ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

শেষ সুযোগটিও হাতছাড়া করা চলবে না

শেষ সুযোগটিও হাতছাড়া করা চলবে না
×

আহসান এইচ মনসুর

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২০ | ১২:০০

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে করোনাভাইরাস চিহ্নিত হওয়ার পর গত ছয় মাসে রোগটি দুই শতাধিক দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০ লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে চার লক্ষাধিক মানুষের। চীনের পর দ্রুতই ইউরোপ ও আমেরিকায় অধিক হারে সংক্রমণের কারণে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ। এখন পর্যন্ত সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপ ও আমেরিকায় সংক্রমণ ও মৃত্যুহার নিম্নগামী হলেও সম্প্রতি এশিয়ার কয়েকটি দেশে বিশেষত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। আড়াই মাস ঢিলেঢালা লকডাউনের পর সবকিছু খুলে দেওয়ায় জনসমাগম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে তাতে যে কেউ উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না।
চীনে করোনা শনাক্তের প্রায় আড়াই মাস পরে বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ওই সময় আমাদের প্রস্তাবনা ছিল বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টাইন যেন যথাযথ হয়। সে ক্ষেত্রে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি। আমরা ঘোষণা করেছি একরকম আর কার্যকর করেছি আরেকরকম। ফলে পর্যায়ক্রমে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে। প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
আমরা প্রথমদিকে সতর্ক ভূমিকা পালন করলে হয়তো অভ্যন্তরীণ বাজার সচল রাখা সম্ভব হতো। সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার মাধ্যমে সব ধরনের আর্থিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের আর্থিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে। বেশ কিছুদিন ঢিলেঢালা লকডাউন চলার পর তা প্রত্যাহার করেছে সরকার। এতে সংক্রমণের হার বেড়েছে। এবার এলাকাভিত্তিক লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংক্রমণের হার বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যেকটি এলাকাকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন- এই তিন জোনে ভাগ করা হয়েছে। গত সোমবার সমকালের প্রধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন জোনে বিভক্ত ওইসব এলাকায় কী কী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে একটি রূপরেখা তৈরি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। বিশেষ করে রেড জোনে প্রাথমিকভাবে ২১ দিন লকডাউন করার চিন্তাভাবনা চলছে।
করোনা আক্রান্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমরা বৃহত্তর অঞ্চলকে লকডাউন করতে দেখেছি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর নিয়ে একটি বৃহৎ অঞ্চল বিবেচনায় লকডাউন হতে পারে। অনেক দেশ পুরোপুরি লকডাউন ছিল। ছোট ছোট ভাগ করে লকডাউন করা হলে সংকট থেকেই যাবে। প্রথম দিকে উত্তর ইতালিকে লকডাউন করার পর সেখানকার মানুষ দক্ষিণ ইতালিতে এসেছিল। ফলে রোমসহ পুরো দক্ষিণ ইতালি আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। অতএব পুরো দেশ লকডাউন করা গেলে ভালো হবে। তা না হলে অন্তত তিনটি-চারটি বড় জোনে বিভক্ত করে লকডাউন করা যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মহল্লাভিত্তিক লকডাউন কতটা ফলপ্রসূ হবে সেটা নিয়ে খটকা থেকেই যায়। সরকার যদি বড় পরিসরে লকডাউন করতে না পারে তাহলে ছোট ছোট আকারে করতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, তা যেন আগে থেকেই জনগণকে জানিয়ে দেওয়া হয়। জনগণ যেন প্রস্তুতি নিতে পারে। আর সিদ্ধান্ত যাতে শতভাগ বাস্তবায়িত হয় সেদিকেও সজাগ থাকতে হবে। একেবারেই কিছু না করার চেয়ে ছোট পরিসরে লকডাউন করা হলেও কিছুটা সফলতা আসতে পারে। আর কিছু যদি না করা হয় তাহলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। সংক্রমণ আরও বাড়লে হাসপাতালগুলোতে সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
ইতোমধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। সুতরাং আর পেছনে তাকানোর অবকাশ নেই। দ্রুতই অভ্যন্তরীণ যাতায়াত, চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি কার্যকর করে তুলতে হবে। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর মানুষ দল বেঁধে কীভাবে গ্রামে গিয়েছিল। ঈদের ছুটিতেও একই ঘটনা ঘটেছে। পরে অফিস খোলার ঘোষণা হলে মানুষ একই কায়দায় কর্মস্থলে ফিরেছে। এতে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রক্রিয়াটি অনেকাংশে ব্যাহত হয়েছে। আমরা চাইব এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর হবে না।
যেসব এলাকা রেড জোন বলে বিবেচিত হবে সেগুলোকে পুরোপুরি লকডাউনে রাখতে হবে। নির্দিষ্টকালের জন্য চলাফেরা একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে। রেড জোন বা ইয়েলো জোনের মানুষ কোনোভাবেই বাইরে যেতে পারবেন না। এসব এলাকায় সব ধরনের জনসমাগম ও কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। মানুষকে অনলাইনে অফিসিয়াল কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনে কারও বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে যেন তা কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, জোনভিত্তিক লকডাউন একই সময়ে শুরু করতে হবে। রেড বা ইয়েলো জোন হিসেবে চিহ্নিত দেশের সব এলাকা একসঙ্গেই লকডাইনের আওতায় আনতে হবে। প্রথম মেয়াদে এক বা দুই অঞ্চল, পরের মেয়াদে অন্য অঞ্চল লকডাউন করা হলে তা কোনো কাজে আসবে না।
যেসব এলাকা লকডাউনের আওতায় থাকবে সেখানে সরকারি উদ্যোগে গরিব ও ছিন্নমূল মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দিতে হবে। কারণ নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যচাহিদা নিশ্চিত না করা গেলে কোনোভাবেই লকডাউন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। বিগত সময়ে ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হয়েছে। আশা করি সরকার এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। ত্রাণ বিতরণের কাজটি কঠিন হবে বলে মনে করি না। আমরা দেখছি যে, লকডাউন তুলে দেওয়ার পরও বাইরে জনসমাগম তুলনামূলক অনেক কম। সচেতনতার অংশ হিসেবে অনেকেই বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকছেন। ইতোমধ্যে যারা বাইরে গেছেন তাদের অনেকেই সংক্রমিত হয়েছেন। ফলে সংক্রমণের ভয়ে মানুষ আর ব্যক্তিগত উপায়ে ত্রাণ দিতে চাইবে না। এমন প্রেক্ষাপটে ত্রাণ বিতরণের বিষয়টি আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখা উচিতও হবে না।
সরকারি উদ্যোগে সুরক্ষা সামগ্রী নিশ্চিত করেই ত্রাণ বিতরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইতোমধ্যে বহুসংখ্যক পুলিশ ও সেনাসদস্য সংক্রমিত হয়েছেন। সবচেয়ে ভালো হবে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করা। কষ্ট হলেও নির্দিষ্ট মেয়াদে লকডাউন বাস্তবায়ন করতেই হবে। এর বিকল্প ভাবার অবকাশ নেই। বিলম্ব হলে আর্থিক ও জীবনের ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি এ দুর্যোগ আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট

আরও পড়ুন

×