বৈদেশিক মুদ্রার পাহাড় ও প্রবাসী শ্রমিকদের উদ্বেগ
আনু মুহাম্মদ
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৪৩
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবসময়ই উপচে পড়া ভিড় থাকে। প্রায় প্রতিটি ফ্লাইট থাকে ভরা, ওঠার লাইন থাকে দীর্ঘ। একটু তাকালেই দেখা যাবে তাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সেসব মানুষ, যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন। অনেকেই প্রথমবারের মতো, চোখেমুখে অনিশ্চয়তা, বাইরে স্বজনের উৎকণ্ঠা আর কান্না, সেই সঙ্গে প্রত্যাশা। তারা বয়সে তরুণ, তাদের জন্য বিমানবন্দরে বহু অবহেলা, হয়রানি থাকে আর সামনে থাকে অনিশ্চয়তার পাহাড়। বিমানেও তাদের জন্য থাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যভরা ব্যবহার। অথচ তারাই বাংলাদেশের বর্তমান জৌলুসের অন্যতম প্রধান জোগানদার।
বর্তমানে বাংলাদেশে যে সংখ্যক মানুষ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক হিসেবে যুক্ত, তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কাজ করছেন। এই সংখ্যা এখন প্রায় এক কোটি। তাদেরই পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের একটি অন্যতম প্রধান উৎস। বাংলাদেশে যে এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অনেক উঁচু, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে নিরাপদ অবস্থানে আছে তার পেছনে অন্যতম অবদান প্রবাসী শ্রমিকদের প্রেরিত অর্থ। বর্তমানে এই অর্থের পরিমাণ বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, একই সময়ে বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ সম্মিলিতভাবে যা আসে তার তুলনায় প্রায় ৬ গুণ বেশি। জাতীয় আয়ের অনুপাত হিসেবে রেমিট্যান্সের অবস্থানগত দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের একটি বাংলাদেশ। প্রবাসী শ্রমিকরা তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট-শ্রমে-ঘামে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা করছেন। আর তারা জীবন দিয়ে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন, তার একটি অংশ লুম্পেন ধনিক গোষ্ঠী অবাধে বিদেশে পাচার করছে।
প্রথম দিকে বাংলাদেশের শ্রমিকরা মূলত যুক্ত হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারেই। নব্বই দশকে উত্তর আমেরিকাসহ ইউরোপের দেশগুলোতেও তারা আগের তুলনায় আরও বেশি হারে যেতে শুরু করেন। তবে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপে অদক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি ডাক্তার, প্রকৌশলী, স্থপতি, নার্সসহ বিভিন্ন পেশার মানুষও তুলনামূলকভাবে বেশি গেছেন। প্রবাসীদের আয়ের সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও আসে; তবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় প্রবাসীদের মধ্যে যারা তুলনামূলক বেশি আয়ের পেশায় জড়িত, তারা দেশে খুব কমই টাকা পাঠান, তাদের অনেকে বরং উল্টো দেশ থেকে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রিসহ নানাভাবে অর্জিত অর্থ সেসব দেশে নিয়ে যান। নিয়মিত পাঠান বিভিন্ন দেশে কর্মরত বৈধ ও অবৈধ শ্রমিকরা।
