ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

ব্রিটেনে বৈষম্য ও করোনায় মৃত্যু

ব্রিটেনে বৈষম্য ও করোনায় মৃত্যু
×

আফুয়া হারস্ক

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

করোনাভাইরাসের এই সময়ে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি ব্রিটেনের সংখ্যালঘুরা। এখানে পাকিস্তানি, কৃষ্ণাঙ্গ ক্যারিবিয়ান ও কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান পরিবারগুলোতে শিশু মৃত্যুহার শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় দ্বিগুণ। শুধু তাই নয়, ব্রিটেনে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে শ্বেতাঙ্গ নারীদের চেয়ে পাঁচগুণ কৃষ্ণাঙ্গ নারীর মৃত্যু হচ্ছে। এ ছাড়া ব্রিটেনে বসবাসরত শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ নারী-পুরুষের গড় আয়ুও কম।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ব্রিটেনে সাধারণ শ্বেতাঙ্গরা যে হারে মারা যাচ্ছেন, সে তুলনায় সংখ্যালঘু মানুষের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে একটি বিশ্নেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনাভাইরাসে সংখ্যালঘুদের মৃত্যুহার একেবারেই ব্যাখ্যাতীত।
গার্ডিয়ানের তথ্য সম্পাদক ক্যালেন বার প্রকাশ করেছেন, ব্রিটেনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় ২৭ গুণ বেশি সংখ্যালঘু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অধিকসংখ্যক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অঞ্চলগুলোতে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর হার কিছুটা বেশি। বিষয়টি আর্থসামাজিক ও জনসংখ্যাগত বিষয় যেমন- জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বয়স দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। গার্ডিয়ানের বিশ্নেষণে দেখা যায়, সংখ্যালঘুদের আবাসিক এলাকায় ১০ শতাংশের বাইরেও প্রতি এক লাখ জনে শতকরা ২.৯ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ করোনাভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুর জন্য সংখ্যালঘুদের দায়ী করার অপচেষ্টা চলছে। এটি আঠারো ও উনিশ শতকের স্বৈরাচারী যুগের প্রতিচ্ছবি, যখন অসুস্থতার জন্য বৈষম্যের শিকার দরিদ্রদের দায়ী করা হতো।
আমি সর্বশেষ এ বিষয়ে যে লেখাটি লিখেছিলাম, তাতে সেবা দিতে গিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ৬৩ শতাংশই যে সংখ্যালঘু তা উল্লেখ করেছিলাম। তখন অনেক পাঠকই মন্তব্য করেছিলেন, দারিদ্র্য, ঘনবসতি ও ব্রিটিশ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অক্ষম হওয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল পদে নিয়োগ পান কৃষ্ণাঙ্গ জেরোম অ্যাডামস। তিনিও এমন মন্তব্য করে বলেছিলেন, আমেরিকায় বসবাসরত আফ্রিকান ও ক্যারিবিয়ানদের মদ ও ধূমপান ত্যাগ করা উচিত। তার তথ্য প্রমাণহীন এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন কৃষ্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা চিকিৎসকদের সংখ্যা সংখ্যালঘু চিকিৎসকের তুলনায় অনেক কম। অবহেলিত সংখ্যালঘুরা অনিবার্য মৃত্যুর দিকে হাঁটলেও সে বিষয়ে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে না। ১৯ শতকের শেষদিকে ব্যাকট্রিলজির আবিস্কার স্টেরিওটাইপের অজ্ঞতাকে কাটিয়ে উঠেছিল; তেমনি বৈজ্ঞানিক সত্যই বলে দিতে পারে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর কারণগুলো।
এটি ভিটামিন ডি-এর অভাব হতে পারে, যা সব পরিবেশের লোককে প্রভাবিত করতে পারে। তবে ইউরোপে বসবাসকারী জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে এটি আরও তীব্র হতে থাকবে। একজন চিকিৎসক আমাকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে এটি সব জনগণের কাছে প্রদান করা ব্যবহারিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ হবে।
এটিও হতে পারে যে, এই সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা সংখ্যালঘু শ্রমিকরা সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন নন। করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সেবা দেওয়া চিকিৎসকের মৃত্যুর বিষয়গুলো খুবই মর্মান্তিক, ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) সংখ্যালঘুদের মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছিল। পূর্বের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু চিকিৎসকরা তাদের কর্মস্থলের নিরাপত্তার দাবি জানানোর ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গ চিকিৎসকদের মতো আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। এই কাজ করতে গিয়ে দোষী বা দণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কায় ছিলেন তারা।
তবে এটি অনুমান, কারণ কোনো তথ্য নেই। গার্ডিয়ানের নতুন বিশ্নেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইনটেনসিভ কেয়ার ন্যাশনাল অডিট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের (এটি থিঙ্কট্যাঙ্ক, কোনো সরকারি বিভাগ নয়) একটি পূর্ববর্তী গবেষণা এবং এ সপ্তাহে প্রকাশিত চিকিৎসকদের একটি গবেষণা যেগুলোর দুটিই সংখ্যালঘু স্বাস্থ্যকর্মীদের মৃত্যুর মাত্রা নির্দেশ করে।
তবুও এসব যথেষ্ট নয়। এখন সরকারি তদন্তটি বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ যুগ যুগ ধরে দাবি জানানো হলেও সংখ্যালঘুদের মৃত্যুসনদগুলো সংরক্ষিত হয়নি। ২০০৩ সালের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য সংরক্ষণের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল। তাতে সুপারিশ করা হয়েছিল, এসব তথ্য স্বাস্থ্য বৈষম্য মোকাবিলার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক।
যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার অনেক অঙ্গরাজ্যে এসব তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ব্রিটেনের কোনো সরকারই এ ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল না।
বিভিন্ন উপজাতি বা সংখ্যালঘু জাতি স্বাস্থ্যসেবায় চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। দশক দশক ধরে চলে আসা সরকারের অবহেলার কারণেই যে এটা হচ্ছে তার প্রমাণ মেলে সহজেই।
কভিড-১৯-এর মাধ্যমে আমরা অনুমান করতে পারি, সংখ্যালঘুদের কত সংখ্যক ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে ভুগছেন। এ ক্ষেত্রেও আমাদের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার দিকগুলো ব্যাখ্যা করা দরকার।
অবস্থা এ রকম হলে, সরকারি কর্তৃপক্ষের উচিত হবে মানবিক সমতা নিশ্চিত করা। এ জন্য ঝুঁকিতে থাকা গোষ্ঠীগুলোর জন্য আরও সুরক্ষা ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।
আমাদের যা করা উচিত নয় তা হলো, সেই পুরোনো ধ্যান-ধারণাতে ডুবে যাওয়া যে, সংখ্যালঘুদের মৃত্যু একটি অনিবার্য প্রাকৃতিক কারণ।
শুধু করোনাভাইরাস থেকে নয়, আমাদের স্বাভাবিক সমাজব্যবস্থা থেকে পৃথক সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর লোকদের সমস্যা ও বৈষম্যমূলক আচরণ নির্দিষ্ট করা না গেলে তাদের রক্ষা করা অসম্ভব হবে। এটি কয়েক দশক আগে হওয়া দরকার ছিল। করোনাভাইরাসের কারণে বৈষম্যের ফলাফলগুলো এখন সবার সামনে উন্মুক্ত।
গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর সাইফুল ইসলাম
গার্ডিয়ানের কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×