ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

অঞ্চলভিত্তিক করোনা মোকাবিলা

রঙ তিন হোক, অঙ্গীকার এক

রঙ তিন হোক, অঙ্গীকার এক
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনা মোকাবিলায় গোটা দেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ রঙে চিহ্নিত করার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা বিলম্বিত বোধোদয় বললেও অত্যুক্তি হয় না। কভিড-১৯ আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অনুযায়ী এমন রঙে বিভিন্ন অঞ্চল চিহ্নিত করার এই চর্চা ভাইরাসটি মোকাবিলায় সফল দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমরা আগেই দেখেছি। এশিয়ায় ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড ছাড়াও প্রতিবেশী ভারতে একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কোনো কোনো রাজ্যে। বস্তুত এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও মে মাসের মাঝামাঝি আমরা জোরের সঙ্গে এই পরামর্শ দিয়েছিলাম। সাধারণ ছুটি ঘোষণার কিছুদিন পরও যদি এই পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তাহলে এতদিনে পরিস্থিতি অবনতি নয়, বরং উন্নতি দেখতে পেতাম। এখন 'সীমিত পরিসরে' খুলে দেওয়া নিয়ে যে দ্বিধা ও সমালোচনা রয়েছে, তাও থাকত না বলে আমরা মনে করি। বিলম্বে হলেও যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এ জন্য আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সাধুবাদ জানাই। এখন আমরা চাইব, এই সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ সংক্রান্ত উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। আমরা দেখতে চাই, বাস্তবায়নে কোনো বিলম্ব করা হচ্ছে না।
মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার একটি বড় কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অহেতুক বিলম্ব ও বিভ্রান্তি। চীনে উহানে যখন করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়, তখন থেকেই আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে পুনঃ পুনঃ তাগিদ দিয়েছি যে- অবিলম্বে বিমান, নৌ, স্থলবন্দরসহ দেশের প্রবেশপথগুলোতে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হোক। দুর্ভাগ্যবশত এ ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের ঔদাসীন্য ও দায়সারা ভূমিকাই দেখা গেছে কেবল। আমরা চেয়েছিলাম, দেশের প্রবেশপথগুলোতে করোনা শনাক্ত বা সন্দেহভাজনদের কঠোরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হোক। কিন্তু দেখা গেছে, বিমানবন্দরে আটক বা পরীক্ষা না করে পরে পুলিশের কাছে তালিকা নিয়ে বাড়ি বাড়ি খোঁজ করা হয়েছে। বিষয়টি ছিল খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতোই দুঃসাধ্য। আমাদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করে, দেশের প্রথম পর্যায়ের করোনা আক্রান্তরা প্রবাসফেরত বাংলাদেশি কিংবা তাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকেই এসেছিল। দেশে প্রথম যখন করোনায় বা করোনা উপসর্গে মৃত্যু হতে থাকে, তখনও যদি গোটা দেশ কার্যকর লকডাউন করা যেত, হয়তো পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না। আমরা দেখেছি, পরে যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা বন্ধ করা হয়; গণপরিবহন বন্ধ না করেই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা গোড়া কেটে আগায় জল ঢালার সমতুল্য হয়েছিল।
আমরা অস্বীকার করি না যে, সরকারের তরফে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তরিকতা ও উদ্যম রয়েছে যথেষ্ট। বাংলাদেশে যেভাবে দুই মাসের বেশি সময় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য যথেষ্ট। করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে প্রায় যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও যে চিকিৎসা ও সেবা দেওয়া হচ্ছে, তাও কম নয়। কিন্তু যথাসময়ে যদি পদক্ষেপ না নেওয়া যায়, তাহলে সঠিক পদক্ষেপও বৃথা ও ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমাদের মনে আছে, মে মাসের মাঝামাঝি সমকালেই এক বিশেষ মন্তব্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা ডা. মোজাহেরুল হক বলেছিলেন- করেনা মোকাবিলায় সফল হওয়ার সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। কারণ ভাইরাসটি কমবেশি সব জেলায় পৌঁছে গেলেও অনেক উপজেলা এখনও নিরাপদ। তারপর ইতিমধ্যে যদিও দুই সপ্তাহ চলে গেছে; যদিও চলতি মাসের শুরু থেকে সীমিত পরিসরে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন চালু হয়েছে। আমরা মনে করি- লাল, হলুদ, সবুজ রঙে বিভিন্ন অঞ্চল চিহ্নিত করে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস এখনও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এমনকি উপজেলাগুলোকে 'লকডাউন' করে দিয়ে সেখানে স্বাভাবিক পরিসরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাও সম্ভব। ভিন্ন ভিন্ন রঙে চিহ্নিত করা গেলে পরীক্ষা ও চিকিৎসাও হয়ে উঠবে আরও বেশি কার্যকর। করোনা মোকাবিলায় এখন প্রায় সবকিছু রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় যে অব্যবস্থাপনা দেখা যাচ্ছে, তাও সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। সহজ হবে ইতোমধ্যে বহুলাংশে ভেঙে পড়া সাধারণ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থারও পুনরুজ্জীবন। করোনার বিরুদ্ধে সবাই এক হয়ে লড়াইয়ের বিকল্প নেই। তিন রঙে বিভক্ত হওয়ার মধ্যেও প্রতিফলিত হোক সেই একই অঙ্গীকার। অতীতের বিলম্ব ও বিভ্রান্তির অবকাশ আর নেই। সেটা হবে আত্মঘাতী।

আরও পড়ুন

×