বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
ড. আতিউর রহমান
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২০ | ১২:০০
বিশ্বজুড়েই চলছে করোনা সংকট। বাংলাদেশও তার বাইরে নেই। এরই মধ্যে অনেক মূল্যবান জীবন চলে গেছে। সর্বত্র ভয়ের পরিবেশ। তাই জীবন ও জীবিকা নিয়ে ঝুঁকির শেষ নেই। এমনই এক বাস্তবতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ বছরের বাজেট দিয়েছেন। সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। অন্যদিকে লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের কারণে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, আয়-উপার্জনে ধস, বিশ্বমন্দায় রপ্তানি ও প্রবাসী আয় পড়ে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জীবন ও জীবিকা দুইই হুমকির মুখে। এই সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কী করে এই মহামারি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং একইসঙ্গে অর্থনীতির পুনর্জীবনের ভিত্তি নির্মাণ করা যায়।
মনে রাখতে হবে, অত্যন্ত অনিশ্চিত পরিবেশে আমাদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কবে এই ভাইরাসকে আমরা পরাজিত করতে পারব তা কেউ বলতে পারছেন না। এমন অনিশ্চয়তায় কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সামাজিক সুরক্ষা আরও জোরদার করা, সবার জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং আগামী দিনের সমাজ ও অর্থনীতির পুনর্জাগরণের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবপুঁজির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে গত ১০-১২ বছর ধরে আমরা যে ম্যাক্রো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও দারিদ্র্য নিরসনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছিলাম সেসব যাতে এই করোনাকালে ধুয়েমুছে না যায় সেজন্য নিজেদের সক্ষম করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ মহলসহ সাধারণ মানুষ যে রকম 'আউট অফ দ্য বক্স' বাজেট আশা করেছিলেন প্রস্তাবিত বাজেটে সে রকম উদ্ভাবনী উদ্যোগ ওই মাত্রায় নেই এ কথা মানতেই হবে। তবে সম্ভবত সরকার মধ্যমমেয়াদি বাজেট কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ওই পরিমাণ সৃষ্টিশীল বা উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিতে সক্ষম হয়নি। সম্পদের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেই অগ্রাধিকার পুনর্বণ্টনের পরামর্শ ছিল। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা করা হয়তো সম্ভব হয়নি।
৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার ঘোষিত বাজেটের আকার নিয়ে কিছু বলার নেই। তবে বাজেট ঘাটতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। অনুদানসহ সামগ্রিক ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশের নিচে রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ অনুপাত ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আমি মনে করি এক দশকের মধ্যে বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের আশপাশে ধরে রাখা গেছে, এবং আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিচারে বাজেট ঘাটতি ৭ শতাংশ পর্যন্ত করা যেত। বাড়তি অর্থ আমরা স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষির জন্য ব্যয় করতে পারতাম।
তবে এই বাড়তি অর্থের জন্য (অর্থাৎ জিডিপির আরও ১ শতাংশ বাজেট ঘাটতির অর্থায়নের জন্য) অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই। বরং আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী (যেমন: বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ) প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়া উচিত আরও বেশি মাত্রায়। করোনাজনিত আর্থিক স্থবিরতা মোকাবিলা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ধারাবাহিকতার বিবেচনায় এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া আমাদের জন্য সহজই হওয়ার কথা। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি মনে করি, কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে এ অনুপাত দ্বিগুণ করা সম্ভব।
বাজেট অর্থায়নের জন্য সরকার খুব বেশি পরিমাণে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। এছাড়াও ইতোমধ্যে ঘোষিত প্রণোদনাগুলোও বহুলাংশে ব্যাংকনির্ভর। কাজেই ব্যাংকগুলোর ওপর বাজেট অর্থায়নের চাপ খুব বেশি না দেওয়াই কাম্য। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুসারে সরকার ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। আর প্রস্তাবিত বাজেটে এ পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া ঋণের অনুপাত বেড়েছে ৪ শতাংশের কম। মোট জাতীয় বাজেটের আকার বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। সে হিসেবে বলা যায়, সরকার সচেতনভাবেই অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলোর ওপর কম চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
খাতওয়ারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের মতো আসন্ন অর্থবছরেও সর্বোচ্চ বরাদ্দ গিয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি এবং পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে (যথাক্রমে ১৫.১ শতাংশ এবং ১১.৪ শতাংশ)। অনেকেই মনে করেন পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ কিছুটা কমিয়ে সেটা করোনা মোকাবিলার অগ্রাধিকার খাতগুলোতে বরাদ্দ দেওয়া যেত। তবে এটাও মনে রাখতে হবে করোনাজনিত আর্থিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার একান্ত প্রয়োজনীয়। সে বিচার থেকেই হয়তো পরিবহন ও যোগাযোগকে এ রকম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ আশা করেছিলেন প্রায় সকলেই। তবে বাজেটের শতাংশ হিসেবে বেড়েছে সামান্যই। চলতি বছরের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে আসন্ন অর্থবছরে ৫ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। আকস্মিকভাবে বরাদ্দ বাড়ালে তা কার্যকরভাবে ব্যয় করা কতোটা সম্ভব সে বিবেচনার জায়গা থেকেই হয়তো এমন বরাদ্দ এসেছে স্বাস্থ্য খাতে। আশা থাকবে বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার আগে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে। বাজেট অধিবেশনের আলোচনা সাপেক্ষে হয়তো এ বরাদ্দ কিছুটা বাড়তেও পারে। .
সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে প্রস্তাব করা হয়েছে। করোনায় নতুন করে দরিদ্র হওয়া মানুষকে রক্ষা করতে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রত্যাশিত। তবে আরও বেশি মাত্রায় বাড়ানো যেত বলে আমরা মনে করি। মোট বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ করলে দারিদ্র্য নিরসনে গত এক দশকের অর্জন ধরে রাখা সুনিশ্চিত হতো।
করোনাজনিত আর্থিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কৃষিই আমাদের রক্ষাকবচ। গত এক দশক ধরে কৃষিতে ধারাবাহিক সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের সুফল আমরা পেয়েছি দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এমন কি রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। করোনা পরিস্থিতির শুরুতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষির জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করায়, আশা করা হয়েছিল আসন্ন বাজেটেও তার ধারাবাহিকতা থাকবে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এর কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে। চলতি বছর বাজেটের ৪ শতাংশের কম এ খাতে বরাদ্দ থাকলেও, প্রস্তাবিত বাজেটে এ অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশে। তবে অন্য কিছু খাতে বরাদ্দ কিছু কমিয়ে এ খাতের বরাদ্দের অনুপাত আরও কয়েক শতাংশ বাড়ানো যেত বলে মনে হয়।
অগ্রাধিকার খাতে বরাদ্দ বাড়ানো যাচ্ছে না, কারণ বাড়তি বরাদ্দ ব্যয় করার মতো দক্ষতা সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর নেই- এমন শোনা যাচ্ছে। আসন্ন অর্থবছরে বাড়তি বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যয় করার দক্ষতা যেন বাড়ে সে দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। কারণ করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে অন্তত আরও কয়েক বছর স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, এবং সে অনুসারে বরাদ্দও দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ; সাবেক গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক ও
বঙ্গবন্ধু চেয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- বাজেট ২০২০-২১