ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

করোনাদুর্যোগ

অসুখের বিশ্বায়ন বা বিশ্বায়নের অ-সুখ

অসুখের বিশ্বায়ন বা বিশ্বায়নের অ-সুখ
×

মৌসুমী বিশ্বাস

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ জুন ২০২০ | ১৪:৪৩

অবাধ্য এক অসুখের কাছে বিশ্ব আজ মাথানত করে আছে, যেন-বা এই দৃশ্য অমরত্ব লাভের পথে এগিয়ে চলেছে। কী বিষাদময় দিনযাপন আর বিপুল অসহায়ত্ব অধিকার করে আছে চরাচর। চাইলেও এই বিরুদ্ধতা কেউ অস্বীকার করতে পারছে না। একটি বিশাল দেশের ছো্‌ট্ট এক অঞ্চল থেকে ছড়িয়ে পড়া এই মহামারিই এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। সারা দুনিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি, আবিস্কার, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, সুখ-অসুখ সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে এই মহামারি ঘিরে। অথচ কিছুদিন আগেও 'করোনা' নামের অদৃশ্য মহাশত্রুটির নাম অভিধানেই ছিল না। অথচ এখন ঘুমে, জাগরণে, স্বপনে, চেতনায়, অচেতনে যে কথাটি আগে স্মরণে আনতে হচ্ছে, তা হচ্ছে- করোনা।

বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো কিছুই আর সীমানাবন্দি থাকে না। বাণিজ্যচুক্তি থেকে সমরায়ন, সাম্রাজ্যবাদ আর বর্ণবাদী আগ্রাসন থেকে মহামারির মেরুকরণ; কিছুই না। প্রেক্ষাপট এখন এমন যে, চাইলেই মানুষ এখন আর কোনো নিয়ন্ত্রণ রেখা টানতে পারছে না। অথচ এমন নয় যে, এ রকম দুর্যোগ পৃথিবীতে আর কখনও আসেনি। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরেই তো মানুষ এমন মহামারি মোকাবিলা করে টিকে থেকেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায় চলা ইবোলার প্রাদুর্ভাবে ১১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান গেব্রাইয়াসুস সংবাদ সম্মেলন করে তখন বলেছিলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জনসংকট এবং বিশ্ববাসীর নজর দেওয়ার সময় এসেছে। এরপর গোটা বিশ্ব দেখেছে কীভাবে ইবোলাকে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া হয়নি বা ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। তবে 'করোনা'র ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পুরোটাই উল্টো। এখনও নিয়ম করে গেব্রাইয়াসুস সংবাদ সম্মেলনে আসেন, পরিস্থিতি বর্ণনা করেন, জটিল সব সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্নেষণ দেন; আক্রান্ত আর মৃতদের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘতর হয়। সেইসঙ্গে তার কপালের রেখাগুলোর ভাঁজ দীর্ঘ হতে দেখে আমরা বুঝে যাই যে পরিস্থিতি আসলে কতটা উত্তাল, নিয়ন্ত্রণহীন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি তাহলে শুরুতে সত্যিই বুঝতে পারিনি এত বড় ভয়াবহতা? নাকি কিছুটা উদাসীনতাও ছিল ছায়াসঙ্গী হয়ে? যার ফলে সবকিছু একাকার হয়ে ছড়িয়ে গেছে বিশ্বময়। বিষয়টা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, কেউ এর কোনো দায় নিচ্ছে না। অনেকেই ভাইরাস ছড়ানোর দায়ে আঙুল তুলছে এর উৎপত্তিস্থলের দিকে। অন্যদিকে চীন বলছে সফরের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের ভুলে এই বিপত্তি। ট্রাম্প প্রশাসন হুমকি দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অর্থায়ন বন্ধ করার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুরোধ জানাচ্ছে সেটি যেন না হয়। কী একটি অবস্থা! ভ্যাকসিনের জন্য সারা পৃথিবীতে প্রতীক্ষারত ও পাগলপ্রায় মানুষ গবেষণাগারের দিকে তাকিয়ে আছে। একটি সমন্বিত বৈশ্বিক পরিকল্পনা এই মুহূর্তে বড় প্রয়োজন। মুশকিল হচ্ছে, কেউ জানে না কবে মিলবে কাঙ্ক্ষিত ভ্যাকসিন আর কবে শেষ হবে এই দাহকাল।

