দুর্যোগ মোকাবিলা
বাঁধের কাছে রেখে যাওয়া ঝড়ের ঠিকানা
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০ | ১২:০০
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলজুড়ে আম্পানের ক্ষতচিহ্ন মুছে যেতে না যেতেই ভারতের মহারাষ্ট্র ও গুজরাট উপকূলে আঘাত হেনেছে আরেক ঘূর্ণিঝড় নিসর্গ। যদিও তা আগেরটির মতো 'সুপার সাইক্লোন' নয়, করোনার সময়ে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি মাত্রা নিয়ে এসেছে। নিসর্গের নাম যদিও বাংলাদেশের দেওয়া, এর বাতাসের ধাক্কা এদিকে আসেনি। অবশ্য দেশজুড়েই দেখা গেছে বৃষ্টিপাত। উপকূলীয় এলাকায় এর প্রতিক্রিয়া কেবল বৃষ্টিপাতের মতো নিরীহ বিষয়ে সীমিত ছিল না। উপকূলীয় বাঁধের আম্পানে ভাঙা অংশ দিয়ে আরেক দফা ঢুকেছিল জোয়ারের পানি বাড়তি উচ্চতা নিয়ে।
আম্পানের পানি কোথাও কোথাও যখন নেমে যাচ্ছিল, তখন নিসর্গের ঢেউ এসে ফের ডুবিয়েছে। অনেক এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করা বাঁধ ফের ভেঙেছে। অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে বাড়ি মেরামত বা পরিস্কার করছিল, মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ফের ভিজেছে। মাঠের ফসলের পরিস্থিতি আরও সঙ্গিন। বাঁধের বাইরে থাকা বা ভাঙার মুখে পড়া ফসল আগেই ডুবেছিল। উপকূলীয় অঞ্চলেই বাঁধের ভেতরে থাকা বা উপকূল থেকে দূরে দেশের অন্যান্য অংশের ধান যতটুকু এক আম্পানের বাতাস ও বর্ষণ সহ্য করে টিকে ছিল, তাও দ্বিতীয় দফায় নিসর্গের বর্ষণে মাটিতে শুয়ে পড়েছে।
গত এক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে, সমুদ্রে ঘন ঘন নিম্নচাপ তো বটেই, ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়ে উপকূলে আঘাত হানার হার বেড়ে গেছে। একটি ঘূর্ণিঝড় চলে যাওয়ার পর আরেকটি আসতে খুব বেশি সময় লাগে না। আগে একেকটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হতো দশক ধরে; এখন দুই-এক বছর পরপরই দেখা মিলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরম্পরা বা 'ফ্রিকোয়েন্সি' আরও বাড়বে। কিন্তু উপকূলের মানুষ জানে, ঘূর্ণিঝড়ের পরম্পরা বৃদ্ধি নিছক সংখ্যা নয়। একেকটি ঘূর্ণিঝড় মানে তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল প্রাণ ও সম্পদহানি। দীর্ঘমেয়াদেও একেকটি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন থেকে যায় যুগ যুগ ধরে।
কোথায় থাকে ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন? স্বজনহারা মানুষের হৃদয়ে কিংবা সম্পদহারা পরিবারের শরীরে তো থাকেই, সে কথা বলছি না। ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছগাছালি বা বনের কথাও বলছি না। দোমড়ানো-মোচড়ানো সবুজ ফের গাঢ় হয়ে ওঠে মানুষ ও প্রকৃতির কল্যাণে। বলছি উপকূলীয় বেড়িবাঁধের কথা। একেকটি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন বছরের পর বছর দগদগে হয়ে থাকে সেখানে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ঝড়ের কাছে তার ঠিকানা রেখে যাওয়ার কথা বলেছেন। আর উপকূলের ক্ষেত্রে ঝড়ই যেন নিজের ঠিকানা রেখে যায় বাঁধগুলোতে। ঋতু অর্থে হেমন্ত নয়, প্রতিবছর সাধারণত বর্ষা বা শরতে আমরা এই দৃশ্য দেখি। এবার আরও এগিয়ে গ্রীষ্ফ্মকালেই নিজের ঠিকানা রেখে গেল আম্পান। এই ঠিকানায় কেবল বর্তমান ঠিকুজি নয়, ভবিষ্যতের বাস্তুহীনতাও যেন লেখা।
প্রশ্ন হচ্ছে, ভাঙা ও ক্ষতবিক্ষত বাঁধ নিয়ে আমরা কী করব? খোদ সুন্দরবন ২০০৭ সালের সিডর বুক দিয়ে আটকাতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। সে সময় পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেছিলেন, সুন্দরবনকে 'বিরক্ত' না করলেই সে নিজে নিজে ঘুরে দাঁড়াবে। তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণ করেছিল প্রকৃতি। মাত্র দুই বছরের মাথায় আঘাত হেনেছিল আরেকটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলা। সেবার সুন্দরবন যেমন-তেমন, উপকূলীয় বাঁধে আঘাত হেনেছিল বেশি। কারণ সিডরের আঘাতে উপকূলীয় বাঁধ নেটওয়ার্কের যেসব জায়গা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, তা ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই মেরামত ও সংস্কার না হওয়ায় আইলার কম আঘাতেও ভেঙে গিয়েছিল। পাশাপাশি সেবার জোয়ারের উচ্চতা ছিল বেশি, এসেছিল ভরা কটালের সময়। ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাসে সেবার বাতাসের গতিবেগ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হলেও ভরা না মরা কটাল, সেটা বলা হয়নি। এখনও বলা হয় না, তবে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
