করোনা মোকাবিলা
সীমিত পরিসরের অসীম বাস্তবতা
ড. তারেক শামসুর রেহমান
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
দীর্ঘ ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল রোববার থেকে 'শর্তসাপেক্ষে' খুলেছে সরকারি ও বেসরকারি অফিস। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২৬ মার্চ থেকে কয়েক দফায় সাধারণ ছুটি বাড়িয়েছিল। এবার ছুটি না বাড়িয়ে 'কঠোর বিধিনিষেধ' মেনে ১৫ জুন পর্যন্ত অফিস খোলার অনুমতি দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিপণিবিতানগুলো খুলতে শুরু করেছে। আর গণপরিবহন 'সীমিত পরিসরে স্বল্প সংখ্যক' যাত্রী নিয়ে চলাচল শুরু করেছে।
সরকারের 'লকডাউন' প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, এর ফলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার আরও বাড়বে কিনা? রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন স্বাস্থ্য বুলেটিনে জানানো হয়েছিল, দেশে তার আগের ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে রেকর্ড সংখ্যক ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সরকারি হিসাবেই সোমবার পর্যন্ত করোনায় মোট মৃত্যু ৬৭২ জন। সোমবার পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজারের কিছু বেশি নমুনা। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র এই সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা কিছুই নয়। আমরা যদি বেশি নমুনা পরীক্ষা করতাম, আক্রান্তের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেত। এমন পরিস্থিতিতে রোববার থেকে সবকিছু 'উন্মুক্ত' হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিল মাত্র।
আমরা দক্ষিণ কোরিয়ার দৃষ্টান্ত দিতে পারি। দক্ষিণ কোরিয়া কভিড-১৯ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিল। কিন্তু নাইট ক্লাব ও বারগুলো খুলে দেওয়ায় সেখানে সংক্রমণের হার আবার বেড়েছে। উহানের কথাও উল্লেখ করা যায়। উহানে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আনার পর মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেখানে নতুন করে সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। ইরান থেকেও একই খবর এসেছে। তবে এটাও ঠিক; ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু ইউরোপে নতুন করে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমানো যায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে যে, লকডাউন শিথিল করলে ভাইরাসটি আবারও ফিরে আসতে পারে। লন্ডনের গার্ডিয়ানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ইয়ান জোনস মন্তব্য করেছেন এভাবে যে, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে এটা অবশ্যম্ভাবী। অর্থাৎ, ভাইরাসটির পুনরুত্থান ঘটবে। হুর অভিমত অনেকটা তেমনই। তাড়াতাড়ি লকডাউন প্রত্যাহার করলে এর একটা পরিণতি আছেই।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে একটা বড় শঙ্কার জায়গা হচ্ছে গণপরিবহন। এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে, 'সীমিত আকারে' গণপরিবহন চলবে। ৫০ শতাংশ সিট খালি রাখতে হবে। আর এ জন্য ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু গণপরিবহনের ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব ভালো নয়। এই যে 'সীমিত আকারে' ও ৫০ শতাংশ সিট খালি রাখার কথা বলা হলো, এটা মানা হবে না বলেই অনেক পরিবহন বিশেষজ্ঞের অভিমত। কেননা, আমরা বারবার দেখেছি পরিবহন মালিকদের স্বার্থেই কোনো সিদ্ধান্ত অতীতে কার্যকর করা যায়নি। ফলে লকডাউনের সুযোগ নিয়ে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়াল, যা সাধারণ যাত্রীদের এখন পরিশোধ করতে হবে। এতে করে যাত্রীসংখ্যা আগের মতোই থাকবে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে। আমাদের দুর্ভাগ্য এখানেই যে, গণপরিবহনের ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করা যায় না উচ্ছৃঙ্খল পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের কারণে। যদিও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি বক্তব্য আছে এ রকম- 'স্বাস্থ্যবিধির শর্তগুলো না মানলে পরিবহনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' অতীতে এ ধরনের বক্তব্যের পরও পরিস্থিতি খুব উন্নতি হয়েছিল- তা বলা যাবে না।