বস্তুত রেমিট্যান্স নিয়ে যে কোনো আলোচনায় প্রবাসী শ্রমিকরাই কেন্দ্রে থাকার কারণ। তারাই রেমিট্যান্সের মূল উৎস। সরকারের কাছে এই রেমিট্যান্সের গুরুত্ব থাকলেও এই শ্রেণির মানুষের গুরুত্ব খুবই কম। যারা নিজেদের সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের অনেকে এখানে শ্রমিক না হলেও বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেই টাকা পাঠান। কিন্তু অনেক সময়ই তারা বিদেশের শ্রমবাজারে গিয়ে ভয়াবহ প্রতারণা ও বঞ্চনার শিকার হন। চুক্তি অনুযায়ী চাকরি পান না, চাকরি পেলে মজুরি পান না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় পতিত হন। আবার কখনও অবৈধভাবে অবস্থানের কারণে নির্দিষ্ট দেশ থেকে তাদের বহিস্কার করা হয়। এভাবেই সর্বস্বান্ত হন অনেকে। যারা কাজ অব্যাহত রাখেন তারাও নানা অনিয়ম, অত্যাচার, মজুরি কম দেওয়া, বেশি সময় খাটানো, অবর্ণনীয় পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা, বল প্রয়োগ ইত্যাদির শিকার হন। প্রবাসী শ্রমিকদের অকালমৃত্যু হয়, নিয়মিত লাশ আসে; কিন্তু তার অবর্ণনীয় জীবন অভিজ্ঞতা আমাদের অজানাই থাকে। গত কিছুদিনে সৌদি আরব থেকে নির্যাতিত বহু নারী ফেরত এসেছেন। যারা আসতে পেরেছেন তাদের কাছেই জানা গেছে নির্যাতনের ভয়াবহ সব বর্ণনা। এসব ক্ষেত্রে দেশে সরকারের কিংবা বিদেশে তার প্রতিনিধি দূতাবাসগুলোর কার্যকর কোনো সহায়ক ভূমিকা দেখা যায় না।

অন্যদিকে প্রবাসগমন পারিবারিক-সামাজিক টেনশনও তৈরি করে অনেক ধরনের। একটি পরিবারের কেউ বিদেশে শ্রম বিক্রি করতে যাওয়ার লক্ষ্য থাকে পরিবারের আর্থিক উন্নতি; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তার বদলে জালিয়াতির কবলে পড়ে নিঃস্ব হওয়া, পরিবারে ভাঙন, পরিবারের সদস্যদের অনিশ্চয়তা, অর্থ নিয়ে সংঘাত এমন অনেক ঘটনার কথাই আমরা জানি। দেশের একেবারে চরম দরিদ্র শ্রেণির প্রতিনিধিরা বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পান না। কেননা বিমানের টিকিট, ভিসা ফি, মেডিকেল ফি, দালালদের কমিশন জোগাড় করা এই শ্রেণির মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। এই বাস্তবতায় বিদেশে কর্মের সন্ধানে যান মূলত নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।
বিদেশ থেকে যারা টাকা পাঠান বা সঞ্চয় নিয়ে ফিরে আসেন, তাদের সেই অর্থ যথাযথ উৎপাদনশীল কাজে কমই ব্যয় হয়। সে কারণে সমাজে তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না। প্রকৃতপক্ষে প্রবাসী আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় ভোগ্যপণ্য, জমিজমা ক্রয় ও সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের কাজে। টেলিভিশন, ফ্রিজ, মোবাইল, নতুন বিল্ডিং, মসজিদ বা মন্দির, সামাজিক ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে অর্থব্যয় হয় অনেক। প্রবাসী আয় অর্থাৎ রেমিট্যান্সের সঙ্গে দেশের রিয়েল এস্টেট খাত, মোবাইলসহ ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজারে রমরমা ভাবের একটা যোগসূত্র পাওয়া যাবে। উৎপাদনশীল খাতের বিকাশ না ঘটিয়ে ভোগবিস্তার সমাজ ও অর্থনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। বাংলাদেশে সেটাই হয়েছে।
প্রবাসী আয়ের একটি অংশ প্রবাস ফেরত অনেকেই যথাযথ অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কাজে বিনিয়োগ করতে চাইলেও অভিজ্ঞতার অভাবে আর সে সঙ্গে সরকারের নির্দেশনা ও সহায়তার যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতিতে প্রতারকদের খপ্পরে পড়েন এবং বিপর্যস্ত হন। এ জাতীয় ঘটনা আবার অন্যদের অনুৎসাহিত করে। অনেকে তাই ঝুঁকি না নিয়ে সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন। কেউ কেউ জমি বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার কাজে সেই অর্থ লগ্নি করেন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি।
