ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

করোনাজনিত আর্থিক সংকটে জীবন ও জীবিকা

করোনাজনিত আর্থিক সংকটে জীবন ও জীবিকা
×

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের নমুনা সংগ্রহে ব্যস্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। মঙ্গলবারের ছবি -মামুনুর রশিদ

ড. সেলিম রায়হান, ড. মাসিহ উল আলম ও ড. মুহাম্মদ সওগাতুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উভয় সংকটের এক নজিরবিহীন অবস্থায় বিশ্ব। গত দুই দশকে বাংলাদেশের চমৎকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ধারণা করছে যে, এই প্রবৃদ্ধির হার এই বছরে ২-৩ শতাংশে নেমে আসবে। একদিকে রপ্তানি বন্ধ, গার্মেন্ট খাতে অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে, প্রবাসী আয়ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে শ্রমিকের চাহিদা কমে যাবে। একটি বড় সংখ্যার শ্রমিক চাকরি হারাতে পারেন।

প্রবৃদ্ধি আর জীবিকা ও জীবনের মান সম্পর্কিত। বর্তমান পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে দারিদ্র্য ভয়াবহ অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াবে। সানেমের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, যদি বাংলাদেশে টানা তিন মাসের লকডাউন চলে, তবে দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। ২০১৯-এ সরকারি হিসাব মতে, ২০.৪ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল, যা এখন ৪০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে আমাদের গত দেড় দশকের অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে এবং দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে দেড় দশকের আগের অবস্থানে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অচল অর্থনীতিতে নতুন করে অনেক মানুষ গরিব হচ্ছে, অনেকেই স্থায়ীভাবে গরিব হয়ে যাবে।

সংকট থেকে বাঁচতে এবং অর্থনীতিকে বাঁচাতে আমাদের এই মুহূর্তে দুই বছর মেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া আবশ্যক। কিন্তু এ কাজে ইউরোপের পরিকল্পনা কপি-পেস্ট করলে হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে, বাংলাদেশের উপযোগী এবং প্রতিটি অঞ্চল, প্রতিটি অর্থনৈতিক খাত অনুযায়ী বিশেষায়িত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারণ, সব খাতে এই মহামারির একই ধরনের প্রভাব পড়বে না। আমাদের অগ্রাধিকার হতে হবে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনা। বাংলাদেশকে হয়তো এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যা এর আগে কখনোই নিতে হয়নি।

পরিকল্পনায় দুটি দিকে নজর দেওয়া জরুরি। প্রথমত সামাজিক সুরক্ষা খাত। বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে নাজুক ব্যবস্থাগুলোর একটি। করোনা সংকটে পড়ে সরকার এই খাতে এবার ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। ব্যয় আরও বাড়াতে হবে এবং এর যাতে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে এই সহায়তা পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত অর্থনীতির বহুমুখীকরণ। আমাদের অর্থনীতি খুব বেশি নির্ভরশীল একটি খাতের ওপর। গার্মেন্ট খাতে কোনো অসুবিধা হলে আমাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার অবস্থা হয়। একক পণ্য নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের অর্থনীতির দুর্বলতা কমাতে হবে। গার্মেন্ট তার মতোই চলুক, পাশাপাশি বাকি খাতগুলোর উন্নতি অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের তো অনেক সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে যেমন- চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যাল, আইটি, ইলেকট্রনিক, এগ্রোপ্রসেসিং, চিংড়ি এবং মৎস্য। এসব খাতে মানোন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানসম্মত গবেষণারও প্রয়োজন আছে। আমরা অনেক শিল্পেই সরাসরি উৎপাদন করি, ভ্যালু অ্যাড করি না। যেমন থাইল্যান্ড-ভিয়েতনাম মাছের নানা রকম খাদ্যপণ্য তৈরি করে। আমাদের এরকম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারকে সাধুবাদ জানাতে হয়, কারণ তারা বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এটি বাংলাদেশ জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ, যার হার জিডিপির অনুপাতে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। প্রণোদনার সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত অর্থায়ন; দ্বিতীয়ত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, যেন যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারাই পায়; তৃতীয়ত মনিটরিং বা স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা।

