ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু 'অনুপ্রবেশকারী' অনর্থের মূল?

শুধু 'অনুপ্রবেশকারী' অনর্থের মূল?
×

আবু সাঈদ খান

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০১৯ | ১৪:৫০

রাজনীতির প্রচলিত পরিভাষা আছে। আবার প্রয়োজনে পরিভাষা তৈরিও হয়। পাকিস্তান আমলে 'ভোট কারচুপি' শব্দটি ব্যবহার হতো। স্বাধীন বাংলাদেশে আমদানি হয়- ভোট ডাকাতি, নীলনকশার নির্বাচন, মিডিয়া ক্যুর নির্বাচন ইত্যাদি। গণতন্ত্রের পাশাপাশি 'অভিজাততন্ত্র' ছিল, কিন্তু 'পরিবারতন্ত্র' সাম্প্রতিক সংযোজন। বাইরে কোথাও আগে ব্যবহার হতো কিনা- জানি না। আমাদের দেশে সম্প্রতি ব্যবহূত হচ্ছে।

রাজনীতিতে গুণ্ডা, ভাড়াটে গুণ্ডার ব্যবহার ছিল। আমরা পাকিস্তান আমলে এনএসএফের গুণ্ডা, মুসলিম লীগের ভাড়াটে গুণ্ডা বলেছি। আশির দশকে সমাজে ও রাজনীতিতে 'মাস্তান' শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এক সময় সংসারত্যাগী সাধুদের 'মস্তান' বলা হতো। সেটি নেতিবাচক শব্দে পরিণত হওয়ার পেছনে সম্ভবত বলিউডের অবদান। ইতিবাচক অনেক শব্দই সময়ের ব্যবধানে নেতিবাচক হয়ে যায়। একদা 'জঙ্গি' ও 'ক্যাডার' ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহার হতো। বাম নেতাদের বক্তৃতায় ঘুরেফিরে শব্দ দুটি আসত। এখন এই শব্দ দুটি নেতিবাচক মাত্রা লাভ করেছে। কে কী পরিচয় ধারণ করছে এবং সেই পরিচয় ব্যবহার করে কী কাজ করছে- এ কারণে ইতিবাচক শব্দ নেতিবাচক হয়ে যায়। রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটি ইত্যাদি অর্থবোধক ও ইতিবাচক শব্দ। কিন্তু একাত্তরে তা নেতিবাচক ও ঘৃণিত শব্দে পরিণত হলো। প্রসঙ্গক্রমে, মীরজাফরের অর্থ কি খারাপ? মীর মুসলমানদের মধ্যে সম্মানীয় পদবি- মানে দলপতি আর জাফর মানে জলের নহর। সেটি এখন হয়েছে বিশ্বাসঘাতক। ২০১৪-১৫ সালে যখন গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা চলল, তখন এলো 'আগুন সন্ত্রাস'। সামরিক শাসনামলে চালু হলো- ডিগবাজি, ডিগবাজি খাওয়া রাজনীতিক, দলবদলের রাজনীতি ইত্যাদি। ১৯৯১ সালে এলো 'মনোনয়ন বাণিজ্য'। 'পদ বাণিজ্য'ও শুনছি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচিত শব্দ- অনুপ্রবেশকারী।

আওয়ামী লীগ নেতারা অপকর্ম ও দুর্নীতির জন্য 'অনুপ্রবেশকারী'দের দায়ী করছেন। দলের বিতর্কিতদের কথাও বলছেন। তবে প্রধান নিশানা- অনুপ্রবেশকারী। অনুপ্রবেশকারীদের তালিকাও প্রস্তুত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে কথিত কতিপয় অনুপ্রবেশকারীকে ক্যাসিনো কারসাজিতে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে অন্য দল থেকে এলেই তাদের অনুপ্রবেশকারী বলা হবে, তা ঠিক না।

অনুপ্রবেশকারী হচ্ছে- যারা গোপনে ঢুকে পড়ে। যেমন কোনো ব্যক্তি যখন এক দেশ থেকে আরেক দেশে কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রবেশ করে; তখন তাকে অনুপ্রবেশকারী বলা হয়। আর কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারে হলে অনুপ্রবেশকারী বলার সুযোগ নেই। দলের ক্ষেত্রেও এটি বিবেচ্য। যারা আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যোগ দিয়েছেন, যাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে দলে বরণ করে নেওয়া হয়েছে, এমনকি যাদের পদ-পদবিও দেওয়া হয়েছে, তাদের কি অনুপ্রবেশকারী বলা যায়?

পরিভাষা যাই হোক- এটি সত্য যে, আওয়ামী লীগের ছাতার নিচে জামায়াত-শিবির, সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত অপরাধীরা আশ্রয় নিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে অপকর্মে তারা পুরোনো নেতাকর্মীদের টেক্কা দিতে পেরেছে। তবে এমন 'কৃতিত্বের' পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো বড় নেতার আশীর্বাদ। তা না হলে এত তাড়াতাড়ি তারা এত পসার জমাতে পারত না। নবাগতদের ঠিকাদারি, সাপ্লাই বা অন্য কোনো কাজ পাইয়ে দেওয়ার গূঢ় রহস্য শুনেছিলাম আওয়ামী লীগ পরিবারের এক যুবকের কাছে। সে আক্ষেপ করে বলছিল, তার জন্য নেতারা কিছু করেন না। কাজ বাগিয়ে দেন জামায়াতিদের (আসলে জামায়াত থেকে যোগদানকারী)। বললাম, কারণ কী? জবাব তার ঠোঁটেই ছিল। সে বলল, 'আমার বাবা আওয়ামী লীগ করতেন, দাদা আওয়ামী লীগ করতেন। আমার কাছ থেকে নেতা কী করে পার্সেন্টেজ নেবেন? তাই নব্য আওয়ামী লীগারদের কাজ দিচ্ছেন। সেখান থেকে পার্সেন্টেজ পেতে অসুবিধা হয় না।' এটি একবাক্যে বলা যায় যে, প্রত্যেক নব্য আওয়ামী লীগারের দ্রুত উত্থানের পেছনে কোনো না কোনো বড় নেতার হাত আছে, আওয়ামী লীগের কিছু বনেদি নেতার ভূমিকা আছে। তাই কেবল কথিত অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে চলবে না, তাদের আশ্রয়দাতা নেতাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যারা একবার গডফাদারের আসনে বসেছেন, প্রয়োজনে তাদের নতুন করে শামীম, সম্রাট, মিজান খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না।

এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে- আওয়ামী লীগের শুদ্ধি অভিযান কতদূর যাবে, রুই-কাতলা ধরা পড়বে কিনা? সেদিন ক্ষমতাসীন বলয়ের এক নেতার মুখে শুনলাম, শুধু চুনোপুঁটি ধরলে চলবে না, রুই-কাতলা ধরেও থামা যাবে না, হাঙরও ধরতে হবে। এটি সাধারণ মানুষেরও কথা। মানুষের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান নিয়ে বড় ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছে। সেটি পূরণ না হলে জনমনে হতাশা বাড়বে, মানুষ হতোদ্যম হবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উন্নয়নেও। তাই সামগ্রিক বিবেচনায় শুধু 'অনুপ্রবেশকারী'ই নয়, দলের সব বিতর্কিত ও বিপথগামীদেরও চিহ্নিত করতে হবে।

একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, দুর্বৃত্ত কী কেবল আওয়ামী লীগে, অন্য দলে নেই? আছে তো বটেই। তবে যেখানে মধুর হাঁড়ি, সেখানেই মাছির ছড়াছড়ি। যেখানে ক্ষমতা, সেখানে দুর্বৃত্তদের প্রাদুর্ভাব। তাই ক্ষমতার বলয়ে আগে শুদ্ধি দরকার। এটি যথার্থ উপলব্ধি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তিনি দল থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। ক্ষমতাসীন দল শুদ্ধ হলে অন্যত্র অভিযান পরিচালনায় বাধা থাকবে না।

দেশের সামগ্রিক স্বার্থেই শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখা দরকার। আরও দরকার সেই ব্যবস্থা- যাতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত রাখা যায়। আর তা করতে হলে সর্বাগ্রে গণতন্ত্র চর্চার পরিধি বাড়াতে হবে। সব দল দেশে গণতন্ত্র চর্চার কথা বলছে কিন্তু দলগুলোতে গণতন্ত্র নেই- তা নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করছেন না। অথচ দলগুলোতে গণতান্ত্রিক উপায়ে সিদ্ধান্ত হয় না, কমিটিগুলোর সভা হয় না, নিয়মিত কাউন্সিল হয় না। কাউন্সিল হলেও কমিটি গঠনের এখতিয়ার কোনো দলে গঠনতান্ত্রিকভাবে বা রেওয়াজ মাফিক দলীয় প্রধান বা ঊর্ধ্বতন কমিটির প্রধানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। তখনই নেতানেত্রীদের হাতের ওপর দিয়ে সুবিধাবাদী ও দুর্বৃত্তরা ঢুকে পড়ে। বাদ যায় পোড় খাওয়া ও আদর্শবাদীরা।

যেখানে দলে গণতন্ত্র চর্চা হয় না, নেতারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করেন না, সেই নেতারা কী করে পার্লামেন্ট বা অন্যত্র গণতন্ত্র চর্চা করবেন? গণতন্ত্র একটি মূল্যবোধ, ধারণ ও লালন করার বিষয়। কেউ জন্মসূত্রে গণতন্ত্রী হন না। এটি অর্জন করতে হয়। রাজনৈতিক দলে যদি নির্বাচনের মাধ্যমে সর্বস্তরের কমিটিগুলোতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কর্মকর্তা নির্বাচিত হওয়ার বিধান থাকত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার কমিটির ওপর বর্তাত, নিয়মিত কাউন্সিল ও কমিটির সভা হতো; তাহলে সমস্যা অনেকাংশে কমে আসত, দুর্বৃত্তের উত্থান ঘটত না।

গণতন্ত্রায়ন দরকার প্রশাসনেও। আমরা ব্রিটিশের রেখে যাওয়া, পাকিস্তানের পালিশ করা প্রশাসন দিয়ে চলছি। এ যুগে তা কতটুকু উপযোগী? অনেকেই বলছেন, ডিজিটালাইজেশন করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার মনে হয়, কিছু অগ্রগতি হবে, সব হবে না। এ জন্য চাই রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্রায়ন। আর তা করতে হবে রাজনীতিকদেরই। রাজনীতিক বা জনপ্রতিনিধিরা যদি গণতান্ত্রিক চেতনায় শানিত না হন; সৎ, যোগ্য, মেধাবী না হন, আমলাদের চালানোর মতো পারদর্শী না হন; তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন হবে না। ব্রিটিশের ফেলে যাওয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে হবে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সংস্কারের ওপর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও নির্ভরশীল। তবে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের পাশাপাশি অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের কথাও ভাবতে হবে- সেটি আরেক প্রসঙ্গ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সঠিক জায়গা থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন, সেটি রাজনীতি। আগেও বলেছি- রাজনীতি ঠিক হলে অনেক কিছুই ঠিক হয়ে যাবে। তবে ঠিক করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

সাংবাদিক ও লেখক
[email protected]


আরও পড়ুন

×