ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

অনলাইন ব্যাংকিং

প্রগতির পথে প্রতারণার কাঁটা

প্রগতির পথে প্রতারণার কাঁটা
×

সন্তানের সঙ্গে নাজমুন নাহার -সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২০ | ১২:০০

মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে অনেক দিন ধরে, গড়ে তুলেছে রীতিমতো 'সুশৃঙ্খল প্রতারক বাহিনী'- এমন একটি চক্রের ১৩ সদস্য র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার খবর নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। আমরা খবর পাচ্ছিলাম, করোনা পরিস্থিতিতে নাগরিকরা যখন ঘরবন্দি, সরাসরি ব্যাংকে বা এটিএম বুথে যাওয়ার বদলে তারা যখন মোবাইল বা অনলাইন লেনদেন অগ্রাধিকার দিচ্ছে; তখন এ ধরনের চক্র নতুন উদ্যমে মাঠে নেমে পড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক কর্মচারী সেজে গ্রাহকদের ফোন দিয়ে বিভিন্ন গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালানোর খবর সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসছিল। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে অর্থ হারানো মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বিশেষত সরকারি নির্দেশনা মেনে যখন গার্মেন্ট ও অন্যান্য শিল্পে শ্রমিকদের বেতন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছিল, তখন স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত এই জনগোষ্ঠীকেই নিশানা করেছিল প্রতারক চক্র। আমরা আশা করতে পারি, ১৩ জন আটক হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতারক চক্রগুলো খানিকটা খামোশ হবে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে ধরা পড়বে অন্যরাও। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, দেশব্যাপী ছড়ানো প্রতারক চক্রের আটক কয়েকজন নিমজ্জিত হিমশৈলীর দৃশ্যমান চূড়ামাত্র। আরও অনেকেই রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদেরও আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, অনলাইন ব্যাংকিং সেবায় নাগরিকদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা এবং একই সঙ্গে বহুলাংশে অনভ্যস্ততাই প্রতারকদের সুবিধা করে দিয়েছে। একই সঙ্গে খোদ অনলাইন ব্যাংকিংয়েও ক্রমে ক্রমে ফাঁকগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। আমাদের মনে আছে, গত বছর মে-জুন মাসে একটি বেসরকারি ব্যাংকের অন্তত দুটি এটিএম বুথে কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের অভূতপূর্ব জালিয়াতি ধরা পড়েছিল। দেড় কোটির বেশি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড এবং সেগুলো ব্যবহারের জন্য ১০ হাজারের বেশি এটিএম বুথ ও প্রায় অর্ধলাখ পিওএস নিঃসন্দেহে বড় নেটওয়ার্ক। আমরা জানি, অনেকে দেশের মোট জনসংখ্যাও দেড় কোটির কম। ই-ব্যাংকিংয়ে এই বিপুল ব্যবস্থা এবং তার ব্যবস্থাপনার জন্য বিপুল সংখ্যক জনবল ও প্রযুক্তি বিবেচনায় এর নিরাপত্তার বিষয়টিও নিঃসন্দেহে ব্যাপক। এটিএম বুথের ওই জালিয়াতি ছিল বড় ধরনের ধাক্কা। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ধরা পড়েছিল আরও বড় জালিয়াতি। তখন বুথে নজরদারি প্রযুক্তি বসিয়ে গ্রাহকের কার্ডের গোপনীয় তথ্য 'ক্লোন' করা হতো। গ্রাহকের আর্থিক হিসাবে গোলমাল থেকেই ধরা পড়েছিল জালিয়াতির ঘটনা। প্রযুক্তির এই ফাঁক বহুলাংশে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু গ্রাহকের অসচেতনতায় প্রতারকের পোয়াবারো রয়েই গিয়েছিল। সর্বশেষ আটক এই ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, জড়িতদের দৃশ্যমান কোনো উপার্জনের উৎস নেই। নেই উল্লেখযোগ্য লেখাপড়া বা যোগ্যতা। তারপরও তারা কোটি কোটি টাকা, গাড়ি, বাড়ি কামিয়েছে প্রতারণা করেই। এদের বড় অংশকে আটক এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া প্রতারণা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।
স্বীকার করতে হবে যে, গ্রাহকদের সচেতনতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রচারণা কার্যক্রম আরও বাড়াতেই হবে। বস্তুত তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিশ্বজুড়েই ক্রমবর্ধমান। জালিয়াতির অঘটন অন্যান্য দেশেও কম নেই। নতুন এই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তাই নতুন ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে উদ্ভাবন ও প্রয়োগ হচ্ছে নতুন নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থা। আমরা দেখতে চাইব, বাংলাদেশেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত ও সুরক্ষিত হয়েছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি পক্ষগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে নিতে হবে আন্তর্জাতিক সহায়তা। অস্বীকার করা যাবে না যে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাইবার অপরাধ বা অনলাইন প্রতারণা দমনে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ও দক্ষ। কিন্তু একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে অসচেতনতার কারণে শুধু সংঘটিত অপরাধ দমন করে বেশিদূর যাওয়া যাবে না। কে না জানে যে, রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। আমরা জানি, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলোতে অনলাইন বা মোবাইল ব্যাংকিং ক্রমেই বাড়ছে। করোনা পরিস্থিতি এই হার আরও বাড়িয়ে দেবে। তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়াতে হবে সুরক্ষা ব্যবস্থাও। প্রযুক্তি আমাদের আর্থিক সেবায় যে প্রগতি নিয়ে এসেছে, প্রতারণার কাঁটায় তা থমকে যেতে দিতে পারি না।

আরও পড়ুন

×