করোনার প্রভাবে বৈশ্বিক যে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে সেটিও ভয়াবহ। গত এপ্রিলে দেওয়া বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, আর্থিক এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৯ লাখ কোটি ডলার। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক তাদের সদ্য প্রকাশিত 'গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস'-এ বলেছে বিগত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মন্দায় পড়েছে বিশ্ব। এই মহামারির কারণে ৭-১০ কোটি মানুষ চরম দরিদ্র হবে। বিশ্বব্যাপী ১৭ কোটি মানুষের দৈনিক আয় ৩ দশমিক ২০ ডলারের (২৭১ টাকা) নিচে নেমে আসবে। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাথাপিছু আয় কমে যাবে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, বিশ্ব অর্থনীতি চলতি বছরে ৩ শতাংশ হ্রাস পাবে। ফলে ১৯৩০ সালের মতো উদ্ভূত মহামন্দা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে এর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে, সে কথা নিশ্চিত বলা যায়। এসডিজি বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রার সূচক নির্ধারণে হয়তো আবার নতুন করে ভাবতে হবে নীতিনির্ধারকদের। অথচ চলমান বৈশ্বিক অর্থনীতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দারুণ সফলতার সঙ্গে এগোচ্ছিল। দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল, যা ২০০৫ সালেও ছিল ৪০ শতাংশ। কিন্তু মহামারি পরবর্তীকালে কর্মসংস্থান, অসমতা দূর, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার, নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপসহ সমন্বিত সমাজ উন্নয়নের মতো কৌশলগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিনতর হয়ে পড়বে।

এ তো গেল অর্থনৈতির পরিসংখ্যানগত বিশ্নেষণ; কিন্তু মানুষের জীবন, মন ও মননের কী হবে? কবে আসলে শেষ হবে আমাদের এই অ-সুখের যাপিত জীবন! শোকের কোনো দেশ নেই। সাওপাওলোতে যে ব্যক্তি করোনায় মারা যাচ্ছেন, তার পরিবারের চোখের জল আর সদরঘাটে যিনি মারা গেলেন তার স্বজনের চোখের জলে কোনো বিভেদ নেই। দুঃখরাও যেন সাম্যবাদী এখানে। ধনী-নির্ধন, নর-নারী, সাদা-কালো কোনো কিছুতেই কিছু যায় আসে না কভিড-১৯ নামের শত্রুটির। সবারই দিন কাটে প্রবল উৎকণ্ঠা আর অজানা ভবিষ্যতের আশঙ্কায়। শিশুরা বিদ্যালয়ে যায় না, শ্রমিকরা কর্মহীন, কৃষকরা মুখ অন্ধকার করে ঘুরে বেড়ায়; পার্কের মাঠ মানুষের পদচারণায় আর মুখর হয় না। মানুষ ঘুমাতে যায় পরের দিন আবার সূর্যোদয় দেখতে পাবে কিনা সেই শঙ্কা নিয়ে। আর সকালে জেগে ওঠে মৃত্যুসংবাদ না শোনার প্রত্যাশায়। কিন্তু সব প্রত্যাশা ধূলিসাৎ করে প্রতিদিনই নিয়ম করে শুধু মৃত্যুসংবাদ আসে। এমন অ-সুখের বিশ্বায়ন কেউই কোনোদিন চায়নি। সবাই চায় শেষ হোক এই গ্রহণকাল। সকালে ঘুম ভেঙে মানুষ দেখুক কপালে উদ্বেগের রেখা মুছে গেব্রাইয়াসুস তার সংবাদ সম্মেলনে বলছেন, বিগত আঠাশ দিনে আর কেউ সংক্রমিত হননি; হতচ্ছাড়া অসুখে ঝরে যায়নি একটি প্রাণও। 'করোনা' শব্দটির অস্তিত্ব শুধু অভিধানে ছাড়া আর কোথাও নেই এখন। প্রাণান্ত পরিশ্রম করা সারা পৃথিবীর স্বাস্থ্যকর্মীরা আগামী এক মাস শুধু পাহাড় আর সমুদ্রে ঘুরে সময় কাটাবেন। আগামী দু'দিন দেশ-জাতি-কালের সীমানা মুছে জগৎজুড়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হবে। আমাদের দেশে দুপুর আড়াইটায় সব চ্যানেলে গান বাজবে- 'আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও, আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও...।'

মানবাধিকার কর্মী; একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত

আরও পড়ুন

×