ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

রাজনীতি ও জাতীয় পার্টি

রাজনীতি ও জাতীয় পার্টি
×

সুদীপ্ত সাইফুল

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০ | ১২:০০

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির অবস্থান নির্ধারণ করা কিছুটা কঠিন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিভিন্ন নাটকীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের মর্যাদা পায় জনসমর্থনের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে থাকা এ দলটি। বিরোধী দল হিসেবে মর্যাদা পেয়েও একাধিক নেতা মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ায় ওই সময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল জাপা। রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের অনেকেই জাতীয় পার্টিকে গৃহপালিত বা সরকারি বিরোধী দল হিসেবেও আখ্যা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে আলোচনায় থাকার পরিবর্তে জাতীয় পার্টি বেশি আলোচিত ছিল এরশাদের হুটহাট সিদ্ধান্ত, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ভাঙন, পারিবারিক কলহ ও উত্তরাধিকার প্রশ্নে। পার্টির চেয়ারম্যান ছাড়া অন্য নেতারা ভয়ে থাকতেন, কে কখন বহিস্কার বা পদচ্যুত হবেন। জাতীয় পার্টি যে আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না, তা এরশাদের জীবদ্দশায় স্পষ্ট হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর দলটিতে ক্ষয় ধরবে এবং দলটি ধীরে ধীরে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, এ ধারণা সবারই ছিল। বাস্তবেও তাই হচ্ছে। একটি রাজনৈতিক দলের জনগণের প্রতি যে প্রতিশ্রুতি বা দায়বদ্ধতা থাকে, বর্তমানে জাতীয় পার্টিতে তার ছিটেফোঁটাও নেই। এরশাদ বিয়োগের পর জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠেছে। গত মঙ্গলবার রংপুরের পল্লী নিবাসে এরশাদপুত্র সাদের ওপর হামলা ও এর পরিপ্রেক্ষিতে যা যা ঘটেছে, তা এই দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ।

জাতীয় পার্টি একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল, তাতে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলে এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় দলের নাম জাতীয় পার্টি। তবে যোগ্য নেতৃত্ব, উপযোগী কর্মপন্থা ও জবাবদিহি না থাকায় ঘরেই ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে দলটি। যার সুফল বহুলাংশে ঘরে তুলেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অনেকেই বলে থাকেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনুকম্পায় বিরোধী দলের মর্যাদাসহ রাজনৈতিক ময়দানে টিমটিম করে জ্বলছে জাতীয় পার্টি। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিরোধী দল হিসেবে যে জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়, তা হয়তো মানেন না স্বয়ং জাপা নেতারাও। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন দেশে সংকটকালে বিরোধী দলগুলো সরকারের সঙ্গে মিশে জাতিকে নেতৃত্ব দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়টি কঠিন হলেও মানুষ প্রত্যাশা করে, বিরোধী দল অন্তত নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে জাতির কল্যাণে কাজ করবে। চলমান করোনা মহামারিতে জাতীয় পার্টি এ কাজটি করবে, এটাই স্বাভাবিক। আরেকটি বিষয় হলো, একটি রাজনৈতিক দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকা অস্বাভাবিক নয়। এর কারণে হয়তো গোটা দল একসঙ্গে কাজ করতে পারবে না; কিন্তু দলের সক্রিয় গ্রুপগুলো জাতির সংকটে এগিয়ে আসতে পারত। কিন্তু এসবের কিছুই হয়নি। জাতীয় পার্টি একদিকে সরকারের সঙ্গে এক হয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করছে না, অন্যদিকে বিরোধী দল বা একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবেও কোনো ভূমিকা রাখছে না। এছাড়া, দলটির সক্রিয় কোনো অংশেরও ভূমিকা আমরা দেখিনি। উপরন্তু তারা দুর্যোগের মধ্যেই দলীয় কোন্দল আরও স্পষ্ট করে নিজেদের আলোচনায় রাখতেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

জাতীয় পার্টিতে নাটকীয়তা নতুন কিছু নয়; কিন্তু দেশে যে সময় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ক্রমেই নতুন রেকর্ড গড়ছে, সেই সময় ডিও লেটারের মতো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যে গোলমাল পাকানো হয়েছে এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবারের পর থেকে যে ধরনের নাটকীয়তা চলছে, তা নিঃসন্দেহে রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জীবদ্দশার শেষ পর্যায়ে এরশাদ তার দলকে জনগণের দলে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। হয়তো তিনি অনেকের মতোই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, তার দল সত্যিকার অর্থেই জনগণের দল নয়! রংপুর অঞ্চলের মানুষের সমর্থনে টিকে থাকা দলটি অতীতে ওই অঞ্চলের উন্নয়নে কী করেছে, তা সহজেই বোধগম্য। রংপুর অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে সচেতন মহলের অনেকেই জাতীয় পার্টিকে দায়ী করেন। ভোটে বিজয়ী হয়ে জাপার সাবেক চেয়ারম্যান এরশাদসহ তার সাংসদরা জনগণের ভাগ্যের কথা কতটা চিন্তা করেছিলেন বা হাল আমলের জাপা নেতারা জনগণের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ, তা স্পষ্ট হয় ডিও লেটারে স্বাক্ষর করাকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট বা অতীতের মনোনয়ন বাণিজ্যের খবরগুলো বিশ্নেষণ করলে। সন্দেহ নেই যে, মানুষ এখনও জাতীয় পার্টিকে ভালোবাসে, সমর্থন করে। সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশা থাকবে, জাতীয় পার্টি তার অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে দ্রুতই একটি মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে জাতির সংকটে নেতৃত্ব দেবে।

সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×