ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ব্যাংকের আয়-ব্যয় উপাখ্যান

ব্যাংকের আয়-ব্যয় উপাখ্যান
×

মঈনুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সুদের কারবারি লগ্নিকৃত টাকার ওপর দু'মাসের জন্য সুদ নিতে পারবে না। কিন্তু তাকে আমানতকারীদের সুদ দিতে হবে। কারবারির অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। সে কোথা থেকে সুদ দেবে। কীভাবেই বা পরিচালনা ব্যয় মেটাবে। ৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ইস্যুকৃত সার্কুলার অনুযায়ী এপ্রিল-মে মাসে ব্যাংকগুলো ঋণ গ্রহীতাদের হিসাব থেকে কোনো সুদ আয় খাতে নিতে পারবে না, সুদ ব্লকড হিসেবে রেখে দিতে হবে। কিন্তু ব্যাংকগুলোকে আমানতকারীদের সুদ দিতে হবে।

ব্যাংক খাতের আয়ের মূল উৎস ঋণ সুদ আয়; যা সে ঋণ গ্রহীতাদের অ্যাকাউন্ট থেকে পেয়ে থাকে। এর বাইরে সামান্য কিছু আয় আসে কমিশন ও ফি থেকে। কভিড-১৯ মহামারিতে আমদানি, রপ্তানি, ব্যাংক গ্যারান্টি বাণিজ্যে ব্যাপক ধসে কমিশন আয়ে ধস নেমেছে। ঋণ সুদ আয় যদি দু'মাসের জন্য বন্ধ থাকে, এই দু'মাস ব্যাংকগুলো আমানত সুদ ব্যয় কীভাবে মেটাবে, পরিচালনা ব্যয়ই বা কোন উৎস থেকে আসবে।

২০১৯ সালে উল্লেখযোগ্য ৩৩টি ব্যাংকের পরিচালনা মুনাফা ছিল কমবেশি ২৩ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা মুনাফা ও এর কাছাকাছি। জানুয়ারিতে মোট ব্যাংক আমানত ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা এবং আমানতের গড় সুদহার ৫.৬৯%। জানুয়ারিকে ভিত্তি ধরলে দু'মাসে ব্যাংকগুলোর আমানত সুদ ব্যয় ১০ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। ২০১৯-এর মুনাফার গড় ভিত্তি ধরে ২০২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা মুনাফা কমবেশি ৬ হাজার কোটি টাকা। এপ্রিল-মে মাসে ব্যাংকগুলো ঋণ গ্রহীতাদের হিসাব থেকে কোনো সুদ আয় খাতে নিতে পারবে না। অধিকন্তু ব্যাংকগুলোকে আমানত সুদ ব্যয় বহন করতে হবে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মে মাস শেষে ব্যাংকগুলো পরিচালনা ক্ষতি হবে কমবেশি ৫ হাজার কোটি টাকা। ক্ষতির এ হিসাব মাথায় নিয়ে ব্যাংক খাত বেতন, ঈদ বোনাসসহ পরিচালনা ব্যয় মেটাতে গিয়ে কমবেশি আতঙ্কিত হয়ে যাবে। এই দু'মাসের ব্যাংক খাতের পরিচালনা ব্যয় মেটানোর জন্য কোনো প্রণোদনা নেই। উপরন্তু মহামারি চলাকালে অতিরিক্ত বেতন ব্যয়ের নির্দেশনা আছে।

অবশ্য ৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার ইস্যু করে বলেছে, ১ এপ্রিল থেকে নতুন বিতরণ বা উত্তোলনকৃত ঋণ থেকে সুদ আয় নিতে পারবে। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায়।

কভিড-১৯ কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে চলতি মূলধন বাবদ ঋণ সুবিধাভিত্তিক আর্থিক সহায়তা। বৃহৎ শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন বাবদ ঋণ সুবিধাভিত্তিক আর্থিক সহায়তা। কিন্তু ব্যাংক খাতের অবস্থা তথৈবচ।

অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত নির্ধারিত সীমা ৮৭ ভাগের ওপরে। নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। গত এক বছর বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হতাশাজনক হার তার প্রমাণ। সিআরআর, এডিআর এ দফায় ছাড় দেওয়ার পরও ব্যাংকগুলো সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা ঋণ প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক ২৫ হাজার কোটি টাকার আবর্তনশীল পুনঃঅর্থায়ন স্কিম তহবিল গঠন করেছে। আবর্তনশীল পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিতরণকৃত প্রণোদনা ঋণের ৫০ ভাগ অর্থের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রদান করবে।

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা সংক্রান্ত সার্কুলারের ওপর শুনানিকালে গত বছর ২১ মে মহামান্য হাইকোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাকে 'দুষ্টের পালন, শিষ্টের দমন' হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই 'দুষ্টের পালন, শিষ্টের দমন নীতি' ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়ের গভীরতাকে আরও বাড়িয়েছে।

ব্যাংক খাত নির্ভর সংকটকালীন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ও দুই মাস ঋণ সুদ আয় স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়ার আগে ব্যাংক লুট ও ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমে ক্ষতবিক্ষত ব্যাংক খাতের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রয়োজন ছিল।

ব্যাংকার ও পিএইচডি গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×