গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ
রাজনৈতিক দলে নারীর অন্তর্ভুক্তি
লিপিকা বিশ্বাস
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০ | ১২:০০
নারীর অগ্রগতি বিষয়ক আইন, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কিছুটা বানরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠার মতো। আইন ও নীতি প্রণয়ন হয়, কিছুদিন পর তা আবার বাতিল হয় নানা বাহানায়। ব্যাপক হৈচৈয়ের পর আবার নতুন আইন, আবার নতুন নীতি আসে। প্রসঙ্গটি এলো এই কারণে, বিভিন্ন পত্রিকার খবরে জানা গেল, নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ৯০-এর বি'তে যে ধারাটি ছিল তা বাতিল করতে যাচ্ছে। এই ধারাতে ছিল ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোন অদৃশ্য কারণে নারীবান্ধব এই আইনটি বাতিল করছে নির্বাচন কমিশন? নারী কি তাদের প্রাপ্য অধিকার পেয়ে গেছে, নাকি এখন থেকে সমানভাবেই নারীরা এগিয়ে যেতে পারবে? নারী যখন মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে শুরু করেছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে শুরু করেছে, তখনই নির্বাচন কমিশন কেন আইনটি বাতিল করার জন্য নেমে পড়ল!
বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার যে স্বপ্ন-পরিকল্পনা তা দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। কারণ নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ একদিকে দারিদ্র্য নিরসন করে, অন্যদিকে নিরাপদ সমাজ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। সুতরাং নারীর অবস্থার উন্নয়ন শুধু নারীর বিষয় নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়নেরও বিষয়। নির্বাচন কমিশন আইনটি বাতিল করে দেশকে পেছনে নিতে চাইছে কি?
এই আইন থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলোতে মূল দলের কমিটিতে নারী অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা তৃণমূলে গড়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশের মতো বা কোথাও আরও কম। অবশ্য তৃণমূলে কোনো কোনো কমিটি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্তও নারী অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নারীর অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। এবার আওয়ামী লীগে কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২০ শতাংশেরও বেশি নারী পদ পেয়েছে। বিএনপিতে প্রায় ১৫ শতাংশের মতো, সামনের কাউন্সিলে হয়তো আরও বাড়বে। বাম দলগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীরা রয়েছে। বিভিন্ন দলে সাংগঠনিক, শিক্ষা, অর্থ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে নারীরা দায়িত্ব পেয়েছেন- সেও এই আইনের বলেই। এই আইন বাতিল হলে অগ্রগ্রতি তো দূরের কথা, আগের অবস্থায় ফিরে যেতে বেশি সময় লাগবে না।
বাংলাদেশে নারীবিষয়ক যে নীতি-আইন, আন্তর্জাতিক সনদ রয়েছে, সেখানেও রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের কথা বলা আছে। সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য এই ধারাটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে। যেমন- জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার ৩২.৩-তে বলা হয়েছে, 'রাজনৈতিক দলগুলোতে সকল পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।' এই নীতিমালার আলোকে কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ করার কথা বলা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৫নং লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে, 'রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসাধারণের জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল পর্যায়ে নারীর পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।' আন্তর্জাতিক সনদ সিডও অনুচ্ছেদ ৭-এর গ'তে বলা হয়েছে, 'সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠনে নারীর অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।' এই আইনগুলোতে রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের কথা বলা হলেও রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করতে পারোনি, তা নির্ভর করেছে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার ওপর। কিন্তু সবক্ষেত্রে সদিচ্ছা দিয়ে যে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়, তা ২০০৯-এর আগে পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের মূল কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণের হার দেখেই অনুমান করা যায়। তখন শুধু নারীবিষয়ক সম্পাদক পদ নারীদের জন্য রাখা হতো। কোথাও আবার নারীবিষয়ক পদে পুরুষরাও থাকত। কিন্তু আরপিওর এই ধারা যোগ করার ফলে এর অগ্রগতি শুরু হয়েছিল। এখন তা বাতিল করা হলে নিঃসন্দেহে এই অগ্রগতি ব্যাহত হবেই।
সরকারকে প্রতি চার বছর অন্তর সিডও সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে জাতিসংঘের সিডও কমিটির কাছে নারীর অগ্রগতি বিষয়ে বা নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার রিপোর্ট পেশ করতে হয়। যে ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি সে ক্ষেত্রে মিথ্যা করেই সমাজ প্রস্তুত নয় বলে উল্লেখ করতে হয়। এখানে আরপিওর এই আইন বলেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে তা দেখানো সম্ভব হতো।
নারীরা যারা মূল দলে যেতে আগ্রহী, তাদের কাছে এই আইন একটি শক্তি এবং কাজের অনুপ্রেরণাও বটে। এই আইন বাতিল হলে যাদের রাজনৈতিক পরিবার নেই, কালো টাকা নেই, পেশিশক্তি নেই, যে নারীরা একেবারেই তৃণমূলে মানুষের রাজনীতি করতে আগ্রহী, তাদের সামনে কোনো পথই আর থাকবে না। শুধু 'নারী সংগঠনের রাজনীতিই' তাদের কাছে একমাত্র গন্তব্য হবে। অথচ রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের মূল জায়গা হলো মূল দল, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হবে।
২০০৮ সালে আরপিও সংশোধনীতে যখন এই ধারাটি যুক্ত করা হয়, তখন ২০২০ সালের মধ্যে এটি পূরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু এটিকে ধাপে ধাপে করার কোনো বিষয় যুক্ত ছিল না। যেমন হতে পারত- ২০১৩ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ, ২০১৬ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ। ফলে এই দীর্ঘ সময়ে কারও কোনো মনিটরিং না থাকায় ২০২০ সালে এসে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই এই লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন 'এই আইন কেউ মানছে না' অজুহাতে আইনই বাতিল করতে চাইছে। বিষয়টি এমন মাথাব্যথা তো মাথাটাই কেটে ফেলা যাক! বাস্তবায়ন হয়নি বলেই তো আইনের প্রয়োজন রয়েছে, সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের মনিটরিংও।
তাই আশা করব, নির্বাচন কমিশন এই আইন বাতিল করে নারী অগ্রগতির ইতিহাসে কালো তালিকায় যুক্ত হবেন না। বরং এই আইনের সময়সীমা বাড়িয়ে নারীর অগ্রগতিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে ইতিহাসে বরণীয় হয়ে থাকবেন। সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এই আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলকে একটি রোডম্যাপ তৈরির নির্দেশনা রাখবেন আইনটিতে- যেন রাজনৈতিক দলগুলো ধাপে ধাপে তা পূরণ করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিংয়ের বিধানও রাখবেন। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা অনুযায়ী আগামী বাজেটে নারীদের রাজনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের জন্য বাজেট বরাদ্দেরও দাবি জানাই। সুতরাং গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে ৯০-এর বি-ধারা 'রাজনৈতিক দলে ৩৩% নারী অন্তর্ভুক্তির বিধান' বাতিল নয়, এর মেয়াদ বাড়ানো হোক।
উন্নয়নকর্মী
- বিষয় :
- গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ
- লিপিকা বিশ্বাস