ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি

পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি
×

আহসান এইচ মনসুর

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৭

গার্মেন্ট বা পোশাক শিল্প বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদন ও রপ্তানি খাত। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮৩ শতাংশ গার্মেন্ট পণ্য। আমরা এ শিল্পের ওপর কিছুটা অতিরিক্ত নির্ভরশীল। গার্মেন্ট শিল্প শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, সামাজিকভাবেও আমাদের উত্তরণে সহযোগিতা করেছে। শিল্পায়নে যেসব দেশ বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে, তারাও গার্মেন্ট শিল্প দিয়ে শুরু করেছিল। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আমরা গার্মেন্টেই আটকে আছি, পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারিনি। জাপান ও কোরিয়া ষাট থেকে সত্তরের দশকে এবং চীন ও ভিয়েতনাম অতি সম্প্রতি গার্মেন্টের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এই দেশগুলো গার্মেন্টের পরবর্তী ধাপে চলে গেছে। ভিয়েতনাম এখন সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করছে ইলেকট্রনিক্স পণ্য। এর পরিমাণ প্রায় ৭০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার। তারা গার্মেন্ট পণ্যও রপ্তানি করে, তবে সেটি বাংলাদেশের তুলনায় কম। তারা দ্বিগুণেরও বেশি ভিন্ন উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করছে। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম একই ধাপে ছিল। কিন্তু তারা এগিয়ে গেছে। বর্তমানে ভিয়েতনামের রপ্তানি ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মতো, যা বাংলাদেশের রপ্তানির ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি। আশির দশকে চীনও গার্মেন্ট রপ্তানি করত, এখনও করে। বর্তমানে দেশটি পৃথিবীর প্রায় ৩৫ শতাংশ গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি করছে। ৮ বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ৪০ শতাংশ। গার্মেন্ট দেশটির একটি বড় রপ্তানি পণ্য। কিন্তু চীন অন্যান্য পণ্য আরও বহুগুণে রপ্তানি করে। আমাদেরও ওই দিকে যেতে হবে। গার্মেন্টের ওপর অতি নির্ভরতা কমাতে হবে।

গার্মেন্ট আমাদের আগামীতেও সহায়তা করবে- সেটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, পরবর্তী রপ্তানি পণ্য কোনটি হবে তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। পাট থেকে আমরা গার্মেন্টে এসেছি। কিন্তু পরবর্তী ধাপে গার্মেন্টের মতো বা গার্মেন্টকে কোন পণ্যটি ছাড়িয়ে যাবে, তা এখনও চিহ্নিত হয়নি। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ১৩শ'র মতো পণ্য রপ্তানি হয়। কিন্তু আমরা নির্ভরশীল মাত্র কয়েকটি পণ্যের ওপর। বাকিগুলোর জন্য সেভাবে বাজার তৈরি করতে না পারায় রপ্তানির প্রসার ঘটেনি। এই ১৩শ' পণ্যের মধ্যে এমন এক হাজার পণ্য রয়েছে, যেগুলোর বাজার মাত্র ১ বা ২ মিলিয়ন ডলারের।



আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। সেগুলোর দিকে নজর দিতে হবে, কারণ আমরা আরও অনেক বছর এই গার্মেন্টের ওপরই নির্ভরশীল থাকব। এটিকে বাদ দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক চিত্র কল্পনা করা যায় না। গার্মেন্টের একটি সমস্যা হলো- রপ্তানি কমে যাওয়া। এটি একটু বৈসাদৃশ্যক এ কারণে যে, অতীতে যখন অর্থনৈতিক মন্দার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতো তখন তার প্রভাব বাংলাদেশের গার্মেন্টের ওপর পড়ত না। কিন্তু এ বছর বাংলাদেশের গার্মেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভিয়েতনাম ক্রমেই সুদৃঢ় অবস্থান গড়ছে। তারা অনেক পণ্য রপ্তানি করার পাশাপাশি গার্মেন্টেও বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থানে চলে এসেছে। দেশটি কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে। আমাদের যে নির্ভরতা সেটিকে বিবেচনায় রেখে গার্মেন্ট খাতের পতন ঠেকাতে হবে। এ খাত স্থবির হলে একপর্যায়ে ব্যাপক হারে বেকারত্ব বেড়ে যাবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি আরও অনেক বাড়বে। এতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান সামগ্রিক অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হবে।

গার্মেন্ট শিল্পের সম্ভাবনাকে বাড়াতে হলে দু'দিক থেকে নজর দেওয়া দরকার। এক. মধ্য ও দীর্ঘ পরিকল্পনা প্রণয়ন, দুই. স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ের অনেকগুলোই ইতোমধ্যে চিহ্নিত। আগে একটি ট্রাক এক দিনের মধ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে মালপত্র নিয়ে আসা-যাওয়া করতে পারত। কিন্তু এখন শুধু আসে অথবা যায়। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে সময় অর্ধেকে নেমে আসবে। সব পণ্যের জন্যই এটি প্রযোজ্য। আমাদের বন্দর পরিস্থিতিও ভালো নয়। জাহাজের শিপমেন্টে বেশ কয়েকদিন সময় লাগে, এগুলো পণ্য আমদানি ও রপ্তানির সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। কেননা, কতদিনের মধ্যে মালপত্র ডেলিভারি পাওয়া যাবে, সেই বিষয়টি ক্রেতাদের কাছে বিশেষভাবে বিবেচ্য। বাংলাদেশ থেকে যে পণ্য ডেলিভারি পেতে দুই থেকে তিন মাস লাগে সেই পণ্য যদি ভিয়েতনাম এক মাসের মধ্যে দিতে পারে, তাহলে তারা বেশি মূল্যে হলেও ভিয়েতনাম থেকেই পণ্য কিনবে। এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন দরকার।

