ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

ধর্ষণ অপ্রতিরোধ্য?

ধর্ষণ অপ্রতিরোধ্য?
×

ড. নমিতা হালদার

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২০ | ১২:০০

করোনাকালে যৌতুকজনিত নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, বাল্যবিয়েসহ নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৬৫ ভাগ। কেউ বলছেন, ধর্ষণের অনেক খবর হয়তো থেকে যাচ্ছে করোনার আড়ালে। তবে গণমাধ্যমে সে চিত্র এসেছে তা উদ্বেগজনক। কয়েকটি ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। ১২ মার্চ ধর্ষণের মামলায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি এক স্বজনের বাসায় নিয়ে এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে দুই ছাত্রের একজন। ১৪ মার্চ কুমিল্লা সদরে সাড়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকে টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ২৩ মার্চ পাবনায় এক ছাত্রলীগ নেতার নেতৃত্বে এক গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। একই দিন নওগাঁয় এক কিশোরীকে (১৬) গণধর্ষণের অভিযোগে তিন তরুণ গ্রেপ্তার হয়। ২৬ মার্চ যশোর সদরে নিজের চার বছর বয়সী মেয়েকে ৪৫ বছর বয়সী বাবা ধর্ষণ করলে মায়ের মামলায় ওই বাবা গ্রেপ্তার হয়। ২৬ মার্চ গফরগাঁওয়ে এক মসজিদের মুয়াজ্জিন ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে।
এভাবে মার্চের শেষে জামালপুরে করোনা আক্রান্ত রোগী তল্লাশির অজুহাতে ঘরে ঢুকে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করে পাঁচ বখাটে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কেরানীগঞ্জে ত্রাণ নিতে গেলে ঘরে আটকে ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। কেবল ঢাকা মহানগরে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৯টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে প্রতিদিনই ভুক্তভোগীরা সেবা নিতে আসছেন।
নারীর প্রতি সহিংসতার চূড়ান্ত রূপ ধর্ষণ, এটি মানবাধিকার হরণের সর্বোচ্চ পর্যায়ও বটে। মানব চরিত্রের এ কুপ্রবৃত্তিটি বিপর্যয় ডেকে আনে। সামাজিক এমন কলঙ্কের শিকার হয়ে অনেকে আত্মহত্যা করে। গত ২৩ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরের জৈনা বাজারে মালয়েশিয়া প্রবাসী রেজোয়ান হোসেন কাজলের পরিবারে কিশোর পারভেজসহ কয়েকজন নরপশু যে বীভৎস গণধর্ষণ এবং খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে তাতে স্ত্রী ফাতেমা ও ৩ সন্তানকে হারিয়ে কাজল এখন পাগলপ্রায়। ধর্ষণের এই ঘটনাটিকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন বলা যাবে না কারণ পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৯৩ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারির ধর্ষণ সংখ্যা জানুয়ারি ২০১৯-এর দ্বিগুণ এবং বাংলাদেশে দিনে গড়ে ১৩টি ধর্ষণ সংঘটিত হয়। ধর্ষণের ছোবল থেকে নারী, শিশু, কিশোর, কিশোরী কেউই শঙ্কামুক্ত নয়। সম্প্রতি ধর্ষণের শিকার এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন।
নারী নির্যাতন মোকাবিলায় সব আমলের সরকারই যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। ১৮৬০ সালের দ বিধির ৩৭৬ ধারায় ধর্ষণের সর্ব্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর থাকলেও বারবার অধ্যাদেশ-আইন প্রণয়ন করে শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়। দেশে প্রথম প্রণীত বিশেষ বিধানটির নাম ছিল ক্রুয়েলটি টু উইমেন অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৩। এরপর ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (বিশেষ বিধান) আইন; ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং সবশেষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০০৩ প্রণীত হয়। প্রতিটি সংশোধনীতেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হলেও ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধটির মাত্রা বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ।
মনে পড়ে এসিড সন্ত্রাসের কথা? অপরাধটির মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কেবল ২০০২ সালেই ৪৯৪টি এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সরকার ওই বছরই দুটি কঠোর আইন প্রণয়ন করে :অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২ ও এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২। অ্যাসিড নিক্ষেপের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ১৪ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ; ৩৩৮ জনের বিভিন্ন মেয়াদে জেল এবং ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একজন বিজ্ঞ জেলা বা দায়রা জজের পরিচালনায় অ্যাসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা চলে এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ সমাপ্ত হয়।
