ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

অর্থনীতি

কৃষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কৃপণতা

কৃষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কৃপণতা
×

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

'মাছে-ভাতে বাঙালি' আমাদের সংস্কৃতির অংশ। সেটা সময়ে সময়ে ডাল-ভাতও হতে পারে। আবার মুরগি-ভাতও হতে পারে। পোলাও হতে পারে, আবার বিরিয়ানিও হতে পারে। হতে পারে মরিচ দিয়ে পান্তাভাত। যেভাবেই হোক না কেন, ভাত আমাদের জীবনের অংশ। অস্তিত্বের মূল উপাদান। বেঁচে থাকার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আমাদের নিত্যদিনের খাদ্যের অনিবার্য উপাদান। তাই চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ যখন বিশ্বে তৃতীয় স্থান অধিকার করে, তখন আমাদের জন্য তা এক বিরাট খবর বটে। করোনাভাইরাসের এ রকম ক্রান্তিকালে সেটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও অনেক বড় ইতিবাচক বার্তা বহন করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ গত বছরও চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চার নম্বরে ছিল। প্রথম চীন, দ্বিতীয় ভারত, তৃতীয় ইন্দোনেশিয়া। এবার ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। বাংলাদেশ উৎপাদন করেছে ৩৬ মিলিয়ন টন চাল।

মোট উৎপাদনের হিসাবে চীন প্রথম ও ভারত দ্বিতীয় হলেও যদি জনসংখ্যা ও আয়তনের হিসাবে একটি আনুপাতিক ও পৌনঃপুনিক পরিসংখ্যান করি, তাহলে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থানই প্রথম হওয়ার কথা। কিন্তু এ রকম একটি খবর সংবাদমাধ্যমে খুব একটা বড় জায়গা পায়নি। অথচ কৃষকদের এ অবদানের কারণেই করোনা সংকটকালে আগামী ছয় মাস যে বাংলাদেশে ১৭/১৮ কোটি মানুষের খাদ্যের সংকট হবে না- এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। যারা ১৭/১৮ কোটি মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করেছে এবং বিশ্বের দরবারে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে আমাদের এত কৃপণতা কেন?

এই মে মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন, যা বিশ্বব্যাপী নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে গৃহীত, তাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ২০১৯-২০ সালে চাল উৎপাদনে পৃথিবীতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। কারণ গত বছরের (২০১৮-১৯) তুলনায় নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ২ শতাংশ চাল বেশি উৎপাদন করেছে। ইউএসডিএর তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মানুষের প্রধান তিনটি খাদ্য চাল, গম ও ভুট্টার উৎপাদন কমেছে। অথচ বাংলাদেশে অবিশ্বাস্যভাবেই চালের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ইউএসডিএর তথ্যানুযায়ী দেশের স্বাধীনতাপরবর্তী সময় থেকে বর্তমানে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে তিন গুণ। চাল উৎপাদন বিবেচনায় বাংলাদেশের পরপরই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (৪র্থ), ভিয়েতনাম (৫ম), থাইল্যান্ড (৬ষ্ঠ), মিয়ানমার (৭ম), ফিলিপাইন (৮ম), জাপান (৯ম) এবং পাকিস্তান (১০ম)।

এখানে উল্লেখ্য, চলতি বছরে আমন মৌসুমে উল্লেখযোগ্য এবং রেকর্ড পরিমাণ ধানের ফলন হয়েছে। ফলে চাল উৎপাদন বেড়েছে। গত আউস মৌসুমেও চালের উৎপাদন হয়েছে ব্যাপক, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। চলতি বোরো মৌসুমেও রেকর্ড পরিমাণ চালের উৎপাদন হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে চার লাখ টন। তিন মৌসুমের চালের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্মিলিত ফল হচ্ছে বছরব্যাপী ব্যাপক প্রবৃদ্ধি, যা বাংলাদেশকে বিশ্বের তৃতীয় চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশে চাল উৎপাদনের এ সাফল্যের পেছনে আর কী কী কারণ রয়েছে- এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন খোদ খাদ্যমন্ত্রী। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খাদ্যমন্ত্রীর ভাষ্যানুযায়ী, 'প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও চাল উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে দেশে। ঘাতসহিষুষ্ণ জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করে তা আবাদে লবণাক্ত, খরা ও হাওরাঞ্চলের কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে এসব এলাকায় এখন একটির পরিবর্তে দুটি ধানের আবাদ হচ্ছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি ধান করা যায় কিনা, সেটি নিয়েও ভাবছি আমরা। এবার হাওরের ধান কাটায় সফলতার জন্য যান্ত্রিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকের জন্য আর্থিক প্রণোদনা থেকে শুরু করে বিপণন, সরবরাহ ও উপকরণের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের খাদ্যশস্যের চাহিদা নিজেদের উৎপাদনের মাধ্যমেই পূরণ করতে হবে।'

খাদ্যমন্ত্রীর ভাষ্যের বাইরেও যে কৃষকদের নিজস্ব একটা নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও কষ্টসহিষ্ণুতা রয়েছে- সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এখানে স্মরণ করা জরুরি। কেননা, যারা গ্রাম-গঞ্জে বাস করেন তারা প্রত্যক্ষ করেন কীভাবে এদেশের কৃষকরা ঝড়-বৃষ্টিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে জীবন বাজি রেখে কৃষিকাজ অব্যাহত রাখেন। এসব কৃষক বৃষ্টিতে ভেজেন আর রোদে শুকান, কিন্তু নিজের হাল-চাষের কোনো অযত্ন হতে দেন না। তাই, এ দেশের অর্থনীতিতে খাদ্যের অব্যাহত জোগান প্রদানে কৃষকদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন অর্থাৎ জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ এখনও কৃষিতে নিয়োজিত এবং মোট শ্রমশক্তির ৬০ শতাংশ এখনও কৃষি খাতেই নিয়োজিত। এখানে কৃষি বলতে বৃহত্তর কৃষি খাতকে বোঝানো হয়েছে।

চালের পাশাপাশি সবজি উৎপাদনেও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়; মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ; আলু উৎপাদন বাংলাদেশে চাহিদার চেয়ে উদ্বৃত্ত এবং বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম; আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম; পেয়ারা উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম। এভাবে বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের কৃষি, কৃষি খাত ও উৎপাদন বাংলাদেশের স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রপ্তানি পণ্যের জায়গাও ক্রমান্বয়ে দখল করছে, যা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছে। কিন্তু সর্বাগ্রে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সফলতা।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমির ক্রমসংকোচন, শিল্পায়নের প্রভাব, নগর-বিস্তারের প্রভাব, বৈরী আবহাওয়া, তথাকথিত 'উন্নয়ন'-এর প্রভাব এবং পর্যাপ্ত সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের মধ্যেও এদেশের কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চাল উৎপাদন করছে। সবচেয়ে বড় কথা, করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কারণে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব যখন বিরাট অর্থনৈতিক সংকট ও বড়মাপের অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের একটা বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে এবং বিদেশে শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যেখানে একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যাক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে আসার জন্য বসে আছে, সেখানে চাল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে এসেছে। তাই আসুন, কৃষকদের এ সময়োপযোগী অবদানকে স্বীকার করে এদেশের কৃষক সমাজের প্রতি সব মানুষের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। চালের এ উৎপাদন কৃষকদেরই অবদান; তাদেরই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।

নৃবিজ্ঞানী; অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×