ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

করোনা সংকট

জনস্বাস্থ্যে পথ দেখাতে পারে কেরালা

জনস্বাস্থ্যে পথ দেখাতে পারে কেরালা
×

ড. মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক কলামে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর করোনা প্রতিরোধে দেশটির কেরালা রাজ্যের সাফল্য বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৪ মার্চ যখন ভারতে লকডাউন ঘোষণা করেন, তখন ২৮টি রাজ্যের মধ্যে কেরালায় করোনা আক্রান্ত রোগী ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সবার আগে করোনা রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সফল হয়েছে সেই কেরালাই। প্রায় চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম, মৃত্যুর হারও মাত্র ০.৫৩ শতাংশ।

কেরালার এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের মূলমন্ত্র কী? রাজ্যজুড়ে অতি দ্রুত করোনা টেস্টিং, ট্রেসিং অব কন্টাক্টস এবং ট্রিটমেন্টকে (ট্রিপল টি) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আক্রান্ত পরিবারকে ২৮ দিনের কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে পালন করে চলেছে কেরালা। ভারতের অন্যান্য রাজ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুসারে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন চালু করছে। শুরু থেকে কেরালা করোনা-অ্যালার্ট জারি করে রাজ্যের চারটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা সব যাত্রীকে বাধ্যতামূলক চেকআপের আওতায় নিয়ে এসেছে। সন্দেহভাজনদের হাসপাতালে বা কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে গেছে। মার্চের প্রথম দিকেই স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং যেখানেই প্রয়োজন লকডাউন আরোপ করেছে।

কেরালায় এই 'টোটাল মোবিলাইজেশন' সম্ভব হয়েছে বহু বছর ধরে যথোপযুক্ত অর্থায়ন সহকারে অগ্রাধিকার দিয়ে গড়ে তোলা কেরালার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার কারণে। আধুনিক জনস্বাস্থ্য কাঠামোর পাশাপাশি গ্রামীণ জনগণকে ক্ষমতা কাঠামোর সক্রিয় অংশীদারে পরিণত করা হয়েছে। মহামারির সময়েও কেরালার শিক্ষিত ও সচেতন জনগণ দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে মহামারির 'কমিউনিটি সংক্রমণ' পর্যায়কে সীমিত রাখতে পেরেছে। আক্রান্ত হলেই চিকিৎসা গ্রহণ, ভলান্টারি আইসোলেশন এবং চিকিৎসা-কর্মীদের সঙ্গে সর্বাত্মক সহযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত আরোগ্য লাভে সফল হয়ে চলেছে তারা। ভারতের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্য কেরালায় 'কমিউনিটি সংক্রমণের' ঝুঁকিও সবচেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু সেখানে সংক্রমণ ও তদ্‌জনিত মৃত্যু সর্বনিম্ন রাখার সাফল্যের রহস্য তাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই।

মনে রাখতে হবে, রাজ্যটি বিশ্বকে 'উন্নয়নের কেরালা মডেল' উপহার দিয়েছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য মোতাবেক, ২০১৮ সালে কেরালার জনগণের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২৪০০ ডলার, যা ভারতের জনগণের গড় মাথাপিছু জিডিপি ১৯৮৩ ডলারের চাইতে সামান্য বেশি। ক্রয়ক্ষমতার সাম্য (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি) ভিত্তিতে কেরালার মাথাপিছু জিডিপি ২০১৮ সালে ৯২০০ পিপিপি ডলার। কিন্তু মানব উন্নয়ন সূচকের স্কোরে কেরালা ভারতের সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে ১৯৯০ সাল থেকেই। শিশুমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার, জন্মহার, মৃত্যুহার, মোট প্রজনন হার, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার, সর্ব পর্যায়ের শিক্ষিতের হার, মৌল স্বাস্থ্যসেবায় অভিগম্যতা, ভর্তুকি দামে খাদ্য-রেশন ও ফিডিং ব্যবস্থা, চিকিৎসক-জনসংখ্যা অনুপাত- তাবৎ সামাজিক সূচকেও কেরালা অনেক উন্নত দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। কেরালার জনগণ ৯৪ শতাংশ শিক্ষিত এবং শতভাগ মৌল স্বাস্থ্য সুবিধা ও চিকিৎসা সুবিধার আওতায়। ধনীদের জন্য ব্যয়বহুল হাসপাতাল গড়ে তোলার চাইতে অর্থনৈতিক অবস্থান-নির্বিশেষে সব জনগণকে সুলভ অথচ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছানোর ব্যাপারে কেরালা বেশি যত্নবান। কেরালার সব প্রবীণ কৃষক মাসিক পেনশন পান।

জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতার দিক থেকেও কেরালা ভারতের পথিকৃৎ। জনগণের মাথাপিছু জিডিপি কম হলে সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার মান দারিদ্র্যপীড়িত হবে- পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে প্রতীচ্যের উন্নয়ন-তাত্ত্বিকদের এই মাথাপিছু আয়কেন্দ্রিক ধারণা সবার আগে ভ্রান্ত প্রমাণ করেছিল দুটি উন্নয়ন-মডেল। একটি হলো, সমাজতান্ত্রিক কিউবা, অপরটি কেরালা। মাথাপিছু জিডিপি বেশি না হলেও যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতের মতো নিম্ন আয়ের দেশেও ঈর্ষণীয় জীবনযাপন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, কেরালা তার নজির। আয় ও সম্পদবৈষম্য নিয়ন্ত্রণে রেখে জনগণের মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়িয়ে চলেছে রাজ্যটি।

পরিতাপের বিষয় যে, বাংলাদেশ 'মুক্তবাজার অর্থনীতি' দর্শনকে অনুসরণ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাজার ও ব্যক্তি খাতকে উৎসাহিত করার নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে। এ দেশে ধনাঢ্য, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগণের জন্য ব্যয়বহুল হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার হিড়িক চলেছে চার দশক ধরে। স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সেবায় সরকারি ভর্তুকি কমানোর কারণে জনগণের চিকিৎসা খরচের প্রায় ৭৭ শতাংশ এখন জোগান দিতে হচ্ছে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ফান্ড থেকে। সরকারি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বরাদ্দ কয়েক দশক ধরেই জিডিপির ১ শতাংশের কম।

দেশের গ্রামাঞ্চলে যে কয়েক হাজার স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলো অব্যবস্থাপনা ও অকিঞ্চিৎকর অর্থায়নের শিকার হয়ে নামকাওয়াস্তে অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তার-নার্স ও হেলথ টেকনোলজিস্ট না থাকায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো নিজেরাই প্রতিবন্ধী অবস্থায় চলে গেছে। ওগুলোর বেশিরভাগই এখন আরোগ্য-নিকেতন বিবেচিত হওয়ার পরিবর্তে 'নিম্নবিত্তের মরণের কারখানায়' পরিণত হয়েছে। খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবী তদবিরবাজ এবং মুনাফালোভী লবিস্টদের দখলে চলে গেছে। এমনকি মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদটিও বোধ হয় এখন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় না।

এমতাবস্থায়, করোনাভাইরাস মহামারি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম দুর্গতির চিত্র সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। পত্রিকায় দেখলাম, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ১৪ মে এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, মহামারির মোকাবিলায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা 'মুখ থুবড়ে পড়েছে'। প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে মুনাফাবাজিতে যতখানি আগ্রহী, তার তুলনায় মহামারি রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে তাদের অবিশ্বাস্য ও অমানবিক অনীহা। প্রস্তুতির অভাবও অত্যন্ত নগ্নভাবে এবার ধরা পড়ে গেছে। অর্থনীতিতে 'বাজার ব্যর্থতা তত্ত্ব' যে সত্যটি বহুদিন আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছে তাহলো, সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগণের কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কখনোই সমর্থ হবে না প্রাইভেট সেক্টর এবং বাজারিকরণ।

বিশ্বের সর্বাধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধিকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাত এবারের করোনা মহামারির মৃত্যুর মিছিল থামাতে যে অবিশ্বাস্য ব্যর্থতা দেখিয়েছে ও চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে, তা থেকে বিশ্ব নিশ্চয়ই শিক্ষা নেবে যে, দেশের সব জনগণের স্বাস্থ্যসেবা কখনোই শুধু বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পঙ্গু এবং মরণাপন্ন অবস্থায় ঠেলে রেখে মুক্তবাজার অর্থনীতির আফিমের মৌতাতে মশগুল থাকলে মহামারির মৃত্যুর মিছিল মোকাবিলায় লেজে-গোবরে অবস্থায় পড়তে হবে সবচেয়ে সম্পদশালী অর্থনীতির পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোকেও।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস- 'কেরালা মডেল' এখনও আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য অনুকরণীয় মডেল হতে পারে। দেশে যে কয়েক হাজার গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলোকে কেরালার স্বাস্থ্য কাঠামোর আদলে পরিপূর্ণভাবে ঢেলে সাজানোর সুযোগ রয়েছে। কেরালার আদলে আমাদের দেশেও মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ এবং হেলথ টেকনোলজিস্ট ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলার ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা যায়। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য প্রশাসন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সমাজ-অভিভাবকদের মনিটরিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায়। কেরালার আদলে সব জনগণকে আধুনিক অথচ সুলভ স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নিয়ে আসা যায়।

কেরালার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শিক্ষা নিয়েছে সমাজতান্ত্রিক কিউবার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে। কিউবার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আকুল আবেদন, ইতিহাস আপনাকে সুযোগ এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে করোনা মহামারির প্রতিরোধ যুদ্ধে সফল করার জন্য কেরালা এবং কিউবার আদলে এর খোলনলচে বদলে ফেলুন।

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×