স্বাভাবিক প্রশ্ন, ধর্ষণের ক্ষেত্রেও তো মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, তাহলে অপরাধ কমছে না কেন? এসিড নিক্ষেপকারীদের বিচারের আওতায় আনতে শুধু শাস্তি নয় বরং অ্যাসিডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও জরুরি ছিল। অ্যাসিড কেনাবেচা ও হস্তান্তরের ওপর কঠোর নজরদারিতে অ্যাসিডপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
ধর্ষণের বিচারে ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬১ ধারায় যে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা (আইও) সাক্ষীদের পরীক্ষা করেন চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত তাকেই দায়িত্বে রাখা প্রয়োজন। সাক্ষী হিসেবে আইও এবং চিকিৎসক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের সুদীর্ঘ ম্যাজিস্ট্রেসি চর্চা জীবনে দেখেছি এ দু'জন সরকারি সাক্ষীকে আদালতে আনতে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়। মামলার গতি শ্নথ হওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ সময় বা প্রস্তুতির অভাবে বিজ্ঞ আইনজীবীদের সাক্ষী ফেরত দেওয়া। ধর্ষণের বিচারের দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ :দিনাজপুরের ইয়াসমীনের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ বছরে; আপিল, রিভিউসহ শাজনীনের মামলায় সময় লেগেছে ১৯ বছর। নোয়াখালীর ট্রাইব্যুনালে ১৭ বছরের পুরোনো ধর্ষণচেষ্টা মামলা এখনও বিচারাধীন। মামলার ব্যয়ভার, ধর্ষক এবং প্রভাবশালীদের চাপ, মীমাংসা, ধর্ষকের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে প্রভৃতি কারণে বেশিরভাগ মামলা শেষ পরিণতি পায় না। ফলে ধর্ষণের মামলায় শাস্তির হার মাত্র ৩ শতাংশ বলে জানা যায়।
ধর্ষণের আসামি সাধারণত হাতেনাতে ধরা পড়ে অথবা আলামত রেখে যায়। তার ওপর রয়েছে ডিএনএ টেস্ট। তবু কীভাবে ধর্ষকরা পার পেয়ে যায়? সিরিয়াল রেপিস্ট এবং কিলার রসু খাঁ, মো. মজনু এদের সিরিয়াল খেতাব প্রাপ্তির মূল রহস্য হলো তারা গ্রেপ্তার এবং বিচার এড়াতে সক্ষম হয়। কিশোর পারভেজ এর আগে ধর্ষণ-পরবর্তী খুনের দায়ে নয় মাস জেল খাটলেও একই অপরাধে এবার পেয়েছে সিরিয়ালের খেতাব। কিন্তু জানামতে শিশু আইনে বিচার ও শাস্তি-পরবর্তী 'প্রবেশন' একটি ধাপ রয়েছে। সাধারণত বিচারিক আদালত অপরাধপ্রবণ কিশোর-কিশোরীদের সমাজসেবা অফিসের তত্ত্বাবধানে দিয়ে থাকেন। পারভেজের ক্ষেত্রে সেটি করা না হয়ে থাকলে তার সিরিয়াল রেপিস্ট এবং কিলার হওয়ার দ্বার ছিল উন্মুক্ত। এ প্রতিবেদনের ধর্ষকদের সবাই ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। দ্রুত সময়ে চার্জশিট দাখিল হবে বলেই প্রত্যাশা।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজার হাজার মামলার বিপরীতে বিচারক এবং এজলাস সংকট রয়েছে। নুসরাত হত্যা মামলার বিচার যে দ্রুতগতিতে হয়েছে তা প্রমাণ করে সব অনুষঙ্গ (বিচারক, এজলাস, চার্জশিট, সাক্ষী, আলামত) প্রস্তুত থাকলে বিচার ত্বরান্বিত করা সম্ভব। মাননীয় প্রধান বিচারপতি মামলার জট কমানোর জোর প্রচেষ্টা নিয়েছেন। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে একটি ধর্ষণ দমন স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠনপূর্বক বর্তমান ট্রাইব্যুনালের ধর্ষণের মামলাগুলো পৃথকভাবে সেখানে পরিচালনা করে ভুক্তভোগীকে দ্রুত প্রতিকার দেওয়া সম্ভব। আপাতত এক বছরের জন্য এটিকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল হিসেবে পরিচালিত করা হবে সর্বোত্তম। বিজ্ঞ বিচারকের পক্ষে প্রতিটি মামলায় যথাযথ মনোযোগ, লিগ্যাল এইডের সঠিক ব্যবহার এবং একটানা বিচারকাজ পরিচালনা করে নির্ধারিত সময়ে রায় দেওয়া সম্ভব। এর ফলে নারী নির্যাতনের হার কমবে, ধর্ষণ দমনে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ধর্ষণ যে অপ্রতিরোধ্য নয় সেটিও প্রতিষ্ঠা পাবে।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে হাজার হাজার ডাক্তার এবং নার্স নিয়োগ দিয়ে সংকট সামাল দিচ্ছে। প্রস্তাবিত স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত বিচারক প্রয়োজন হবে বিধায় সৎ, দক্ষ, অবসরপ্রাপ্ত জেলা বা দায়রা জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। অর্থের সংকুলান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে জানি। তবে আমার জানামতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনকল্যাণকর কাজে কখনও পিছপা হন না। মানব চরিত্রের সর্বোচ্চ রিপু দমনে এবং নারী ও শিশুদের কল্যাণে তার গৃহীত সব কাজের অন্যতম মাইলফলক হতে পারে ধর্ষণ দমন স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল।
(লেখাটি তৈরিতে সমকাল, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন এবং অন্যান্য গণমাধ্যম থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে)।
সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশ ও অনুষদ সদস্য, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×