পাবলিক পরীক্ষা
উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন শুধুই পুনর্গণনা!
উমর ফারুক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০ | ১২:০০
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সাম্প্রতিক প্রকাশিত ফলে দেখা যাচ্ছে, পাসের হার ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ফল বিশ্নেষণ বলছে, পাঁচটি কারণে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করেছে। এগুলো হলো- ছয়টি বিষয়ে ৯০ শতাংশের ওপরে নম্বর পাওয়া, চারটি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার বেড়ে যাওয়া, সারাদেশের মানবিক শিক্ষার্থীদের ২ শতাংশ পাসের হার বৃদ্ধি পাওয়া, উদারভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও প্রশ্নপত্র অন্যান্য বছরের তুলনায় সহজ হওয়া। বিশ্নেষণের চতুর্থ ও পঞ্চম কারণটি অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রশ্নপত্র সহজ বা কঠিন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হতে হবে নির্দিষ্ট মানের। অন্যদিকে উত্তরপত্র কখনও উদারভাবে বা কঠিনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ নেই। মূল্যায়ন হতে হবে যথাযথ প্রক্রিয়ায়।
প্রতিবছর বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় কিছু শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়, আবার কিছু শিক্ষার্থী পাস করে; কিন্তু আশানুরূপ ফল অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং নিয়মানুযায়ী পরবর্তী সময়ে তারা উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগও পান। এবারও ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বরাবরের মতো সেই উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি খুবই সংকীর্ণার্থে কার্যকর। সাধারণত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নজনিত ভুল বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্নভাবে সংগঠিত হতে পারে; যেমন- অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন অর্থাৎ নম্বর কম কিংবা বেশি নম্বর প্রদান করা, কোনো এক বা একাধিক প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়ন থেকে বাদ পড়া, যোগফল ভুল হওয়া, কিছু উত্তরের নম্বর যোগফল থেকে বাদ পড়া, যোগফল ওএমআর শিটে তুলতে ভুল হওয়া এবং ওএমআর শিটে বৃত্ত ভরাট করতে ভুল হওয়া। এগুলোই মূলত সাদা চোখে বড় বড় ভুল। এর বাইরেও কিছু ছোট ছোট ভুল হতে পারে। অথচ আমাদের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের অর্থ হলো, উত্তরপত্রের নম্বরের যোগফল ঠিক ছিল কিনা, প্রদত্ত কোনো নম্বর যোগফল থেকে বাদ পড়েছে কিনা কিংবা ওএমআর ফরমে বৃত্ত ভরাট করতে ভুল হয়েছে কিনা, কেবল সেটি যাচাই-বাছাই করা। ফলে ভুলের একটি বড় অংশকে বাদ রেখেই প্রতিবছর বিভিন্ন স্তরে পুনর্মূল্যায়িত হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র। আমাদের মনে রাখতে হবে, পুনর্গণনা ভুলের একটি অংশমাত্র; আরও অসংখ্যভাবে ভুল হতে পারে, যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে আংশিক প্রক্রিয়ার পুনর্মূল্যায়নকে কোনো অবস্থাতেই যথাযথ বলা সমীচীন হবে না।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের ওপর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি একটি উত্তরপত্র, গোপন কোড ব্যবহার করে দুইশ' জন পরীক্ষকের কাছে পাঠায়। পরীক্ষকদের প্রদত্ত নম্বরের তুলনামূূলক চিত্র উপস্থাপিত হয় প্রতিবেদনে। উত্তরপত্রটি সর্বোচ্চ ৬০ ও সর্বনিম্ন ২০ নম্বর পেয়ে মূল্যায়িত হয়। তারপর একজন বিশেষজ্ঞ পরীক্ষক দিয়ে উত্তরপত্রটি মূল্যায়ন করা হয়। তিনি নম্বর প্রদান করেন ৪০ অর্থাৎ পাস নম্বর অর্জন করে পরীক্ষার্থী। