ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

প্রকৃতির প্রশ্বাসকালে প্রান্তজনের দীর্ঘশ্বাস

প্রকৃতির প্রশ্বাসকালে প্রান্তজনের দীর্ঘশ্বাস
×

শেখ রোকন

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২০ | ২৩:২৮

আনন্দিত হবো, না বেদনাহত থাকব, বুঝতে পারছি না। করোনাভাইরাসের কালে অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই; সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে সম্ভবত প্রকৃতিতে। এখন পর্যন্ত মানবজাতির একমাত্র ঠিকানা এই নীল গ্রহ যে পুনরায় সবুজ হতে শুরু করেছে, প্রথম ধরা পড়েছিল মহাকাশ থেকে তোলা ছবিতে। করোনাভাইরাস ততদিনে চীনের উহান ছেড়ে বাকি বিশ্বের অনেক দেশেই থিতু হয়েছে। নিয়তির পরিহাসই বলতে হবে, ভাইরাসটি যত ছড়িয়েছে, লকডাউন যত বিস্তৃত হয়েছে; প্রকৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন তত দৃশ্যমান হতে থেকেছে। মাথার ওপর আকাশ ক্রমেই পরিস্কার হতে থেকেছে, ক্রমেই প্রসারিত হয়েছে দিকচক্রবাল। বহুদিন পর ঢাকার আকাশ যেন নীল রঙ ফিরে পেয়েছে। ফেসবুকে একজন কৌতুক করে বলেছিলেন- আকাশ এতটাই পরিস্কার যে, মিরপুর থেকে এভারেস্ট দেখা যাচ্ছে। বাস্তবে পাঞ্জাবের জলন্ধর শহর থেকে সোয়াশ' কিলোমিটার দূরের হিমালয় দেখা যাচ্ছে কয়েক দশক পর। কেবল মাথার ওপরের আকাশে নয়, পায়ের নিচের মাটিতেও টের পাওয়া যাচ্ছে পরিবর্তন, তাপ কমেছে। সবচেয়ে বেশি বোঝা যাচ্ছে, বুকের ভেতর। উপমা হিসেবে নয়, বাস্তবেই। ফুসফুস ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে এখন। বোঝা যাচ্ছে বাতাস আগের তুলনায় তাজা।
প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বায়ুদূষণের রিয়েল টাইম চিত্র পাওয়া যায়। এই লেখা যখন লিখছি, শুক্রবার দুপুরে এক পশলা বৃষ্টির পর, তখন আইকিউএয়ার ডট কমে গিয়ে দেখি বৈশ্বিক সূচকে ঢাকার অবস্থান ১২ নম্বরে। তার মানে আরও এগারোটি নগরের বায়ুর মান ঢাকার চেয়ে খারাপ। সেখানে যেমন চীনের বেইজিং বা ভারতের দিল্লি রয়েছে, তেমনই রয়েছে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস বা ইতালির মিলানও। মনে আছে, বৃহস্পতিবারের ঝড়ের পর ঢাকার অবস্থান ছিল আরও নিচে, ৩৪ নম্বরে। অবশ্য সূচকের নম্বরে হেরফের হলেও বায়ুর মানের দিক থেকে ঢাকা একই অবস্থানে- 'মডারেট'। বায়ুর মান প্রকাশ করা হয় সাধারণত ছয়টি গ্রেড দিয়ে- গুড, মডারেট, আনহেলদি ফর সেনসিটিভ গ্রুপ, আনহেলদি, ভেরি আনহেলদি, হ্যাজারডস। সেদিক থেকে ঢাকার বাতাস এখন দ্বিতীয় গ্রেডের। অনেকের মনে থাকার কথা, করোনাভাইরাস বিস্তারের আগে ঢাকা প্রায়শই বায়ুদূষণে বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করত। বাংলাদেশও ২০১৯ সালে দূষিত বায়ুর দেশের সূচকে শীর্ষস্থান দখল করেছিল। বস্তুত করোনাভাইরাসের বিস্তার ও তার জের ধরে গোটা বিশ্বেরই বায়ু পরিস্থিতি অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে একজন আক্ষেপের সঙ্গে লিখেছেন- যত বেশি মানুষ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে, প্রকৃতি তত বেশি সহজে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। দেখা যাচ্ছে, এই ক'দিনে কার্বনডাই অক্সাইড উদগিরণ এমন কমেছে, যা মাস তিনেক আগেও অচিন্তনীয় ছিল। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী চীনে অন্তত ১৮ শতাংশ কমেছে। ইউরোপে কমেছে আরও বেশি, ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। মানুষের ঘরবন্দির সুযোগ নিয়ে শহরে শহরে বনের প্রাণিকে মনের আনন্দে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। তার মানে, জীবজগৎ এখন স্বস্তিতে। হাঁসফাঁস করতে থাকা পৃথিবী এখন যেন বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। নিরন্তর দৌড়ের মধ্যে থাকা প্রকৃতি করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে যেন দম ফেলার অবসর পেয়েছে। আমরা সাদা চোখেই দেখছি- এখন কলকারখানার বর্জ্য নেই, যান্ত্রিক যানবাহনের ধোঁয়া নেই, জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়তে পুড়তে বিমানের উড়াল নেই, যত্রতত্র মানুষের ভিড়ে জীবজগতের অন্যান্য সদস্যের কোণঠাসা হওয়ার বিষয় নেই।
আমরা দেখছি, বাংলাদেশের নগর সংশ্নিষ্ট নদীগুলোর কাজলপ্রবাহ ইতোমধ্যে স্বাভাবিক রং ফিরে পেয়েছে। বুড়িগঙ্গার মতো নদীগুলোতে বর্ষাকালের আগ-পিছ মিলিয়ে চার মাস পানির রং অপেক্ষকৃত ভালো থাকে। করোনার কল্যাণে এবার আগেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কারণ কারখানাগুলো বন্ধ, নির্বিচার বর্জ্য নদীতে গড়াচ্ছে না। কিছুদিন আগে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সাগরলতা এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। সাগরের পানিতে ডুবসাঁতার দেওয়া গোলাপি ডলফিনের ঝাঁক সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সর্বশেষ কবে সেখানে এমন দৃশ্য দেখা গেছে, কেউ জানে না। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদভারে পিষ্ট সৈকতে সাগরলতা দূরে থাক, দূর্বাও পা মেলার অবকাশ পেত না। সামুদ্রিক প্রাণীরা থাকত উপকূল থেকে দূরে। যানজটে জেরবার ও কোলাহলে কাবু সড়ক ও মহাসড়কগুলো এখন প্রায় সুনসান। দিনরাত ছুটতে থাকা, টিকে থাকার সংগ্রামে যুঝতে থাকা বাংলাদেশে মানুষ ও তাদের তৈরি 'সভ্যতা' যখন কিছু দিনের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে, তখন কিছুদিনের জন্য রেহাই পেয়েছে প্রকৃত প্রকৃতি।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃতিতে আমরা কি এভাবে পরিবর্তনই চেয়েছিলাম? নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বিসবুজীকরণে মুমূর্ষু প্রকৃতিতে আমরা নিশ্চয়ই পরিবর্তন চেয়েছিলাম। বিশ্বব্যাপী তো বটেই, বাংলাদেশে আমরা বিশেষভাবে চেয়েছিলাম- শিল্প, বাণিজ্য, নগরায়ণ ও আবাসনের জন্য নদী দখল করা হবে না, পাহাড় কাটা হবে না, বন উজাড় করা হবে না, জলাভূমি ভরাট করা হবে না, কৃষি জমি নষ্ট করা হবে না, জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট করা যাবে না। বরং ইতোমধ্যে দখল বা বিনষ্ট হওয়া প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। আমরা চেয়েছিলাম- শিল্প উৎপাদনের নামে পানি, ভূমি ও বায়ুদূষণ বন্ধ করা হবে। আমরা চেয়েছিলাম- উন্নয়ন হবে টেকসই, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বসবাস হবে ভারসাম্যপূর্ণ। আমরা চেয়েছিলাম- সামষ্টিক প্রাকৃতিক সম্পদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার থাকবে। বাস্তবে সেই চাওয়া পূরণ হয়নি।
এত আবেদন, নিবেদন, প্রতিবাদ, প্রতিষেধক- কিছুতেই কিছু হয়নি। দূষণ বেড়েই চলছিল। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি বিনষ্ট করা হচ্ছিল, মানুষের আগ্রাসনে জীবজগৎ ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল। সামষ্টিক প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে ক্রমেই উচ্ছেদ হয়ে চলছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। মানুষের নিজস্ব নদী, পাহাড়, বন, জলাভূমি, কৃষি জমি ক্রমেই তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল শিল্পের নামে, বাণিজ্যের নামে, রপ্তানির নামে, উন্নয়নের নামে। করোনাভাইরাস যেন 'প্রকৃতির প্রতিশোধ'। প্রকৃতিবিনাশী সব কাজ যেন কোনো এক অদৃশ্য হাতে একযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বহু যুগ পর মা প্রকৃতি যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। আমরা প্রকৃতিকে বাঁচাতে চেয়েছি; কিন্তু এভাবে নয়।
