ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

করোনা-উত্তর কৃষি ও শস্য নিবিড়তা

করোনা-উত্তর কৃষি ও শস্য নিবিড়তা
×

সিকদার আনোয়ার

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০ | ১২:০০

কৃষিতে শস্য নিবিড়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি নির্দিষ্ট জমিতে এক বছরে কয়টি ফসল উৎপাদন করা হয় শস্য নিবিড়তা তাই নির্দেশ করে। সেচ সুবিধাসহ কৃষি উপকরণের অপ্রতুলতা, মালিকের অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত জমির মালিকানা, বর্গা চাষ, অকৃষি খাতে উপার্জন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানাবিধ কারণে জমিতে শস্য নিবিড়তা আশানুরূপ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তাছাড়া অনেক কৃষকের ধারণা, ক্রমাগত আবাদ না করে জমিকে একটু বিশ্রাম দিতে হয়। সাধারণত মাঝারি ও বৃহৎ মালিকের জমিতে শস্য নিবিড়তা কম হয়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক তার পরিবারের প্রয়োজনে নিজস্ব জমিতে ধানের পর অন্য যে কোনো শস্য আবাদ করে বিধায় শস্য নিবিড়তা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। যেসব এলাকায় পানি সেচের ব্যবস্থা শুধু বৃষ্টি বা ভূ-উপরিস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব স্থানে শস্য নিবিড়তা তুলনামূলক কম।

অঞ্চল বা জেলাভিত্তিক শস্য নিবিড়তার ভেদাভেদ রয়েছে। ২০০৭-০৮ সাল থেকে ধীরগতিতে শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে ১৯৮-তে পৌঁছে; কিন্তু আবার ২০১৮ সালে ১৯৫-তে নেমে আসে। ২০১৮ সালে সবচেয়ে কম শস্য নিবিড়তাসম্পন্ন কয়েকটি জেলা হচ্ছে সুনামগঞ্জ, বান্দরবান, পটুয়াখালী বরিশাল, খুলনা প্রভৃতি। অন্যদিকে একই সালে সর্বাপেক্ষা বেশি শস্য নিবিড়তাসম্পন্ন কয়েকটি জেলা হচ্ছে- মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, বগুড়া, জয়পুরহাট, মাগুরা প্রভৃতি।

কৃষি উৎপাদন শিল্পের মতো উপকরণ বা বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলেই ক্রমাগত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে না, একটা পর্যায়ে গিয়ে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা দেখা দেয়। সুতরাং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে জমির প্রাপ্যতা বা জমির ব্যবহার কৌশলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জমির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির সুযোগ নেই বরং শিল্পায়ন, নগরায়ণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর এক শতাংশ হারে কৃষি জমির পরিমাণ কমছে। এটি কৃষির ওপর একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলা চলমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সাগর উপকূলে যেসব চর জেগেছে বা জেগে উঠছে, তার প্রায় অধিকাংশই সরাসরি বা জেগে ওঠার নূ্যনতম সময়ের মধ্যে কৃষি চাষের উপযুক্ত হয় না। তাহলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের বিকল্প নেই।

চালের উৎপাদন ১৯৭০ সালের ১০৮ লাখ টন থেকে বর্তমানে ৩৭৫ লাখ টনে পৌঁছেছে। এটি খুবই আশার এবং পরিতৃপ্তির বিষয়। কিন্তু শস্য নিবিড়তা ২০০৭-০৮ সালের ১৭৯ থেকে ২০১৮ মাত্র ১৯৫-তে বৃদ্ধি পেয়েছে। জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি অর্থাৎ একরপ্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি যত কঠিন, পতিত জমি আবাদ করা কিংবা একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন করা ততটা কঠিন নয়। অথচ এ ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন আশানুরূপ নয়, বরং হতাশাজনক। দেশের দক্ষিণাঞ্চল যেখানে নদনদী, খাল-বিলের সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকায় যেমন পটুয়াখালী বরিশাল, খুলনা, সাতক্ষীরা, চাঁদপুর, পিরোজপুর, বাগেরহাট ও শরীয়তপুর জেলায় শস্য নিবিড়তা অপেক্ষাকৃত কম। তার মানে কম ব্যয়সাপেক্ষ ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস ব্যবহার করা হচ্ছে না সঠিকভাবে। এক সময়কার প্রবাদ বাক্য 'ধান নদী খাল, এই তিনে বরিশাল'। সেই বৃহত্তর বরিশালে অনেক আবাদযোগ্য জমি পতিত পড়ে থাকে। অথচ ২০১৯ সালের কৃষিশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বরিশাল বিভাগে কৃষি খানার সংখ্যা সর্বাধিক ৬৬ শতাংশ। এখন বরিশাল নয় বরং উত্তরাঞ্চল বা পশ্চিমাঞ্চলকে বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার বলা হয়, যেখানে চাষাবাদ হয় মূলত ভূগর্ভস্থ পানির সেচ দিয়ে।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের জেলাগুলোতে বহু বছর আগে থেকেই অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার জন্য কৃষি জমিতে সঠিক মাত্রায় চাষাবাদ হতো না। অনেক আবাদযোগ্য জমি পতিত অথবা সাময়িকভাবে পতিত পড়ে থাকত। সে অবস্থার উন্নতি খুব একটা হয়নি। ২০১৮ সালে সুনামগঞ্জে শস্য নিবিড়তা কিছুটা বাড়লেও সিলেটে কমেছে আর মৌলভীবাজারে অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে এ কয়েক বছরে শস্য নিবিড়তা কমেছে বরিশালে ১৫৫ থেকে ১৪৬, পটুয়াখালী ১৪৭ থেকে ১৪৩ এবং পিরোজপুরে ১৫৩ থেকে ১৫০। এ চিত্র নিঃসন্দেহে হতাশার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারিভাবে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানি সেচের ব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করা হলেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভূ-উপরিস্থ পানি সেচের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনের প্রচেষ্টা জোরদার হওয়ার প্রমাণ মেলে না। অন্যদিকে বর্তমানে বেশি শস্য নিবিড়তাসম্পন্ন জেলাগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, সেখানেও বিগত কয়েক বছর শস্য নিবিড়তা বাড়েনি। বরং ২০১৩-১৪ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে চুয়াডাঙ্গা এবং কুষ্টিয়ায় শস্য নিবিড়তা অনেক কমেছে, জয়পুরহাটে বেড়েছে; অন্যদিকে মেহেরপুর ও বগুড়ায় প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