পণ্য উৎপাদনে একটি বড় ব্যয়ের কারণ বিদ্যুৎ। বিদ্যুতের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এতদিন তারা স্বল্পমূল্যের গ্যাসে ব্যবসা চালাত, কিন্তু এখন আমদানি করা গ্যাস ও বিদ্যুতে তাদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আগামীতে যেন বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় থাকে, সে দিকটা দেখতে হবে।

আমাদের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে। আমরা নিশ্চয়ই চাই শ্রমিকরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি পাক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এতে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় দক্ষতা বৃদ্ধি। অর্থাৎ শুধু মজুরি বৃদ্ধি হলেই চলবে না, শ্রমিকদের অধিক উৎপাদন করার দক্ষতাও বৃদ্ধি করতে হবে। মজুরি ও উৎপাদনশীলতা সমান্তরাল রাখতে হবে। যদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি হয় তাহলে মজুরিও বাড়বে, আবার উদ্যোক্তারাও লাভবান হবেন। এখানে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। কারণ, চায়নিজরা একই সময়ে একই মেশিনে বাংলাদেশের চেয়ে দুই বা তিন গুণ বেশি পণ্য উৎপাদন করে। সুতরাং, দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর অবশ্যই নজর বাড়াতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতে সংকট সৃষ্টি হবে। আরেকটি বিষয় হলো- আগামীতে গার্মেন্ট খাত আগের মতো শ্রমঘন থাকবে না। বিভিন্ন ডিজাইন করবে কম্পিউটার, মেশিনেই সেগুলো কাটা হবে এবং সেলাই করা হবে। মেশিনগুলো চালানোর জন্য কয়েকজন সুপারভাইজার থাকবে মাত্র। আগে যেখানে ৫০ জন কাজ করত, সেখানে হয়তো ৫ জন কাজ করবে। এই পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ কতখানি প্রস্তুত তা আমরা জানি না। তবে সরকারকে অবশ্যই প্রস্তুত হতে হবে। কারণ, উৎপাদন খাতে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির যে বিচরণ শুরু হয়েছে, বাংলাদেশ তা গ্রহণ না করলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের দেশে বিদেশ থেকে বিনিয়োগ খুব বাড়ছে না। বিশেষ করে চীন থেকে যে ফ্যাক্টরিগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো বাংলাদেশে আসছে না। সেগুলো ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারে যাচ্ছে। এখানে আমাদের তৎপর হতে হবে। বিজিএমইএকেও উদার মনোভাব নিয়ে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আকর্ষণ করা উচিত। আমাদের দেশে বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সমস্যায় ফেলা হয়। বিভিন্নভাবে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও হয়রানিমূলক কার্যক্রম চালানো হয়। ফলে তারা ফেরত চলে যায়। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে না এলে আমাদের উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন হবে না। সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রপ্তানিমুখী উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু নীতি অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। গার্মেন্ট শিল্পে সফলতার মূল কারণ মুক্তবাণিজ্য সুবিধা। তাদের কোনো কর দিতে হয় না, যা অন্য খাতে আরোপ করা হচ্ছে। একই ধরনের সুযোগ দেওয়া হলে হয়তো গার্মেন্টের মতো অন্য কোনো পণ্যও বিশ্ববাজারে সফলতা পেত। যে উপায়ে গার্মেন্টে সফলতা এসেছে সরকারকে সেই উপায় অন্য খাতেও অবলম্বন করতে হবে।

মনে রাখা জরুরি, শুধু উপরোক্ত বিষয়গুলো বর্তমান বাজার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাবে না। ভবিষ্যতের জন্য এ বিষয়গুলো করতেই হবে। বর্তমানে রপ্তানি বাড়ার পরিবর্তে যেভাবে রপ্তানি পতন ঘটছে তার উন্নতিকল্পে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। রপ্তানি পতনের বেশকিছু কারণ লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে মন্দার একটি প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গেছে, যা বাংলাদেশের গার্মেন্টের ওপর প্রভাব ফেলেছে। কারণ, বাংলাদেশের ৬২ শতাংশ পণ্যই ইউরোপে রপ্তানি হয়। এ অবস্থায়ও ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে তাদের পরিসর বৃদ্ধি করছে। আমরা ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছি না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ দরকার। একই সঙ্গে আমাদের উৎপাদন ব্যয় কীভাবে জরুরি ভিত্তিতে সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়, সে দিকটা দেখা দরকার। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশ যা করে থাকে তা হলো এক্সচেঞ্জরেটের ডেপ্রিসিয়েশন বা মুদ্রার মূল্যমান হ্রাস। সেটি আমাদের সরকার এখনও করেনি। কিন্তু আমাদের সব প্রতিবেশী দেশই করছে। যেমন ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি। ফলে এ অবস্থা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এটি করা গেলে আমাদের রপ্তানি বাড়বে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসার পাশাপাশি বিনিয়োগও বাড়বে। সুতরাং সরকারকে শিগগির একটি সিদ্ধান্তে আসা দরকার। সরকার কিছু প্রণোদনা দিচ্ছে, শুধু প্রণোদনায় অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না।

স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ধরনের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ব্যাংকগুলোতে সুদের হার অনেক বেশি, বিদ্যুতের মূল্য ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী পোশাক পণ্যের মূল্য কমে যাচ্ছে। যদি এই বিষয়গুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য না আসে, তাহলে পোশাক শিল্পকে বর্তমান পর্যায়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগগুলো হয়তো এক বা দুই বছরের জন্য কিছু ভালো ফল দেবে, কিন্তু এই সময়ের মধ্যে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে রপ্তানিমুখী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট
[email protected]



আরও পড়ুন

×