আইনের আগে গোড়ায় নজর দিন
ড. সামছুল হক
প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৭
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বাস্তবায়নের শুরু (১৮ নভেম্বর) থেকেই আমরা দেখেছি,
পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এর বিরোধিতা করে আসছেন। বিভিন্ন জেলায় তারা ধর্মঘট
পালন করেন। কর্মবিরতির ডাক দেয় ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন
মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। অবশেষে বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান
খান কামালের সঙ্গে বৈঠকের পর তারা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। পরিবহন
মালিক-শ্রমিকদের ৯টি দাবির মধে তিনটি দাবি মেনে নিয়ে তাদের আগামী জুন
পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এমনকি বাকি দাবিগুলোও বিবেচনার কথা সরকারের তরফে
বলা হয়েছে। তার মানে আইনে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ঠিকভাবে পরিকল্পনা না নিয়ে,
ঘাটতি না মিটিয়ে আর জরুরি কিছু ব্যাপারের সমাধান না করেই যখন আইনটি কার্যকর
করা হলো, তখনই কিন্তু এ সমস্যাটা হলো। আইনটি জরুরি ছিল, এটা সত্য। আমি
সমকালে ৪ নভেম্বর লিখেছি, ৩৬ বছরের পুরোনো আইন যুগোপযোগী ছিল না। ফলে নতুন
আইনকে স্বাগত; কিন্তু নতুন আইনের আগে অবকাঠামো ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান
প্রয়োজন ছিল।
একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা কিন্তু সাংগঠনিকভাবে
ধর্মঘট শুরু করেননি। তবে তাদের ইন্ধন ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু
পণ্য পরিবহনে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিকরা সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েই
ধর্মঘট পালন করেন। তাদের এই জোর বিরোধিতার কারণটা হলো কাভার্ডভ্যানের আকার।
তারা যে আকৃতির কাভার্ডভ্যান ব্যবহার করেন, তার আইনগত অনুমোদন নেই। পুরো
পৃথিবীতেই কাভার্ডভ্যানের দৈর্ঘ্য ২০ ফুট অথচ বাংলাদেশে ২২ ফুট।
ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির যুক্তি, বিদেশে মেশিনের মাধ্যমে মালামাল
তোলা হয়। বাংলাদেশে শ্রমিকের মাধ্যমে মালামাল ওঠানামা করা হয়। তাই
কাভার্ডভ্যানের দৈর্ঘ্য ২০ ফুট থেকে বাড়িয়ে ২২ ফুট করা হয়। এখানে তো তাদের
দোষ দেওয়া যায় না। এখন যদি বলা হয় ২২ ফুট চলবে না, তাহলে হাজার হাজার
কাভার্ডভ্যান যাবে কোথায়? তার চেয়ে বড় কথা, এতদিন এই দৈর্ঘ্যেই তারা ফিটনেস
সার্টিফিকেট পেয়েছেন এবং বছরের পর বছর ধরে তারা চালিয়ে আসছেন। মালিকরা
সেখানে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন, তা দিয়ে ব্যবসা করছেন। এখন কীভাবে
গাড়ির বাড়তি অংশ কাটবেন? নতুন আইনে বলা আছে, আকৃতি পরিবর্তনের কারণে তিন
লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। তাহলে কর্তৃপক্ষ কেন এতদিন এ সমস্যা জিইয়ে রাখল?
বিষয়টি নিশ্চয় এ খাতের সংশ্নিষ্টরা জানতেন। বিআরটিএ কীভাবে তাদের অনুমোদন
দিল? তাহলে বলতে হচ্ছে, গলদটা কিন্তু গোড়াতেই হয়েছে। হয়তো কেউ একজনের
গাফিলতিতে এ অপচর্চা শুরু হয়েছিল। সেটিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে। এখানে
বিআরটিএ বা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না।
নতুন সড়ক পরিবহন আইনে গাড়ির অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত
জরিমানা রাখা হয়েছে। অথচ বৈধ পার্কিংয়ের জায়গা নেই। পার্কিংয়ের জায়গা না
রেখেই আমরা কীভাবে জরিমানা ধার্য করতে পারি? ধরুন, আপনার বাচ্চাকে গাড়িতে
করে স্কুলে দিয়ে আসবেন। কিন্তু তাকে নামাবেন কোথায়, সে জায়গাটি তো নেই।
বাধ্য হয়ে রাস্তায়ই নামাতে হবে। এখানে আমাদের শহর পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত।
রাজউক কেন সড়কের পাশে একটি স্কুলের অনুমোদন দেবে? ঢাকা শহরের মতো এমন
ম্যাগাসিটিতে কেন আলাদা টার্মিনাল থাকবে না? আমরা দেখেছি, প্রতিবেশী কলকাতা
শহরেই ২৯টি টার্মিনাল রয়েছে। সেক্ষেত্রে সেখানে আমাদের অবস্থান কোথায়!
