আই কান্ট ব্রিদ
দাউদ হায়দার
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২০ | ১২:০০
ভদ্রলোক ভারতীয়। আদি বাড়ি তার কথায় শ্রীহট্টের সুনামগঞ্জে। বছর পঞ্চাশের বেশি বার্লিনে বাস। তিন সন্তানের জনক। এক পুত্র, দুই কন্যা। স্ত্রী জার্মান (পূর্ব জার্মানির)।
ভদ্রলোকের বংশগত পদবি রায় চৌধুরী। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বহুদিন। বলেন, 'ছেলেমেয়ে নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। থাকে ভিন দেশে। এক ছেলে কানাডায়। মেয়ে বোস্টনে। আরেক ছেলে ভিয়েনায়।' দুই ছেলে নিয়ে গর্বিত, প্রায়ই শোনান। মেয়ের কথা মুখে আনেন না। নিজেকে গণতন্ত্রী, অসাম্প্রদায়িক, সমাজবাদী, এমনকি জাতিধর্মবর্ণের ঊর্ধ্বে প্রচার করেন। মেয়ের কথা কেন কন না? রায় চৌধুরীর দুশমনরা জানান, মেয়ে একজন ব্ল্যাককে বিয়ে করেছে, মেয়েকে অলিখিত তেজ্য কন্যা করেছেন। রায় চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করলাম একদিন। অকপটে স্বীকার করলেন, 'মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। মুসলিমকে বিয়ে করলেও মানতাম না। আমরা দেশত্যাগী উদ্বাস্তু, ভিটেমাটি-ছাড়া পূর্ববঙ্গ থেকে। মুসলমানদের কারণেই। বুকের মধ্যে এখনও জ্বালা। ভুলতে পারি না। যতই বলুন, উপমহাদেশের (ভারতীয় উপমহাদেশ) মানুষের রক্তমজ্জায় বর্ণ, জাতিধর্ম-বিদ্বেষ, যুগ যুগ প্রবাহিত। আপনি নিশ্চয়ই সৈয়দ করিমুল্লাহকে চেনেন, ওর একমাত্র কন্যা চন্দননগরের হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করেছে। ছেলেটি বড় চাকরি করে। থাকে ফ্রাঙ্কফুর্টে। ছেলেটি ধর্মবর্ণের ঊর্ধ্বে, ওদের এক ছেলে, এক মেয়ে। করিমুল্লাহ সাহেব মেয়ে-জামাইকে কখনও ঘরে ঢুকতে দেন না।'
রায় চৌধুরী বলতে থাকেন, 'আমাদের উপমহাদেশের কোনো ছেলেকে কি দেখেছেন কখনও তার বান্ধবী বা বউ আফ্রিকান তথা ব্ল্যাক? আমাদের বউমা সাদা হলে, তা যে পদেরই হোক, যে বংশেরই হোক, আমরা খুশিতে টগবগে, দিশেহারা। করিমুল্লাহ সাহেবের ছোট ভাই সবিহউল্লাহ, আগে থাকতেন বার্লিনে, এখন ড্রেসডেনে নিজেকে কমিউনিস্ট বলেন, তার বড় মেয়ে ইহুদি ছেলেকে বিয়ে করেছে, পারলে মেয়েকে হত্যা করেন। তা হলে বুঝুন। এই কি কমিউনিজমের শিক্ষা? বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ? বিশ্ব মানবিকতা? আসলে উপমহাদেশের (ভারত) মানুষ জাতিধর্মবর্ণ থেকে বেরোতে পারেনি। মনে মনে জাগরূক। মুখে যতই বলি। অত দূরে যাই কেন, জার্মানরা পারেন? ইউরোপিয়ানরা পারেন? যেসব হোয়াইট মেয়ে ব্ল্যাককে বিয়ে করে, মেয়ের বাড়িতে ব্ল্যাক জামাই অচ্ছুত। প্রমাণ বিস্তর।'
রায় চৌধুরী আবার ভারতীয় উপমহাদেশের প্রসঙ্গে ফিরে আসেন। "কাব্যে-কবিতায় রবীন্দ্রনাথ 'কৃষ্ণকলি' লিখতে পারেন। কিন্তু কৃষ্ণকলিকে বিয়ে করতে ছেলে, ছেলের বাপ-মার সায় আছে কি? আমাদের দেশে, একই গোত্র-ধর্মে কালো মেয়ের বিয়ে যে কী হ্যাপা, ভুক্তভোগী বাবা-মা জানেন। বিশাল অঙ্কের ডাউরি (পণ) দিয়েও কুল পায় না। আমেরিকার বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে, বিশেষত জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যার পরে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, আন্দোলন, আমাদের দেশের অবস্থান, চেহারা দেখুন ঝলমলে, পরিস্কার। ভারতের বহু অঞ্চলে দলিতরা ব্রাহ্মণের মহল্লায় যেতে পারে না। ব্রাহ্মণের পুকুরে জল নিলে দণ্ড, হত্যা। করোনায় কতজন দলিত, সর্বহারা, ভিন্ন ধর্মের মানুষকে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ তথা উচ্চবর্ণের হিন্দুরা, উচ্চবংশীয় মুসলমানরা স্বধর্মীয়কে সাহায্য দিচ্ছে? কাছে যাচ্ছে? বহু ধনীর টাকার পাহাড়, কতজন এই দুর্দিনে, অসহায় নিরন্ন মানুষের পাশে? এখানেও কি জাতিধর্মবর্ণ নেই? আছে। মনমননে।
