প্রতিবেশ সুরক্ষা
নদীর উৎসে পানির নিশ্চয়তা চাই আগে
এম আর খায়রুল উমাম
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
মাইকেল মধুসূদন দত্ত লিখেছিলেন- 'সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে। সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।' সবাই জানেন তার শৈশবের নদ কপোতাক্ষ নিয়ে। ভৈরবের এই শাখার পানি পায়রা বা কপোতের চোখের মতো স্বচ্ছ-শান্ত। তাই তো এ নদের নাম কপোতাক্ষ। উৎস থেকে চলা শুরু করে যে সমৃদ্ধ করেছে ছোট-বড় নানা জনপদ। কপোতাক্ষের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার লাউজানি, রাজা মুকুট রায়ের রাজধানী ছিল। কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে কপোতাক্ষের বক্ষলগ্না হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা সনেটের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
প্রারম্ভিকে উল্লেখিত সনেট মহাকবির কপোতাক্ষ নদের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে কপোতাক্ষ নদের কোলে ফিরে যাওয়ার আকুল আকুতি। তবে কবির এহেন অনুভূতি আজকের নদের অবস্থাদৃষ্টে পাওয়া যেত কি না সন্দেহ? আজ নদের প্রায় সর্বাংশ হয় ভরাট হয়ে গেছে, আর না হলে আগাছা, জঙ্গল বা কচুরিপানায় ভরা। উৎসমুখের সঙ্গে যোগাযোগহীন মশা আর কীটপতঙ্গের আবাসভূমি। কপোতাক্ষ নদ সংস্কারে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এখনও চলমান থাকলেও নদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে নদীশাসন করতে গিয়ে নদীর স্বাভাবিক চলার পথে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে নদের জীবনই ওষ্ঠাগত। আমাদের ভুল পরিকল্পনার সঙ্গে যোগ হয়েছে উজান দেশের একতরফা পানি প্রত্যাহার। ফলে নদীকে স্বাভাবিক রাখা খুব কঠিন কাজ। আর সেই কঠিন পথচলাও অসাধু উদ্যোগের ফলে মাঠে মারা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদনদীগুলোর উজানে একটা নদীতে সমস্যা হলেই ধারাবাহিকভাবে অন্য সংশ্নিষ্ট সব নদীতে তার প্রতিফলন দেখা যায়। উজানের দেশের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশের অন্যতম প্রধান নদী পদ্মায় প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যায় না। পদ্মা নদীর সূত্র ধরে মাথাভাঙ্গা, মাথাভাঙ্গা থেকে ভৈরব, ভৈরব থেকে কপোতাক্ষ; আবার কপোতাক্ষের সূত্র ধরে বেতনা, হরিহর, ভদ্রা ইত্যাদি নদী এমনই পরস্পর সংযুক্ত ও বহমান। ফলে জালের মাথায় টান পড়াতে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে উল্লেখিত অনেক নদী সংস্কার করা হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। কারণ, কোনো নদীকে নির্দিষ্ট এলাকার মনে করে এলাকাভিত্তিক সমাধানের কোনো উদ্যোগ অতীতে কোনো সমাধান দিতে পারেনি। আগামীতেও তা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা। আর আমাদের নদনদীগুলোকে বহতা করতে আজ পর্যন্ত কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি।
ভূগোলের জরিপ বিজ্ঞানে একটা কথা আছে, সম্পূর্ণ থেকে অংশ অংশ করে কাজ শেষ করতে হবে। অংশ অংশ করে সম্পূর্ণ করা যাবে না। আমাদের নদী সংস্কারের কাজগুলো অংশ অংশ করে সম্পূর্ণ করা হচ্ছে, ফলে পুরোটাই ভুল হয়ে যাচ্ছে। যশোর অঞ্চলের নদীগুলোর মধ্যে ছোট-বড় কয়েকটি নদী গত ১০-১৫ বছরের মধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি। কিছুদিনের মধ্যে তা আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। কারণ, জালের মাথায় মাথাভাঙ্গা, তারপর ভৈরব নদ এভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখনও কপোতাক্ষ সংস্কারের পাশাপাশি ভৈরব সংস্কারের কার্যক্রম চলমান। ভৈরব সংস্কার করা হলেও উৎসে পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। এতে করে জরিপ বিজ্ঞানের সূত্র না মানায় ২৭২ কোটি টাকার ভৈরব সংস্কার প্রকৃত অর্থে কোনো উপকার হবে না। কয়েক দিন পরিচ্ছন্ন ভৈরব দেখা যাবে মাত্র, তারপরই তা অতীতের রূপে ফিরে যাবে।