শুধু বরাদ্দ বাড়ালে হবে না, বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়া জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। সরকার এবং জনগণ উভয়পক্ষেরই এই জবাবদিহিতার তাগিদ থাকতে হবে। জনগণের সচেতনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা মিলেই কেবল নিশ্চিত করা সম্ভব সুশাসন।

স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। জিডিপির ০.৫ শতাংশ বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে, যা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। আবার যা বিনিয়োগ আছে, তার ফলও যথার্থভাবে পাচ্ছে না এ খাত। আমাদের কোনো জাতীয় স্বাস্থ্য পরিকল্পনা নেই। নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত কারোরই স্বাস্থ্যসেবার তেমন কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে অনেক প্রকল্প সফলতার মুখ দেখেছে। যেমন সবুজ ছাতা, সূর্যের হাসি চিহ্নিত ক্লিনিক, এরকম আরও প্রকল্প রয়েছে। আমরা কম খরচে অনেক প্রযুক্তি দিয়ে জীবন বাঁচাতেও সমর্থ হয়েছি। এতে মাতৃমৃত্যুর হার যেমন, অনেক রোগের প্রাদুর্ভাবও কমানো গেছে। স্বাস্থ্য খাতে একদিকে আমরা যেমন অনেক সূচকে ভালো করেছি, তেমনি অনেকগুলোতে পিছিয়েও রয়েছি। বাংলাদেশের মানুষ যদি ১০০ টাকা খরচ করে স্বাস্থ্যসেবা পেতে তার ৭৭ টাকা নিজের পকেট থেকে যায়, ২৩ টাকা সরকার দেয়। এটি সমাজে অসাম্য বাড়িয়ে দেয়। আমাদের জবাবদিহিতামূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য খাত তৈরি করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপও বাড়াতে হবে।

হাসপাতালের উন্নতি সাধনে শুধু ডাক্তার নয়, বিজ্ঞানীদেরও যুক্ত করতে হবে। মন্ত্রণালয় যদি দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের একত্র করে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা কার্যকর করে, তবেই এ বিষয়ে ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব। অবশ্য এটাও সত্য যে, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে গত দুটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশদ পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা আসলে পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের জন্য আমাদের প্রতিবেশীদের দিকেই তাকাতে পারি, যেমন ভারতের কেরালা, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা। তাদের থেকে বিশেষজ্ঞদের এনেও আমরা আমাদের স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনে কাজ করতে পারি।

বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দিয়েছে যেন কৃষি উৎপাদন বাড়ে এবং নানা প্রণোদনাও হাতে নিয়েছে। এটা খুব প্রয়োজন। কারণ, এই সংকটের সময় সামনের দিনগুলোতে যেন মানুষ কম খরচে খাবার পায়। পুরো পৃথিবীতে কৃষিপণ্যের বাণিজ্য কমে আসবে এবং সেই মুহূর্তে আমাদের আমদানি করতে হতে পারে। সামনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও আমাদের আমদানি করতে হবে। সেই সময়ে যেন আমরা পুষিয়ে নিতে পারি, সেই কারণেই উৎপাদন বাড়াতে হবে।

দুর্ভিক্ষ শুধু খাদ্য ঘাটতিতেই হয় না, বরং মানুষের কাছে খাদ্যদ্রব্য না পৌঁছালেও হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে হয়তো সার্বিক দুর্ভিক্ষ হবে না সারাদেশে, তবে ছোট ছোট এলাকাভিত্তিক সংকট তৈরি হতে পারে। এগুলো মোকাবিলায় খুব দ্রুত এবং সঠিক পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এ সংকটপূর্ণ মুহূর্তে জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সমাজবিদ, ব্যবসায়ী সবার মতামতের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শুধু অর্থনীতিবিদরা নিজেরাই আলাপ করেন, বিজ্ঞানীরা নিজেরাই আলাপ করেন। তাদের মধ্যে সমন্বয় না হলে কার্যকরী পরিকল্পনা সম্ভব নয়। সমাধানের গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে নেওয়ার জন্য এটি অত্যাবশ্যক।

(করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গত ৩ মে বায়োটেড আয়োজিত লাইভে আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিজ্ঞানী ড. মাসিহ উল আলম। সঞ্চালনায় ছিলেন বায়োটেড প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ড. মুহাম্মদ সওগাতুল ইসলাম। আলোচনার সারসংক্ষেপ তৈরি করেন অরণি সেমন্তী খান।)

আরও পড়ুন

×