদের পরিবার কয়েক প্রজন্মের রাজনীতিক। ছোটবেলা থেকে সেই শিক্ষায় মানুষ হয়েছিলেন বাবা। তিনি যেন দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তিনি যেহেতু নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, দলের কাজে তাকে গোটা পাকিস্তান চষে বেড়াতে হতো। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর বাসায় দূরে থাক, রাজশাহীতেই বেশি সময় থাকতে পারতেন না। তাহলে আমাদের মানুষ করেছে কে? মা এ ব্যাপারে সব দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজের আদর্শ বাবা এমনভাবে মায়ের মধ্যে গ্রথিত করে দিয়েছিলেন যে, তিনি একই সঙ্গে মা ও বাবার ভূমিকা নিতে পারতেন। আমি বাবাকে বরং বেশি কাছে পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় অবস্থানকালে।

তাজউদ্দীন আহমদের পরিবারসহ আমরা একই ভবনে থাকতাম। বাবা অফিসের কাজ, সভা সেরে অনেক রাতে বাসায় আসতেন। আমি তখন এইট-নাইনে পড়া ছাত্রী। তবু বাবা যতক্ষণ ফেরেননি, জেগে থাকতাম। বাবার জন্য প্রতীক্ষার বিষয়টি আমাকে কেউ বলে দেয়নি। আমি নিজেই ভালোবাসতাম বাবার জন্য জেগে থাকতে। তিনি এলে আমি দরজা খুলে দিতাম। মনে পড়ে, প্রায় প্রতিদিনই তার হাতে কাগজ-কলম থাকত। দরজা খুলে দিতেই তিনি সেগুলো আমার হাতে তুলে দিতেন। সেই কলমগুলোর কথা এখনও মনে আছে। নানা রং ও আকারের নানা ধরনের কলম। আমি কলমগুলো জমাতাম। বাবার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ওই স্মৃতিটুকু আমার জীবনে যেন সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে আছে। বাবা প্রতিদিন ফিরছেন আর আমার হাতে কলম তুলে দিচ্ছেন– ওইটুকুই আমার মন ভরিয়ে দিত। বাবার কাছ থেকে নিয়ে জমানো নানা রঙের অনেক কলম– এই স্মৃতি খুব মনে পড়ে।
বাবা মেয়েদের খুব আদর করতেন। চেয়েছিলেন আমরা চার বোন যেন নিজস্বতা নিয়ে বেড়ে উঠি। বলতেন, জীবন-জগৎ সম্পর্কে সচেতন হও। মানবিক বোধ তৈরি হোক। তিনি সব জায়গায় মেয়েদের নিয়ে যেতে পছন্দ করতেন। সবচেয়ে বেশি সঙ্গী হতো আমার ছোট বোন কবিতা জামান চুমকী। সে বাবার সবচেয়ে প্রিয় ছিল। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি যখন কলকাতা থেকে ঢাকায় আসবেন, তখনও চুমকীকে নিয়ে এসেছিলেন। দেশের পরিস্থিতি ভালো নয় তখনও, নানা দুর্ঘটনা ঘটছে; কিন্তু বাবা চুমকীকে সঙ্গে করেই রাখতেন। বঙ্গভবনে সভা করছেন, পাশের কক্ষে হয়তো চুমকী বসে আছে। তাদের দু'জনের বোঝাপড়াও খুব বেশি ছিল। বাবা হয়তো বলছেন, 'চুপা'। চুমকী বুঝত যে, বাবা তার কাছে পানি চাইছেন।
মেয়েদের নিয়ে মজা করতেন বাবা। একদিন ফিরে দেখেন, চুমকী শুয়ে পড়ছে। বললেন, চুমকী বোধ হয় ঘুমায়নি। ঘুমালে তো পা উঁচু করত। চুমকী সত্যি সত্যি একটি পা উঁচু করল! আমরা সবাই খুব মজা পেয়েছিলাম। বাবা সব সময় মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসে খেতেন। এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। একদিন খেতে বসে বললেন, চুমকী, গামছা নিয়ে আসো। সে কিছু না বুঝেই গামছা আনল। তখন বাবা বললেন, তরকারিতে এত ঝোল! গামছাটা পরে বাটিতে নামতে হবে! সবাই হাসছিলাম খুব। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর আমাদের সব হাসি নিভিয়ে দিয়েছিল। দেশ হারিয়েছিল বঙ্গবন্ধু ও তার চার সহচরকে। আমরা হারিয়েছিলাম একজন উদার, মানবিক, রসবোধসম্পন্ন বাবাকে।
লেখক: এএইচএম কামারুজ্জামানের কন্যা