শিল্পায়ন বা নগরায়ণের যে চাকা কয়েক শতাব্দী ধরে এগিয়ে চলছে, সেটাকে চাইলেই উল্টো দিকে ঘোরানো সম্ভব নয়। কারণ গত কয়েক শতাব্দীতে এর সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা কতটা জড়িয়ে গেছে, শিল্প ও নগরায়ণ রহিত করোনা পরিস্থিতিতে এসে আমরা সেটা আরও স্পষ্ট বুঝতে পারছি। গোটা বিশ্বেই হাজারো মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাংলাদেশের মতো দেশে করোনার চেয়ে বেশি মানুষ মারা যাবে কর্ম ও খাদ্যহীনতায়। খোদ খাদ্য উৎপাদনও তো হুমকির মুখে পড়েছে। যে শিল্পায়ন বা নগরায়ণকে আমরা প্রকৃতিবিরোধী আখ্যা দিয়েছি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাণঘাতী বলেছি; প্রান্তিক মানুষকে বাঁচানোর জন্য এখন দ্রুত লকডাউন খুলে দিয়ে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই যত দ্রুত সম্ভব ফিরতে চাইছি
দুনিয়াব্যাপীই প্রকৃতি সুরক্ষা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকে প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা। প্রকৃতিনির্ভর জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকৃতি প্রশ্বাস নিচ্ছে বটে; প্রান্তজনের দীর্ঘশ্বাস ক্রমেই গাঢ় হচ্ছে। বাতাসে কার্বনডাই অক্সাইড কমছে বটে, বাড়ছে খেটে খাওয়া মানুষের হাহাকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকৃতি জীবন ফিরে পেয়েছে, অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু প্রান্তিক মানুষই যদি টিকতে না পারে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বলতে হয়- 'এই জীবন লইয়া কী করিব?'
তাহলে কি প্রান্তজনের দীর্ঘশ্বাস ও কান্না মোচনের জন্য আগের মতোই প্রকৃতি ধ্বংস করে বেপরোয়া শিল্পায়ন, নগরায়ণ, দখল-দূষণ চলতে থাকবে? না, ওই দিন গত হয়ে গেছে। বস্তুত করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ প্রকৃতির ওপর অত্যাচার। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির মতে, এ পর্যন্ত মানুষের মধ্যে যেসব সংক্রামক ব্যাধি এসেছে, তার ৭৫ ভাগই এসেছে বন্যপ্রাণী থেকে। আরও ভেঙে বললে, বন্যপ্রাণী ব্যবসা থেকে। প্রকৃতির প্রতি অবিচার যদি চলতেই থাকে; করোনাভাইরাসের মতো নতুন নতুন ব্যাধি ও দুর্যোগ আগামী দিনগুলোতে আসতেই থাকবে। দীর্ঘতর হতে থাকবে প্রান্তিক মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
'লকডাউন' যত কার্যকর প্রতিষেধকই হোক, অনন্তকালীন ব্যবস্থা হতে পারে না। আজ না হোক, কাল, বা পরশু আমাদের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরতেই হবে। কিন্তু সেই ফেরা আর আগের মতো হতে পারবে না। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির প্রধান ইঙ্গার এন্ডারসন বলেছেন- করোনাভাইরাসের মাধ্যমে পৃথিবী আমাদের একটি বার্তা পাঠিয়েছে- আমরা যদি প্রকৃতিকে অবহেলা করি, তাহলে নিজের অস্তিত্ব ঝুঁকিতে পড়বে। করোনা-পরবর্তী জীবনে আমরা যদি টেকসই উন্নয়ন, সবুজ শিল্পায়ন, ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ন্যায্য সমাজ নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে প্রকৃতি ও প্রান্তজন উভয়ই ভালো থাকবে।
[email protected]
লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল

আরও পড়ুন

×