ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

অভিজ্ঞতা

অভূতপূর্ব দুর্যোগে অপূর্ব অনুভূতি

অভূতপূর্ব দুর্যোগে অপূর্ব অনুভূতি
×

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনাভাইরাস খালি চোখে দেখা যায় না। অথচ এর নিঃশব্দ আক্রমণে মৃত্যুর কারণে বিশ্বের সারা মানবগোষ্ঠী দিশেহারা। এর এখনও কোনো কার্যকর প্রতিষেধক নেই। নিমিষে পৃথিবী ধ্বংসকারী এটম ও হাইড্রোজেন বোমাগুলো বড় বড় শক্তিধর দেশগুলোর গুদামে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এটা মানুষের কাছে এক নতুন উপলব্ধি। পৃথিবীর সমুদয় কলকারখানা, পথ-ঘাট প্রায় জনমানবশূন্য। বড় বড় দেশগুলোর অর্থশক্তি, ওষুধ শাস্ত্র, যন্ত্রশক্তি ইত্যাদি কোনো কাজেই আসছে না। যারা স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী, তারাও এখনও জানতে পারেননি কী এর প্রতিষেধক আর কীভাবেই-বা এই প্রাণঘাতী ভাইরাস দমন করা যাবে।

অনেকেই বলেছেন, করোনাভাইরাস হচ্ছে বিশ্বের সর্বকালের বড় সংকট। দীর্ঘ বছর পর পর আরও বহু সংকট অতীতে এসেছে। কিন্তু তার প্রায় সবটাই ছিল জাতীয় সংকট। যেমন- এক সময় পৃথিবী পাপে-তাপে পূর্ণ হয়ে গেলে নুহ নবীকে আল্লাহ বললেন, 'তুমি বড় করে নৌকা বানাও আর তাতে ভালো ভালো লোকজন, জোড়ায় জোড়ায় পশু-পাখি, জীবজন্তু ইত্যাদি তোল। পৃথিবী ডুবে গেলে পাপি-তাপিরা সব ধ্বংস হয়ে যায়। অতঃপর পানি ধীরে ধীরে হ্রাস পেলে নুহর নৌকা জুদি পর্বতে এসে ঠেকল। স্থলভাগ থেকে পানি সম্পূর্ণ অপসৃত হলে, ধনেজনে আবার পৃথিবী ভরে উঠল। এমনটা পৃথিবীতে আরও কতবার হয়েছে কে জানে?

আমার মনে আছে, কলেজে আইএ ক্লাসে পড়ার সময় (১৯৫২-৫৩) ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা মেজর গণি এসেছিলেন, ছাত্ররা যাতে সেনাবাহিনীতে যোগদান করে তা বলতে। তিনি বলেছিলেন, দেশকে রক্ষা করার জন্য আর কোনো আবাবিল পাখি আসবে না। তোমরাই আবাবিল পাখি সেজে দেশকে রক্ষা করবে। করোনাভাইরাসকালে আবাবিল পাখি কারা?