তৃতীয়ত, নিউজিল্যান্ড অত্যন্ত সফলভাবে 'সোশ্যাল বাবলস' তত্ত্ব প্রয়োগ করে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে পেরেছে (সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ২২ জন। নতুন মৃত্যু নেই)। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব প্রয়োগ একটি কঠিন বিষয়। এই তত্ত্বটি এমন যে, মানুষ তার পরিববার ও সীমিত কিছু বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয়। এভাবে তারা একটি বাবল বা বুদবুদ তৈরি করে। আর কিছু নিয়মকানুন মেনে আরেকটি বুদবুদের মিথস্ট্ক্রিয়া হতে পারে, যা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করতে সাহায্য করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী পার ব্লক মনে করেন, যদি সীমিত কিছু গ্রুপ ও লোকের মধ্যে আমরা সম্পর্ক রক্ষা করি, যোগাযোগ রাখি, তাহলে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কম। ইউরো নিউজকে তিনি এ কথা বলেন ৮ মে। ইউরো নিউজ সোশ্যাল বাবলের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও দিয়েছে, কীভাবে ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সচেতন নয়। এখানে এই তত্ত্ব প্রয়োগ করা যাবে না। ফলে লকডাউন তুলে নেওয়ায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক 'ইন্টার অ্যাকশন' ভাইরাসটি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
চতুর্থত, বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতিরি উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না। মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছেই দিন দিন। বাংলাদেশ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে অর্থনীতি উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে করোনায় সংক্রমণের হার বৃদ্ধি। বাংলাদেশ সম্ভবত 'হার্ড ইমিউনিটি'র দিকে গেছে। অর্থাৎ, ঈদে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেশ উপেক্ষা করে দলবেঁধে, গাদাগাদি করে 'ঈদ করতে' বাড়ি গেছে এবং একই প্রক্রিয়ায় ফিরেও এসেছে। এতে করে একটা আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে, বিপুলসংখ্যক মানুষের গ্রামে চলে যাওয়ায় ভাইরাসটি এখন গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটাই 'হার্ড ইমিউনিটি'। এটা এমন একটি ধারণা, যেখানে বিপুল জনগোষ্ঠীর মানুষ কোনো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে এমনভাবে প্রতিরোধী হয় যে, সংক্রমণটি আর ছড়ায় না। কিন্তু কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে এ ধারণা কতটুকু প্রযোজ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। করোনাভাইরাস বাংলাদেশে 'পিক'-এ পৌঁছে গেছে কিনা, এ নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। খুব দ্রুত ভাইরাসটি বিশ্ব থেকে বিদায় নেবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিকাইল অস্টারহোল্ম এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২০২০ সালে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। ২০২২ সাল পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে থেকে যাবে। ততদিনে ভ্যাকসিন বা টিকা আবিস্কৃত হবে এবং ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। করোনাভাইরাসের সঙ্গেই বাংলাদেশকে 'চলতে' হবে। তবে নিয়ন্ত্রণ জরুরি। ইউরোপের অনেক দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী 'ভাইরাস ট্র্যাকার' ব্যবহার শুরু করেছে। এর মাধ্যমে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায় অনেক মানুষের মাঝ থেকে। বাংলাদেশেও 'ভাইরাস ট্র্যাকার' ব্যবহার করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আইসোলেশন সেন্টারে নিয়ে যেতে পারে। এ জন্য বিভিন্ন জেলায় যেসব স্টেডিয়াম রয়েছে, সেখানে অস্থায়ী আইসোলেশন সেন্টার করা যেতে পারে। গণপরিবহন যেখানে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সে কারণে গণপরিবহনে কিছুটা সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং একই সঙ্গে গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে দিলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে। সরকার বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে। মোদ্দা কথা, লকডাউন শিথিল করে সরকার একটি ঝুঁকি নিয়েছে, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু সংক্রমণ কমানোর ব্যাপারে উদ্যোগটাই হবে এখন প্রধান।
অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
[email protected]