আমরা নতুন গাড়ি, সিএনজি, স্কুটার, উবার ইত্যাদির রুট পারমিট দিচ্ছি; কিন্তু
তারা যাত্রী যে ওঠাবে-নামাবে, সে জায়গা তো দিচ্ছি না। আমাদের সড়কের সংকট,
পার্কিং অবকাঠামো নেই, এর মধ্যে আইন করে কতটা শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব! এসব
সংকট আগে নিরসন করলে, সেটা যদি কেউ না মানত, তখন তাদের জন্য অবশ্যই কঠোর
আইনে জরিমানা হতেই পারে।
আইনত হালকা যানের ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে ভারী যান চালানো যাবে না। অথচ
আমাদের চালকদের ভারী যানের লাইসেন্স নেই বললেই চলে। আমরা দেখেছি, ধর্মঘট
প্রত্যাহারের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মালিক-শ্রমিকদের যে
দাবিগুলো মানা হয়েছে তার অন্যতম হলো, চালকরা এখন যে শ্রেণির লাইসেন্স দিয়ে
গাড়ি চালাচ্ছেন, তা দিয়ে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত গাড়ি চালাতে পারবেন।
বর্তমানে হালকা যানের লাইসেন্স দিয়ে যারা বাস চালাচ্ছেন, তারা তা অব্যাহত
রাখতে পারবেন। প্রশ্ন হলো, এখন কেন তাদের এ দাবি মানতে হলো? এখানেও আমাদের
ঘাটতি প্রাতিষ্ঠানিক। বিআরটিএ জানে, কতজন চালকের কী ধরনের লাইসেন্স রয়েছে।
সংস্থাটি ঠিকই ভারী যানের অনুমোদন দিল অথচ চালকের বিষয়টি মাথায় নিল না।
তাদের নিশ্চয়ই জানা আছে, ভারী যান চালানোর মতো চালক নেই। হালকা যানের
লাইসেন্স দিয়েই বছরের পর বছর ভারী যান চালানো হচ্ছে। এখানে যে যার মতো
ম্যানেজ করে ফেলছে। বিআরটিএর ভারী যানের অনুমোদনের পাশাপাশি চালক তৈরিতে
বিআরটিএর মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলেছেন দূরপাল্লার
যানবাহনে দু'জন চালক রাখার কথা, সেখানে আমরা ঠিকমতো একজন চালকই পাচ্ছি না।
আমাদের সমস্যাটা আসলে আইনে নয়। আমরা তো পুরোনো আইনই ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে
পারিনি। সড়কে চলাচল করা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যানবাহনেরই ফিটনেস নেই। এর আগে
দেখা গেছে, প্রশাসন যখনই ফিটনেসবিরোধী অভিযান চালিয়েছে, তখনই অধিকাংশ গাড়ি
গর্তে লুকিয়েছে। তারপর যখন মানুষের দুর্ভোগ শুরু হয়, গণতান্ত্রিক সরকার তখন
পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। আবার চলতে শুরু করে লক্কড়-ঝক্কড় বাস। বুধবার
সরকারের সঙ্গে বৈঠকে আমরা এও দেখলাম, ফিটনেস হালনাগাদ না থাকা গাড়ির
প্রযোজ্য জরিমানা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।
রাজধানীতে যেভাবে গাড়ি চলছে, তাতে সড়কে শৃঙ্খলা আসবে না। এত মালিককে এক আইন
মানানো কষ্টসাধ্য। এর সহজ সমাধানের কথা আমি আগেও বলেছি। ঢাকা উত্তর সিটি
করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক গুলশান-বনানী-বারিধারায় 'ঢাকা চাকা'
নামের একটা বাস সার্ভিস চালু করে দেখিয়ে দিয়েছেন। একই আদলে হাতিরঝিলে
আরেকটি চক্রাকার বাস সার্ভিসও চালু করা হয়েছে। ঠিক একইভাবে কয়েকটা
কোম্পানির অধীনে বাসগুলোকে পরিচালিত করলে চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা
বন্ধ হবে। চালককে বেশি যাত্রী তোলার জন্য আরেকটি বাসের আগে গিয়ে দাঁড়াতে
হবে না। কারণ, তখন তাকে বেতন দেবে কোম্পানি। একটি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এটি
করতে পারলে কিন্তু পুলিশও লাগবে না।
ফলে শুধু আইন দিয়ে শৃঙ্খলা আসবে, এটা কিন্তু ভুল ধারণা। আমাদের সিস্টেমে এত
গলদ রেখে, আমাদের অবকাঠামোগত এত ঘাটতি রেখে, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এত
অনিয়মের সমাধান না করে 'অনুমোদন' দিয়ে কীভাবে শৃঙ্খলা আসবে? পুরোনো আইনেই
অনেক ভালো অনেক কিছু ছিল, তা কিন্তু আমরা নানামুখী চাপে বাস্তবায়ন করতে
পারিনি। এখন নতুন আইনটি আমি মনে করি, সরকার নিজের ঘরেই অর্থাৎ বিআরটিসি
থেকে বাস্তবায়ন শুরু করুক। বিআরটিসির বাসগুলো কীভাবে পার্কিং করে! তাদের
পার্কিং এরিয়া, চালক ও ফিটনেস কতটা আছে দেখুক। তাতে নিজেদের সিস্টেমেটিক
ভুলগুলো অন্তত ধরা পড়বে। ঘাটতি মেটাতে সরকার উদ্যোগী হোক। প্রশাসনের তরফ
থেকে সব ঘাটতি মিটিয়ে সেটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে তার সফলতা আসবে বলে আমরা
মনে করি। তা না হলে আমরা আগের মতোই দেখব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন
সড়কে আইন মেনে অভিযান চালাবে, তখন হয় মালিক-শ্রমিকরা গাড়ি লুকিয়ে ফেলবে
কিংবা অভিযানের বিরুদ্ধে আবার ধর্মঘট ডাকবে। ধর্মঘটে যখন গণমানুষ
ভোগান্তিতে পড়বে, তখন আবার সরকার আপসরফায় যাবে। তাতে কিন্তু সমস্যার সমাধান
হলো না; আর সড়কেও শৃঙ্খলা আসবে না। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগর গড়া যেমন
জরুরি, তেমনি জরুরি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান- যেমন বিআরটিএ,
রাজউক, ট্রাফিক পুলিশ ইত্যাদির দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
- বিষয় :
- সড়ক পরিবহন
- ড. সামছুল হক