নদী সংস্কারের জন্য দেশব্যাপী আমাদের জনগণ যে আন্দোলন-সংগ্রাম করে, তা বহতা নদী দেখতে। জনগণের দুর্ভাগ্য, দেশের একটা নদীও বহতা করা জন্য সংস্কার করা হয়নি। সাধারণভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য নদী সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। সাধারণ জনগণ প্রাথমিকভাবে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হলে খুশি হয় আর সরকারি দলের নেতাকর্মীরা স্থানীয় উন্নয়নের কারিগরের গুণকীর্তনে মাইক ফাটিয়ে ফেলে। প্রকল্প শেষে সাধারণ মানুষ গভীর হতাশা নিয়ে লক্ষ্য করে, তাদের প্রত্যাশার ধারেকাছেও নদী সংস্কার হয়নি। অথচ সরকার ও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ জেনেবুঝে দেশব্যাপী এভাবেই নদী সংস্কার করে চলেছে। চলমান কপোতাক্ষ সংস্কার এমনভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সরকার যেভাবে নদী সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চায়, স্থানীয় জনগণ সেই পদ্ধতিকে সমাধান বলে মনে করছে না। ফলে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কপোতাক্ষ সংস্কারে টিআরএম পদ্ধতিকে একমাত্র সমাধান বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করে যাচ্ছে। টিআরএম সফলতা নয়, ব্যর্থতার পরিচয় রেখেছে ভবদহ অঞ্চলে। এখনও সেই টিআরএমকে একমাত্র সমাধান ভাবা কতটা যুক্তিযুক্ত, যেখানে ভবদহ জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম বাতিল করে নতুন করে স্থানীয় নদী-খাল উন্মুক্ত করার প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। ভুক্তভোগী মানুষের প্রত্যাশা, সরকার এবং সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ কপোতাক্ষ সংস্কারেও নতুন করে ভাববে।
বৃষ্টির পানির বহতা নয়, জোয়ার-ভাটা খেলা বহতা নদী সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। জনগণের এই প্রত্যাশা পূরণ করতে গেলে নদীর উৎসমুখে পানির নিশ্চয়তা জরুরি। জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদীগুলোর মাথার ওপরে নদীর উৎসে পানির নিশ্চয়তা দিতে হবে। কপোতাক্ষ নদের জন্য যা অবশ্যই মাথাভাঙ্গা নদী। সেখান থেকে ভৈরব হয়ে কপোতাক্ষ পানি পাবে। এভাবে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে নদী সংস্কারে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে; কিন্তু লাভের লাভ কিছু হবে না। অতীতে হয়নি, এখনও হবে না; আর আগামীতে তো লাভের প্রশ্নই আসে না। তেরোশ' কোটি টাকা ব্যয় করে দুবার গড়াই সংস্কার জনগণের অভিজ্ঞতায় আছে। এতে করে কোনো লাভ হয়েছে বলে জনগণ দেখেওনি বা মনেও করে না।
সরকার যদি আন্তরিকভাবে নদী সংস্কারে নিবেদিত হতে চায়, তবে প্রথমে এ অঞ্চলের নদীগুলোর উৎসমুখে পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। আজ এটা প্রমাণিত, সত্য নদীকে বহমান দেখতে উৎসে পানির কোনো বিকল্প নেই। আর এই পানির নিশ্চয়তায় পদ্মা ব্যারাজ একমাত্র সমাধান। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারে, এভাবে অংশ অংশ করে সম্পূর্ণ না করে সম্পূর্ণ থেকে অংশ অংশ করে নদী সংস্কারের কাজ করা যায় কি না। এতে উজানের পানির ব্যবস্থা করেই ভাটিতে নামতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশকে বাঁচাতে গেলে নদীকে বাঁচাতে হবে। এর বিকল্প নেই।
সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)