পতিসরেই হোক বিশ্ববিদ্যালয়
এম মতিউর রহমান মামুন
প্রকাশ: ১১ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
নওগাঁ জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্তে নওগাঁবাসী আনন্দিত এবং গর্বিত। নওগাঁবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল রবিতীর্থ পতিসরে পূর্ণাঙ্গ রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার। তাদের দাবির যথেষ্ট যৌক্তিকতাও আছে। কেননা বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত পতিসর-শিলাইদহ-শাহজাদপুর- এই তিনটি স্থানের মধ্যে পতিসর ছিল কবির নিজস্ব। অথচ পতিসরই আছে উপেক্ষিত। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মদিবসে প্রথমবারের মতো মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ রবিতীর্থ পতিসর ঘুরে গেছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির আগমনে অঞ্চলের গণমানুষ, রবীন্দ্র গবেষক, সংস্কৃতিমনা মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখেছেন, হয়তো এবার তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। তাদের চাওয়া পতিসরে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কবি প্রতিষ্ঠিত কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন জাতীয়করণ, পতিসরে হাসপাতাল আধুনিকীকরণ, পতিসরে বিশ্বকবির নামে প্রতিষ্ঠিত কৃষি কলেজ জাতীয়করণ ইত্যাদি। এ নিয়ে দেনদরবার, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, টেলিভিশনে- গোলটেবিলে আলোচনা কম হয়নি। তবে আশার কথা,
মহামান্য রাষ্ট্রপতি পতিসর ঘুরে যাওয়ার বেশ কিছু পর নওগাঁবাসীর জন্য পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর এলো, তবে নওগাঁ জেলার কোথায় বিশ্ববিদ্যালয় করা হবে- এমন কোনো তথ্য জানা যায়নি। পতিসর বিশ্ববিদ্যালয় করার মতো প্রয়োজনীয় জায়গাজমি আছে। তবে ভালো হয়, এলাকার গণমানুষের স্বার্থে তাদের নির্বাচিত সব সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর উচিত একযোগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়ে রবিতীর্থ পতিসরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা। হয়তো তাদের কথা আমলে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পতিসর রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করতে পারেন। বলে রাখা দরকার,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামাঞ্চলের মানুষকে যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবে পরিণত হলো স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। বিষয়টা আমাদের জন্য আনন্দের এবং গর্বের। অন্যদিকে কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছে কবির নিজস্ব জমিদারি পতিসরে আনুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা হয়নি বলে। সংস্কৃতিবান মানুষের অনেক দিনের দাবি ছিল বিশ্বকবির নিজস্ব জমিদারি কালীগ্রাম পরগনার পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার। কারণ 'শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসর- পূর্ববঙ্গের এই তিন এলাকার জমিদারি কর্মসূত্রে রবীন্দ্রনাথের যাতায়াত ও অবস্থানের কথা আমাদের জানা আছে, কিন্তু জানা হয়নি কবির কর্মভূমি কীভাবে তার মানুষভূমি গড়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল। রবীন্দ্রনাথের পরিব্যাপ্ত শিল্প মানস ও জীবনবোধ বোঝার জন্য তার জীবনের এই পর্বের গভীর অনুধ্যান দরকার। এক্ষেত্রে শিলাইদহ শাহজাদপুরের ওপর গবেষক, বিশ্লেষক, রবীন্দ্র গবেষকদের গভীর দৃষ্টিপাত ঘটলেও পতিসর ছিল বরাবরই উপেক্ষিত (রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর- আহমদ রফিক)। অথচ এই পতিসরই রবীন্দ্রনাথের পলিল্গচিন্তা, শিক্ষা ভাবনা ও স্বদেশ ভাবনার আশ্চর্য সংহতি অর্জন করেছিল কিন্তু রবীন্দ্র গবেষণার অকরুণ পরিণতির ফলে আমরা পতিসরকে জানতে পারিনি। দেশের সত্যিকারের রূপটি কবে যে পতিসরে এসে খুঁজে পেয়েছিলেন, তাও আমাদের জানার বাইরে। পতিসরে ঘটেছিল কবিসত্তা ও কর্মীসত্তার এক ভিন্নতর উদ্ভাসন, জমিদার রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ, সমাজ সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পারেন, এ এলাকার প্রজা-চাষিদের দুঃখ-দুর্দশার প্রধান কারণ অশিক্ষা। অন্যদিকে নিজ জমিদারি কালীগ্রামের সহজ-সরল অল্প আয়ের স্বল্প শিক্ষিত মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনুভবের মধ্য দিয়ে কবি লিখেছেন- 'কোথায় প্যারিসের আর্টিস্ট- সল্ফপ্রদায়ের উদ্দাম উন্মত্ততা আর কোথায় আমার কালীগ্রামের সরল চাষি প্রজাদের দুঃখ দৈন্য-নিবেদন! এদের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জল আসে। বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশজোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক' (ছিন্নপত্রাবলি ১১১ সংখ্যক চিঠি)। সেই উপলব্ধি থেকে প্রায় ২০০টি গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা এবং তিনটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই অঞ্চলের শিক্ষার ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন।
পাশাপাশি স্বাস্থসেবা, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, কৃষি সমবায় ব্যাংক (১৯০৫) স্থাপন অর্থাৎ সমাজ সংস্করণ। কাজটা শুরু করেছিলেন নিভৃত পলিল্গ পতিসরে। পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করতে পারলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারাবিশ্বের রবীন্দ্র অনুসারীদের কাছে আজীবন সমাদৃত হবেন।
রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক
[email protected]