মানুষের খাদ্যের প্রাথমিক উৎস হচ্ছে মাটি ও পানি; অন্যভাবে বললে কৃষি। কৃষির ওপর নির্ভর না করে শিল্প বা অন্য কোনো উৎস মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করতে পারে না। জমি সর্বোচ্চ ব্যবহারের তাই বিকল্প নেই। কেউ জমির যথাযথ ব্যবহার করতে না পারলে বা না চাইলে কিংবা ব্যবহার করার মতো কেউ না থাকলে রাষ্ট্রকে যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তাতে অনুপস্থিত ভূস্বামীদের জমির ব্যবহার নিশ্চিত হতে পারে।

কৃষিকাজকে আনন্দদায়ক করা একটি বহুমুখী এবং বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিকে লাভজনক করা তার প্রধান উপায়; অন্যথায় কেউ এ কাজে আগ্রহ ও উৎসাহ খুঁজে পাবে না। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, চাষাবাদ পদ্ধতি আধুনিকীকরণ, নতুন জাত উদ্ভাবন, বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি- এসবই আনন্দদানের অনুষঙ্গ। বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার ছাড়াও সিআইপির মতো এআইপি প্রবর্তন করা যেতে পারে। কৃষক-কৃষি বিজ্ঞানীদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে ইউনিয়ন, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ কৃষকদের পুরস্কৃত করা দরকার। সারাদেশ থেকে কয়েকজনকে ঢাকায় ডেকে এনে পুরস্কৃত করা হলে গ্রামীণ কৃষককুলে তার প্রভাব খুব বেশি পড়বে না। কৃষকদের জন্য উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।

গ্রামাঞ্চলে যারা কৃষিকাজে দীর্ঘ সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ বা নিয়োজিত থাকেন, তাদের চাকরিজীবী বলা হয় না অথচ যারা একই সময়ের জন্য একই শর্তে শহর এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নিয়োজিত থাকেন, তাদের চাকরিজীবী বলা হয়। আজও অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি গর্বের সঙ্গে কৃষক বাবার পরিচয় দিতে চান না। নাটক, সিনেমা কিংবা গল্প-উপন্যাসে আজও আনস্মার্ট কাউকে বোঝাতে 'খেত' শব্দটি ব্যবহার হয়। গ্রামে কৃষক, দিনমজুরদের বিনোদনের নূ্যনতম ব্যবস্থা অর্থাৎ খেলাধুলা, যাত্রাগান, পালাগান, মেলা- এসব আর নেই বললেই চলে। এ সাংস্কৃতিক দৈন্য অনেককে গ্রামবিমুখ এবং কৃষিবিমুখ করে তোলে। গ্রামের শিক্ষিত-অশিক্ষিত যুবক-যুবতীরা চাকরির জন্য শহরে বা বিদেশে পাড়ি জমায় আর তাদের পৈতৃক জমি অবহেলায়-অযত্নে পতিত পড়ে থাকে। সরকারি উদ্যোগে সফল ও নিবেদিতপ্রাণ কৃষকদের দেশ-বিদেশ সফরের মাধ্যমে উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি, সফল খামারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক বা বিনোদনমূলক স্থান পরিদর্শন করানো যেতে পারে।

উৎপাদিত শস্যের গুদামজাত বা বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে কৃষকদের মধ্যে সমিতি বা সমবায় সমিতি গড়ে দেওয়া যেতে পারে। কর্তিত শস্য এসব সমিতির মাধ্যমে সরকারি সংগ্রহ কেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেতে পারে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষিমেলা, কৃষক সমাবেশ দায়সারা গোছের না করে আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক করা যেতে পারে।

করোনা মহামারিকালে প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন- এক. এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি ফেলে না রাখা এবং দুই. ফসলের বহুমুখীকরণ। দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও প্রকৃৃতিনির্ভর কৃষি উৎপাদনের গ্যারান্টি যেমন দেওয়া অসম্ভব, তেমনি সময়মতো, পরিমাণমতো ও সুবিধামতো শর্তে চাল আমদানি করারও নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং করোনা মহামারি বা অন্য যে কোনো ধরনের দুর্যোগকালীন বা দুর্যোগোত্তর পরিস্থিতি মোকাবিলায় শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মজুদ ক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানকল্পে সব আবাদযোগ্য জমি চাষের আওতায় আনতে হবে এবং শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি করতে হবে। সেই সঙ্গে বসতবাড়ি এবং ভিটার অব্যবহূত জমিতে নানা জাতের ফল ও সবজি আবাদ করতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত সচিব; প্রাক্তন রেক্টর বিসিএস প্রশাসন একাডেমি

আরও পড়ুন

×