কেউ কেউ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকে মানব সভ্যতার ইতিহাসে মহাসংকট রূপে অভিহিত করেন, যাতে ৫০-৫৫ মিলিয়ন মানুষ তাদের প্রাণ হারিয়েছিল। ধ্বংস হয়েছিল অসংখ্য শহর, বন্দর, গ্রাম। জাপানিদের নিরস্ত্র করতে মাত্র দুটি এটম বোমার প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু এখন করোনাভাইরাস ধ্বংস করতে কোথায় বোমা ফেলতে হবে, কেউ জানে না। এখানে এক পক্ষ অদৃশ্যমান শত্রু, অন্য পক্ষ পৃথিবীর তাবৎ মানুষ, ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার। করোনার কাছে তাদের অস্ত্রশস্ত্র বাক্সবন্দি। এ এক নতুন উপলব্ধি।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ কর্তৃক ভারতে কর্ডন প্রথা, এক জেলার খাদ্যশস্য অন্য জেলায় যেতে পারবে না প্রবর্তন করায় এবং অজন্মার জন্য ১৯৪৩ সালে এসেছিল এক মহাদুর্ভিক্ষ। এই মহাসংকটেও কিন্তু মানুষ এত অসহায় ছিল না। সর্বত্র এর বিস্তারও ছিল না। পরবর্তী সময়ে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন, দুর্ভিক্ষের সময়ে নিরন্ন শ্রেণিকে খাদ্য দিতে পারলে মানুষ মরে না। আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে উভয় পক্ষ ইচ্ছা করলেই যুদ্ধ থেমে যেত। কিন্তু এ কেমন যুদ্ধ, এক পক্ষ আছে, অন্য পক্ষ থাকলেও চোখে দেখা যায় না। যোগাযোগ অসম্ভব, প্রতিষেধকও সহসা বের করা যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, এদেশে মাঝেমধ্যেই দুর্ভিক্ষ দেখা দিত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ঢাকার তৎকালীন সিভিল সার্জন জেমস টেলরের টপোগ্রাফি অব ঢাকা গ্রন্থে (১৮৩৯) বাংলাদেশের বানবন্যা ও খাদ্যাভাবের বর্ণনা রয়েছে। বিগত ষাট দশকের পর অতিমাত্রায় বর্ষাকালীন ফসলে নির্ভরতা হ্রাস করার জন্য শুকনো মৌসুমেই সেচের সাহায্যে ইরি-বোরো-গমের চাষ করে বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে যায় বাংলাদেশ। ফলে, অকালে গৃহস্থদের আঙিনা ইরি-বোরো-গমের প্রাচুর্যে ভরে ওঠে। বন্যাও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যায়।

করোনাভাইরাসের কারণে পৃথিবীর মানুষজন গৃহবন্দি হয়ে যাওয়ায় তাদের অত্যাচার থেকে প্রকৃতি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। বহু দূর থেকে এখন হিমালয় পর্বত দেখা যাচ্ছে, পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে সাগরের পানি নীল রং ধারণ করেছে। ডলফিনরা কক্সবাজারের সাগরে সাঁতার কাটছে। বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার উড়োজাহাজের ওড়াউড়ি বন্ধ থাকায় বায়ুমণ্ডল অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। সূর্যের অতিমাত্রায় বেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে আসাও অনেকটা বন্ধ হয়েছে। কলকারখানা বেশিরভাগ বন্ধ থাকায় বায়ুদূষণ আপাতত অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। সচেতন মানুষ উপলব্ধি করছে, পৃথিবীব্যাপী মানুষ নানাভাবে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার চালিয়ে বিশ্বের ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে চলেছে। ফলে সমগ্র পৃথিবী মানুষের অত্যাচারের কারণেই ক্রমাগত বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। অভূতপূর্ব দুর্যোগ মরণঘাতী করোনাই এই অপূর্ব উপলব্ধি মানুষকে এনে দিয়েছে।

আমাদের দেশে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নিঃসন্দেহে মেধাবী। কিন্তু তাদের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কর্তৃত্ব করেছেন স্বাস্থ্য বিষয়ের জ্ঞানবহির্ভূত কর্মকর্তারা। সরকার ইচ্ছা করলে যৌক্তিকভাবে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরের কার্যক্রম স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে পারে, যাতে চিকিৎসা, গবেষণা ইত্যাদি সমুদয় কর্মকাণ্ড যৌক্তিকভাবে ও সাবলীলভাবে চলতে পারে। আর এটাই ক্যাডার সার্ভিসেরও প্রতিষ্ঠিত রীতি। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেন, অন্যদের কাঁধে বন্দুক রেখে বাঘ শিকার করা যায় না। আর ন্যায্য দাবি কখনও তামাদি হয় না।

প্রবীণ শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা; জনপ্রশাসনে বিশেষ অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদকে ভূষিত

আরও পড়ুন

×