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় শতাধিক পরীক্ষকের বিবেচনায় উত্তরপত্রটি ফেল নম্বর পায়। এখন যদি বিশেষজ্ঞ পরীক্ষকের মূল্যায়নকে আপাতত সঠিক বলে ধরে নিই তবে শতাধিক শিক্ষার্থী, ভালো পরীক্ষা দিয়েও কেবল পরীক্ষকের ভুল মূল্যায়নের জন্য অকৃতকার্য হয়েছে। এই গবেষণার ফলাফল থেকে এ কথাও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ফেল বা পাস কেবল একজন পরীক্ষার্থীর মানের ওপর নির্ভর করে না, বরং পরীক্ষকের মানের ওপরও নির্ভর করে। ফলে ভালো ফলের জন্য একজন পরীক্ষার্থীকে যেমন সঠিকভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে, তেমনি সেই উত্তরপত্র একজন দক্ষ পরীক্ষক দ্বারা মূল্যায়ন হওয়াও জরুরি।
আমরা প্রতিবছর এ-প্লাসের সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধির দিকে ছুটছি, মানের দিকে নয়। ঠিক একইভাবে প্রতিবছর দ্রুততম সময়ে ফল প্রকাশের রেকর্ডের দিকে ছুটছি; যদিও করোনা সংকটে তা এবার সম্ভব হয়নি। কিন্তু যথাযথ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার দিকে ছুটছি না। আমাদের প্রচলিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় একজন পরীক্ষক ও অন্য একজন প্রধান পরীক্ষক থাকেন, যে প্রক্রিয়াকে কোনো অবস্থাতেই দ্বৈত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া বলা যাবে না। একটি যথাযথ উত্তরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অবশ্যই দ্বৈত পরীক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আবার যদি দুটি মূল্যায়নের পার্থক্য নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তবে অবশ্যই তা তৃতীয় পরীক্ষক কর্তৃক মূল্যায়িত হওয়া আবশ্যক। যদিও এই প্রক্রিয়া সামান্য সময়সাপেক্ষ, তথাপি যথাযথ মূল্যায়নের প্রয়োজনে যতটুকু সময় প্রয়োজন ততটুকু নেওয়াই বাঞ্ঝনীয়।
আমরা দেখেছি, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রতিবছর কিছু ফেল করা পরীক্ষার্থীও পাস করছে, এ-প্লাস পাচ্ছে। প্রচলিত এই বিতর্কিত পুনর্মূল্যায়নেও অসংখ্য শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে এটা বলা যায়, আমাদের পাবলিক পরীক্ষায় উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না। পরীক্ষার উত্তরপত্র যথাযথ মূল্যায়ন নির্ভর করে একজন পরীক্ষকের যোগ্যতা, দক্ষতা ও তার ওপর অর্পিত কাজের চাপের ওপর। স্বল্প সময় বেঁধে দিয়ে ও যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই একজন পরীক্ষককে দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে কোনো পরীক্ষার্থীর জীবনকে বিপদগ্রস্ত করার অধিকার আমাদের নেই, থাকে না। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নির্ভুলতা অর্জন করতে না পারলে এই গতানুগতিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কিছু প্রকৃত মেধাবী প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে পারে। উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নামে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দায়সারা, উদাসীন যে পদ্ধতি চলমান তা উদীয়মান, সম্ভানাময় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে খানিকটা রসিকতাও বটে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন মানে শুধুই পুনর্গণনা নয়, বরং অধিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে বিতর্ক নিরসন করা আবশ্যক।
যথাযথ উত্তরপত্র মূল্যায়ন একটি শিক্ষাব্যস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ ব্যাপারে আরও দায়িত্বশীল ও যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন না করলে ভবিষ্যতে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে গুরুতর বিতর্ক উঠতে পারে। সময়সাপেক্ষ হলেও দ্বৈত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনে তৃতীয় পরীক্ষক দিয়ে মূল্যায়ন আবশ্যক।
শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
[email protected]
- বিষয় :
- পাবলিক পরীক্ষা
- উমর ফারুক