বলা বাহুল্য, উপকূলীয় বাঁধের ক্ষেত্রেও 'ডোন্ট ডিস্টার্ব' নীতি গ্রহণের অবকাশ নেই। এখানে কর্তৃপক্ষের নিবিড় হস্তক্ষেপ জরুরি। সিডর ও আইলা- দুই ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই অধ্যাপক আইনুন নিশাতের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। এখন পেছনে তাকিয়ে বিস্ময় জাগে যে- তিনি সিডরের পর স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, আঘাতে দুর্বল হয়ে পড়া বাঁধগুলো অবিলম্বে মেরামত ও সংস্কার করা না হলে পরবর্তীকালে দুর্বলতর ঘূর্ণিঝড়েও এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আইলায় সেটাই ঘটেছিল। আইলার পর তিনি বলেছিলেন, উপকূলীয় বাঁধ মেরামত ও সংস্কার ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিবেচনায় এগুলোর উচ্চতাও বাড়াতে হবে। প্রায় এক যুগ পর আম্পানে এসে দেখলাম, জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা বাঁধের চেয়ে বেশি। অনেক স্থানেই বাঁধ ভেঙেছে সত্য, অনেক স্থানে বাঁধ উপচেও ঢুকেছে পানি।

অস্বীকার করা যাবে না, উপকূলীয় বাঁধের নাজুক হওয়ার পেছনে বহুলাংশে দায়ী ওই অঞ্চলের চিংড়ি ঘের। ঘেরের মধ্যে লোনা পানি ঢোকানোর জন্য স্থানে স্থানে ফুটো করে রাখে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় বা বেশি উচ্চতার জোয়ারের সময় নাজুক ওই জায়গাগুলো ভেঙে পড়ে অন্য অংশের আগে। অবশ্য সব অংশেই এমন ছিদ্র রয়েছে। যেন 'সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা'। উপকূলীয় বাঁধ ভাঙার নেপথ্যে চিংড়ি ঘেরের 'অবদান' নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা, সমালোচনা কম হয়নি। তারপরও বাঁধের ছিদ্র বহাল থাকার কারণ, চিংড়ি ঘেরগুলোর বিপুল অধিকাংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীরা। প্রায় প্রত্যেকটি ঘেরের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিক বা জনপ্রতিনিধিরা জড়িত। ফলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে ওইসব ছিদ্র বন্ধ করা সহজ নয়। আর উপকূলীয় বাঁধের কর্তৃপক্ষ 'নিরীহ' পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষে এগুলো বন্ধ করার সক্ষমতার তো প্রশ্নই আসে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। আমিও প্রকাশ্য ও জনপরিসরে সমালোচনা করি। কিন্তু উপকূলীয় বাঁধে চিংড়ি ঘেরের ফুটো বন্ধ করার ক্ষেত্রে তারা সত্যিই অসহায়। অভিযোগ আরও আছে। বাঁধ ভেঙে গেলে নতুন প্রকল্প আনা সহজ হয়; অনেক ঠিকাদার ও তদারকি কর্মকর্তাদের পোয়াবারো হয়- এজন্যই বাঁধ সংস্কার বা মেরামতে গজর নেই। এর সত্যতা থাকতেও পারে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড কেন বাঁধ নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণ করে না, সেই অভিযোগ অমূলক। তারা কাদের মাধ্যমে করবে? এ ধরনের স্থাপনা দেখভাল করার জন্য একসময় যে কর্মচারীরা ছিল, সেই পদে নতুন করে নিয়োগ হচ্ছে না। ফলে ওই পদই এখন বিলুপ্তপ্রায়। সংস্থাটি কী করবে?
উপকূলীয় বাঁধে রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে একটি উপায় হতে পারে- পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ নির্মাণ করে স্থানীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে। তারাই বছরভর দেখভাল করবে। উপকূলীয় বাঁধগুলোর ছবি দেখলে দেখা যায়, গাছপালাবিহীন। সেখানে লোনা পানির উপযোগী সবুজায়ন কি হতে পারে না? যদি গাছ লাগানো যায়, তাহলে বাঁধের শক্তি ও স্থায়িত্বও হয়তো বাড়বে। আমি বিশেষজ্ঞ নই, এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন।
বাঁধের লেখা ভানতে গিয়ে আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের গীত গাইছি না। আমি বলতে চাইছি, এক চিংড়ি ঘেরের ছিদ্র বন্ধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাঁধে দায় চাপিয়ে বাঁধের বাকি শত্রুদের আড়াল করব কেন? প্রথম কথা হচ্ছে, যে কোনো মূল্যে উপকূলীয় বাঁধে ফুটো করে লোনা পানি ঢোকানো বন্ধ করতেই হবে। সেক্ষেত্রে চিংড়ি ঘেরগুলোর নেপথ্যে থাকা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য প্রভাবশালীদের ছাড় দেওয়া যাবে না। আরও ভালো হয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিনাশী এই ঘের ব্যবস্থা উচ্ছেদ করতে পারলে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা কঠিন। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ প্রয়োজন। উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, মেরামত বা সংস্কার প্রকল্পের সঙ্গে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও অবিচ্ছেদ্য করে তুলতে হবে। চিহ্নিত করতে হবে প্রকল্পবাজদের। দীর্ঘমেয়াদে হলেও সব বাঁধের উচ্চতা বাড়াতেই হবে। বড় কথা, দেশীয় বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারিতে কান দিতে হবে। সিডর বা আইলার সময় তারা যা বলেছিলেন, সেগুলো প্রতিপালিত হলে আম্পানে এসেও বাঁধে বাঁধে ওই দুই ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত ও ফোঁড়া মুখব্যাদান করে থাকত না।
লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
[email protected]
- বিষয় :
- দুর্যোগ মোকাবিলা
- শেখ রোকন