হয়তো মনে পড়বে আপনার বছর কয়েক আগে কলকাতায় রিজুওয়ান নামের এক ছেলে এক অবাঙালি মেয়ের মায়ায় জড়িয়ে, বিয়ে করে দু'জনে। মেয়েটি ভালোবেসেছিল ছেলেটিকে। মেয়ের বাবা ব্যবসায়ী। ধনী। সমাজে প্রতাপশালী। রিজুওয়ানকে হত্যা করল। হৈচৈ হলো কিছুদিন। তারপর? ধর্ম কোথায় নিয়ে গেছে আমাদের? নিজের কথাই বলি। আমি কি ইউরোপে দীর্ঘ বছর থেকেও মুক্তমনা? আমার মেয়ে ব্ল্যাককে ভালোবেসে বিয়ে করেছে, মানতে পারিনি, পারবও না।"
ভাবছিলাম ইউরোপের কথা। মিনিয়াপোলিসে জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যার পরে বিশ্বজুড়ে (বিশেষত আমেরিকায়, ইউরোপে) বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার, আন্দোলন। ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। ঠিক। কিন্তু কতটা? সবটাই সাময়িক। স্থিতু হলে আবার স্বরূপে-স্বমূর্তিতে। ফ্রান্সের ম্যারি লেপেন মৌনি এখন। জার্মানির আএফডি (এএফডি অলটারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড) রা কাড়ছে না। ইতালি, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, হল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন নানা দেশ অপেক্ষারত। সময় এলে প্রকাশ্যে। বর্ণজাতিধর্ম-বিদ্বেষ নির্বাচনী এজেন্ডা।
জার্মানিতে লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ঠাঁইও দিয়েছিলেন। তারপর? নিজের দল, বিরোধী দলের (বিশেষত দক্ষিণপন্থি আএফডি। আএফডি এখন জার্মানিতে তৃতীয় রাজনৈতিক দল) তীব্র বিরোধিতায়-সমালোচনায় অ্যাঙ্গেলা মেরকেল কুপোকাত। 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি' বা 'ভিক্ষে চাই না, কুত্তা সামলাও।'
জার্মানিতে এখন ২৪ হাজার উদ্বাস্তু (যারা এসেছিল) নেই। বিদেয় করেছে। মূল কথা, জাতিধর্মবর্ণ লোক দেখানো, সাময়িক। রাজনীতিই আসল। সব দেশেই। আমেরিকায়। ইউরোপে। ভারতে। বাংলাদেশে।
কমিউনিজম ধর্মের আগে পূর্ব ইউরোপের সব দেশেই গিয়েছি। দেখেছি, কিন্ডারগার্টেনের কচি ছেলেমেয়েদের হাতে সাদা ও কালো পুতুল দিয়ে বলা হতো, 'পৃথিবীতে সাদা ও কালো মানুষ, সব মানুষই আমাদের ঘরোয়া, আত্মীয়।' এখন সেই বালাই নেই। পুতুল দেওয়াই উঠে গেছে।
যে দেশেই থাকি, যে দেশেই থাকুন, আজকের রাজনৈতিক করপোরেট জাঁতাকলে কেউ কি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারি? মৃত্যুর আগে জর্জ ফ্লয়েডের কথা- 'আই কান্ট ব্রিদ।' এই নিয়ে কবিতা লিখলাম। শিরোনামও 'আই কান্ট ব্রিদ'। না লিখলে অপরাধী (খসড়া কবিতা। পরে যোগ-বিয়োগ)।
চারদিকে সঙ্গীন, পুলিশ, সৈনিক।
বুকের উপর পাহাড়পর্বত।
নিশ্বাস প্রশ্বাসে টান, মৃত্যু দৈনিক।
ভুলেছি জীবন, বাঁচার শপথ
সর্বদাই আমরা মৃত,
সমাজরাষ্ট্রে দলিত, অহেতুক।
আমাদের দুয়ার আঙিনায় দুঃস্বপ্ন জাগ্রত।
বলতে কি পারবো কোথায় দুঃখসুখ?
সকাল-সন্ধ্যায় রাজন্য অত্যাচার, রক্তচক্ষু।
'আই কান্ট ব্রিদ' বললে ভাববে ষড়যন্ত্র।
মারণমন্ত্র যাদের অস্থিমজ্জায়, নিশ্চয়ই রক্তবুভুক্ষু।
আমাদের হত্যাই ওদের শিক্ষামন্ত্র।
কবি
- বিষয় :
- বর্ণবাদ