করোনা মোকাবিলা
প্রাপককেই দিন পিপিই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০২ মে ২০২০ | ১২:০০
আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই করোনার সংক্রমণ যেমন ঠেকানো যায়নি যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে, তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনার কারণে করোনা আক্রান্তদের নিরাময়ও বিলম্বিত বা পরাহত হয়েছে। বিশেষত করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মুখযুদ্ধের অগ্রজন বিবেচিত খোদ চিকিৎকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ভাগ্যবশত প্রথমদিকে চিকিৎসকদের বদলে অন্যান্য পেশার অনেকেই 'শখ মেটানোর' জন্য পিপিই নিয়েছিলেন। এ ব্যপারে সমালোচনা শুরু হলে পরে চিকিৎসকদের পিপিই সরবরাহে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। কিন্তু বুধবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কাজীর গরু কেতাবে থাকলেও গোয়ালে নেই।
'এত পিপিই গেল কই'- শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সোমবার পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ১৩ লাখ পিপিই বিতরণ করার কথা বলা হয়েছে। ওই দিন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংগৃহীত পিপিইর সংখ্যা সাড়ে ১৫ লাখের বেশি। সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত হাসপাতাল, নমুনা পরীক্ষা কেন্দ্র এবং করোনাভাইরাস চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে মোট ৮ লাখের কিছু বেশি পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে বিদ্যমান বাস্তবতার গরমিলের ফারাক বিস্তর। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত হবে, কোন প্রতিষ্ঠানে কতটি পিপিই বিতরণ করা হয়েছে, তারও তালিকা প্রকাশ করা। তাহলে বোঝা যাবে সরবরাহ ও প্রাপ্তির ঘাটতি কোথায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য যদি সঠিক বলেও আমরা ধরে নিই, তাহলেও বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক ও সংশ্নিষ্টদের প্রত্যেকের কয়েক সেট করে পিপিই পাওয়ার কথা। বরং অভিযোগ আছে, স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত অনেকে পিপিই পাননি। আমরা দেখছি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পিপিই সম্পর্কিত তথ্যের উপাত্ত চ্যালেঞ্জ করেছে চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এত পিপিই কোথায় দেওয়া হলো? একই সঙ্গে সরবরাহকৃত পিপিইর মান নিয়েও প্রশ্নম্ন রয়েছে। ইতোমধ্যে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকসহ সংশ্নিষ্ট যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের অনেকেই নিম্নমানের সুরক্ষাসামগ্রী বিশেষ করে পিপিইর কারণে সংক্রমিত হয়েছেন। সরবরাহকৃত বহুসংখ্যক পিপিই পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়ার উপকরণযুক্ত নয়। যারা রোগাক্রান্তকে সুস্থ করে তুলবেন, যারা সুরক্ষিত না থাকলে অনেক কিছু অরক্ষিত হয়ে পড়বে, তাদের ক্ষেত্রে এই যে নানা রকম বৈষাদৃশ্য, তা মেনে নেওয়া যায় না।
প্রয়োজনের নিরিখে মানসম্পন্ন সুরক্ষাসামগ্রী বিশেষ করে পিপিই চিকিৎসকদের মধ্যে সরবরাহের ব্যাপারে নিকট অতীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। পিপিইর যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়েও তিনি তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। অথচ তারপরও পিপিই সংক্রান্ত যে তথ্যচিত্র সমকালের প্রতিবেদনে ফের উঠে এসেছে তা অনাকাক্ষিত, অনভিপ্রেত। করোনা সুরক্ষা পোশাক বা অন্যান্য সামগ্রী এখনও চিকিৎসক ও সংশ্নিষ্টদের কেন নেই, এ প্রশ্নেম্নর জবাব দেওয়ার দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এড়ানোর অবকাশ নেই। আমরা জানি, গত মধ্য মার্চে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্থা এবং জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে পিপিইর যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিয়ে একটি নির্দেশনা দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি কেন? আমরা দেখতে চাইব- কারা এই নির্দেশনা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ আমলে নেয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে। চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিতদের বাইরে যারা পিপিই নিয়েছে, চিহ্নিত করতে হবে তাদেরও। 'ব্যবহূত' পিপিই ফেরত আনা যাবে না সত্য, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে এমন নয়ছয় চলতেই থাকবে।
আমরা নিকট অতীতে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে পিপিইর অপব্যবহার প্রসঙ্গে লিখেছিলাম। পিপিই কোনো বিলাস পরিধান বস্তু নয়, এটি সুরক্ষাসামগ্রী। এর যথাযথ মান নিশ্চিতকরণ যেমন জরুরি, তেমনি এর যথেচ্ছ ব্যবহার ঠেকানোও সমভাবেই জরুরি। যাদের জন্য এই উপকরণটি অত্যাবশ্যক, তারাই যদি এ থেকে বঞ্চিত থাকেন ও কাগজেকলমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সরবরাহ চিত্র উপস্থাপন করে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা এই অসঙ্গতির প্রতিকার দাবি করার পাশাপাশি চিকিৎসক ও চিকিৎসা-সংশ্নিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী পর্যাপ্ত সরবরাহের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছি। চিকিৎসা সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে এত বড় বিপর্যয় সামলে ওঠা দুরূহ- এ কথা দায়িত্বশীলদের মনে রাখতেই হবে।
- বিষয় :
- করোনা মোকাবিলা