নেপালে বিপর্যয়
জীবিত উদ্ধারের আশা ফিকে হচ্ছে
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০২:২২ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০২:২৩
হিমালয়ের কোলঘেঁষা উপত্যকায় নিস্তব্ধতা ভেঙে নেমে আসা আকস্মিক বন্যার পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে। চারদিকে এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ আর হারানো স্বজনের আর্তনাদ। সেখান থেকে কাউকে জীবন্ত খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শেষ। তবুও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ভূগর্ভস্থ টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকদের বেঁচে থাকার অলৌকিক আশা ছাড়ছেন না স্বজন ও উদ্ধারকারীরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, গত ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল ও চীনের তিব্বতে ভয়াবহ এই দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা এক হাজার ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। নিখোঁজ অন্তত সাড়ে চার হাজার মানুষ।
ঘটনার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নেপালের জাতীয় জরুরি পরিচালনা কেন্দ্রের (এনইওসি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফণীন্দ্র পাউডেল আশা ছাড়ছেন না। তিনি বলেন, ‘জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা দিন দিন ফিকে হচ্ছে। তবু আমরা প্রার্থনা করছি, আশা ছাড়ছি না। আশাই তো বেঁচে থাকার আলো।’
বর্তমানে উদ্ধার অভিযানের মূল কেন্দ্রবিন্দু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ভূগর্ভস্থ টানেল। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আমশু কিরণ শাহি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওয়ার হাউসগুলোয় সুরক্ষিত কক্ষ থাকে এবং সেখানে এক সপ্তাহের জন্য বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানি মজুত রয়েছে। তাই অন্তত চারটির মতো প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকরা এখনও বেঁচে আছেন বলে দৃঢ় বিশ্বাস কর্তৃপক্ষের।
বিশেষ করে ত্রিশূলী-৩-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পাইপ দিয়ে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। যাতে ভেতরের শুষ্ক ও নিরাপদ স্থানে কর্মীরা শ্বাস নিতে পারেন। টানেলের এই জটিল উদ্ধারকাজে যুক্ত রয়েছে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ধারকারী দল।
তিব্বত অংশে উদ্ধারকাজ জোরদার
সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অংশে এ পর্যন্ত ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজের তথ্য পাওয়া গেছে। চীন অবশেষে নেপালের সঙ্গে সংযোগকারী একমাত্র গিরোং সীমান্ত সড়কটি পুরোপুরি চালুর ব্যবস্থা করেছে। ফলে প্রথমবারের মতো ভারী এক্সক্যাভেটর, ডিজিটাল লাইফ-ডিটেক্টর ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের দল দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ ও আতঙ্কে শিশুরা
বন্যাপ্লাবিত রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার বেঁচে যাওয়া মানুষরা এখন তাদের গুঁড়িয়ে যাওয়া বাড়িঘরের ছাইভস্মে শেষ সম্বলটুকু খোঁজার চেষ্টা করছেন। নুয়াকোটের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৪৫ বছর বয়সী শান্তা সুনার নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি আর আমার স্বামী এক পোশাকে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়েছি। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা নিজেদের ভাগ্যবানের কাতারে রাখব। কারণ, আমরা বেঁচে আছি।’
এদিকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, বন্যায় বেঁচে যাওয়া শিশুদের ওপর চরম মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। চোখের সামনে সহপাঠীদের ভরা স্কুলবাস পানির তোড়ে ভেসে যেতে দেখা, ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হওয়া এবং চোখের সামনে প্রিয়জনদের হারানোর ভয়াবহ স্মৃতির কারণে অনেক শিশু গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কে ভুগছে।
নিখোঁজদের শেষকৃত্য ও স্বজনের শোক
এক সপ্তাহের দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজন হারানো মানুষগুলো মেনে নিতে শুরু করেছেন নিষ্ঠুর বাস্তবতা। হিমালয়ের কোলে ভেসে যাওয়া প্রিয়জনদের মৃতদেহ না পেয়েও শেষবিদায় জানাতে নেপালের রাসুয়া ও কাঠমান্ডুতে হিন্দু রীতি অনুযায়ী খড়ের পুতুল বানিয়ে শেষকৃত্য বা দাহ সংস্কার করা হচ্ছে। শত শত পরিবার শোক সামলে কাঠমান্ডুর মর্গের সামনে ডিএনএ নমুনা দিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছেন। যাতে উদ্ধার হওয়া বিকৃত লাশগুলোর মধ্য থেকে অন্তত নিজের মানুষটিকে চিনে নেওয়া যায়।
জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবিতে নেপালের কূটনৈতিক পদক্ষেপ
এই বিপর্যয়ের ক্ষত না শুকাতেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দিকে আঙুল তুলেছে নেপাল। বিশ্বের অন্যতম কম দূষণকারী দেশ হয়েও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এমন নিষ্ঠুর মাশুল দেওয়াকে মোটেও স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না তারা। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খেনাল জানিয়েছেন, এই ভয়াবহতার পর নেপাল আর কারও কাছে ‘ত্রাণ বা দান’ ভিক্ষা চায় না, বরং চায় জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছে নেপাল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিপূরণের দাবি পাঠিয়েছে।
- বিষয় :
- নেপাল