দেশের সরকারগুলো আন্তর্জাতিক 'বিদেশি সাহায্য' নির্ভর থাকতে যত আগ্রহী, উৎপাদনশীল বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করতে তত আগ্রহী নয়। 'সাহায্য' দেওয়ার নাম করে বাংলাদেশ, শুধু বাংলাদেশ নয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক নীতিমালা নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠান। উন্নয়নের নামে তাদের মূল এজেন্ডা থাকে অর্থনীতিতে বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য তৈরি করা। অথচ তথাকথিত সাহায্যের নামে, প্রধানত ঋণ হিসেবে যে অঙ্কের টাকা বাংলাদেশ গ্রহণ করে প্রবাসীদের আয় তার ১০ গুণেরও বেশি। এই বিপুল উৎসের একাংশের যথাযথ ব্যবহার করলেও আন্তর্জাতিক এসব সাম্রাজ্যবাদী সংস্থার খবরদারি থেকে সহজেই বাংলাদেশের মুক্তি পাওয়া সম্ভব। খাতওয়ারি উদ্যোগের কথা বললে নির্দিষ্টভাবে পাট শিল্প বা জ্বালানি খাতের কথা বলা যায়। শিল্পের উন্নয়নে বা জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে এই রেমিট্যান্স থেকে ঋণ নেওয়া কিংবা তার বিনিয়োগের রাস্তা তৈরি করে দেওয়া খুবই সম্ভব। আমরা সরকারকে বরং বেশি আগ্রহী দেখি বিদেশি সাহায্যের নামে ঋণ নিতে। এই ঋণ আসে আদমজী পাটকল বন্ধসহ পাট শিল্পের বিনাশ করতে কিংবা গ্যাস বা কয়লাসম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার মতো নীতিমালা বা আয়োজন করার জন্য। পাট শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা দরকার বিবিধ কারণে এবং তা করা খুবই সম্ভব। তাতে প্রবাসী আয় কার্যকরভাবে ব্যবহার হতে পারে। এ ছাড়া সর্বজনীন চিকিৎসা, সর্বজনীন শিক্ষা এবং টেকসই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে প্রবাসী আয় খুব কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়।
পুঁজির অভাবের অজুহাত দিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, আরও আয়োজন চলছে। আর জ্বালানি সংকট সমাধানের সহজ পথ করা হয়েছে কণ্টকাকীর্ণ। অথচ যথাযথ উন্নয়নের চাহিদার সঙ্গে রেমিট্যান্সের প্রবাহটাকে মেলানো গেলে ক্ষতিকর বিদেশি 'সাহায্য', ধ্বংসাত্মক বিদেশি বিনিয়োগ বা ঋণের জাল থেকে সহজেই দেশকে মুক্ত করা সম্ভব। আর সম্ভব উৎপাদনশীল খাত বিকাশের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির যথাযথ বিকাশ। এই বিশাল সম্পদের যথাযথ, সুচিন্তিত, সুষ্ঠু ও উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এই সম্পদ তৈরির পেছনের মানুষদের নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা গ্রহণের মূল দায়িত্ব সরকারেরই, যে ভূমিকা থেকে সরকার এখনও অনেক দূরে। এই কারণেই বর্তমানে যখন প্রবাসী খাতে সংকট দেখা যাচ্ছে তার মোকাবিলারও যথাযথ প্রস্তুতি নেই। কার্যকর উদ্যোগও নেই। নিরাপত্তাহীন শ্রমিকদের জন্য তাই কোনো ভরসা নেই। অপ্রস্তুত অমনোযোগী সরকার ও প্রতিষ্ঠানের সামনে এখন বিপন্ন লাখ লাখ মানুষ।
আন্তর্জাতিক বৈরী পরিবেশও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশ্বব্যবস্থা এখন মাস্তান ব্যবস্থায় পরিণত করেছে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একের পর এক সংঘাত সৃষ্টি করে তারা যুদ্ধের ক্ষুধা মেটাচ্ছে; কিন্তু সারাবিশ্বেই তার জন্য ভুগছে মানুষ। তাদের সহযোগী ইসরায়েল, সৌদি আরব ও সিসি নেতৃত্বাধীন মিসর। সর্বশেষ পেশাদার খুনির মতো ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের সেনাবাহিনী প্রধানকে হত্যা করা হয়েছে। এতে পুরো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত-অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব অস্থিরতায় প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে বরাবরের উদ্বেগ-অনিশ্চয়তার মধ্যে আরও নতুন নতুন চাপ যোগ হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- শ্রমবাজার
- আনু মুহাম্মদ
