ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি

জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসন, জনগণ

জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসন, জনগণ
×

ফাইল ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ জুন ২০২০ | ১৪:৪৩

দেশের কোথাও কোথাও অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন- রোববার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য যথেষ্ট কৌতূহল উদ্দীপক, সন্দেহ নেই। তার মানে, দুর্নীতির অভিযোগ ও জনপ্রতিনিধি বরখাস্তের ঘটনাটিকে সরলরৈখিকভাবে দেখার অবকাশ নেই। আমরা এতদিন দেখছিলাম, বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ, পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম বা দুর্নীতির দায়ে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা হচ্ছে। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর গত তিন মাসে অন্তত ১১২ জন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৬০ হাজার জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। সেই তুলনায় বরখাস্তের এই সংখ্যা কারও কারও কাছে সামান্য মনে হতে পারে বৈকি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এত স্বল্প সময়ে এতজন স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি বরখাস্ত হতে আগে কখনও দেখা যায়নি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার শূন্য সহিষ্ণুতার কথা বিভিন্ন সময়েই বলে থাকে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও ব্যবস্থাও মাঝেমধ্যে নেওয়া হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালীরা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আলোচ্য চিত্রকে সেদিক থেকে ব্যতিক্রম বলতেই হবে। কিন্তু জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই বরখাস্ত এবং সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে বাহবা ওঠার পেছনেও যে অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে, সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে তা স্পষ্ট।

বস্তুত এই প্রশ্নও আগেও উঠেছে যে, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রশাসনের বিরোধের জের ধরে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেয় জনপ্রশাসন। যদিও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলছেন যে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়; এটা স্বীকার করতে হবে যে, অভিযোগ আসে মাঠ প্রশাসন থেকেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্তও করে থাকে তারাই। এমতাবস্থায় সর্প হয়ে দংশন ও ওঝা হয়ে চিকিৎসার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় কি? সমকালের প্রতিবেদনটিতে দেখা যাচ্ছে- জনপ্রশাসনের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলার কয়েক দিনের মধ্যেই একজন জনপ্রতিনিধি নিজেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত, আটক ও বরখাস্ত হয়েছেন। এ ধরনের পদক্ষেপকে কেউ যদি প্রতিশোধমূলক আখ্যা দেয়, উড়িয়ে দেওয়া যাবে? আমরা দেখছি, একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই ঘুষ ও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান। এ ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দুই দফা নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও সংশ্নিষ্ট জেলা প্রশাসক কোনো ব্যবস্থা নেননি। এ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে এক যাত্রায় পৃথক ফল দেখা যায় না? আমরা দেখছি, বরখাস্তদের মধ্যে রয়েছেন জেলা পরিষদ সদস্য, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্য। অর্থাৎ, সংসদ সদস্য ছাড়া আমাদের দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সব পর্যায়ের প্রতিনিধিই রয়েছেন বরখাস্তের তালিকায়। অবশ্য বিদ্যমান বাস্তবতায় জনপ্রশাসনের পক্ষে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অভিযোগ তোলারও সুযোগ নেই। সেদিক থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা কি 'সহজ'?

জনপ্রতিনিধি বা জনপ্রশাসন- আমরা কোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাফাই গাইছি না। বরং এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা অনেকবারই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেছি। আমরা বলেছি, রাজনৈতিক রং বা প্রশাসনিক পরিচয় যাই হোক না কেন, দুর্নীতি ও অনিয়ম করলে ছাড় নয়। বিশেষত করোনার সময়ও যারা দরিদ্রের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে চায়, তাদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু আমরা একই সঙ্গে দেখতে চাই- দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা একচোখা হচ্ছে না। কেবল স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাই নন্দঘোষ, বাকি সবাই ধোয়া তুলসীপাতা- আমরা তা মনে করি না। আমরা দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অনৈতিকতার অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে চলেছে গদাইলস্করি চাল। এক যাত্রায় পৃথক ফল হতে পারে না। আমরা মনে করি, অভিযোগ যারই বিরুদ্ধে উঠুক তদন্ত এবং ব্যবস্থা গ্রহণে একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। আমরা মনে করি- জনপ্রতিনিধি বা জনপ্রশাসন, উভয়ই জনগণের সেবক মাত্র। যারাই জনস্বার্থ বিঘ্নিত করবে, যারাই জনগণের অধিকার ও প্রাপ্য অস্বীকার করবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, কাউকে ছাড় দিয়ে কাউকে শাস্তি প্রদান অনিয়ম ও দুর্নীতিই বাড়িয়ে তুলবে মাত্র। কোনো একটি 'জনসেবক' পক্ষ বেপরোয়া হয়ে উঠলে, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনসাধারণই।

আরও পড়ুন

×