ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

করোনা চিকিৎসা

বৃহৎ ভবন লইয়া কী করিব!

বৃহৎ ভবন লইয়া কী করিব!
×

ফাইল ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ জুন ২০২০ | ১৪:০১

জটিল রোগের চিকিৎসায় যেসব হাসপাতালের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হতো, তার বেশিরভাগই কভিড-১৯ চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না- সোমবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য যেমন হতাশাজনক, তেমনই বিক্ষোভ জাগানিয়া। অস্বীকার করা যাবে না যে, সর্বব্যাপ্ত করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তৃতির শুরুর দিনগুলোতেই দেশে এর চিকিৎসার জন্য কিছু হাসপাতাল নির্ধারিত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগ ও অসুস্থতার পাশাপাশি কভিড-১৯ চিকিৎসা দেওয়ারও নির্দেশনা জারি করা হয়। এটাও স্বীকার করতে হবে যে, করোনার মতো অতি সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য কোনো হাসপাতালের একাংশ স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করা সহজ নয়। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা দেশের শীর্ষ বিশেষায়িত হাসপাতালে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি থাকবে না কেন? আমরা মনে করি, বিষয়টি নিছক অদক্ষতা বা অব্যবস্থাপনার নয়। এখানে সদিচ্ছা ও আন্তরিকতারও ঘাটতি রয়েছে। আমরা জানি, করোনাভাইরাস এক নতুন পরিস্থিতি। এর গতি-প্রকৃতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নির্ধারণেই সময় ব্যয় হয়েছে অনেক। ইতোমধ্যে যথেষ্ট সময় কি ক্ষেপণ হয়নি। বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে। তারপর এরই মধ্যে সাড়ে তিন মাস চলে গেছে। এখনও যদি বড় বড় হাসপাতাল প্রস্তুতিপর্বেই থাকে, তাহলে চিকিৎসা মিলবে কখন।
ভুলে যাওয়া চলবে না, যে কোনো পরিস্থিতিতে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো হাসপাতালকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। সমকালের প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে, দেশের অন্যান্য হাসপাতালে যেখানে চিকিৎসক ও সেবিকা সংকট প্রকট, সেখানে এই হাসপাতালে শয্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা বেশি। সেবিকার অনুপাতও প্রায় সাড়ে তিন গুণ। অথচ এখন পর্যন্ত হাসপাতালটির বৃহৎ কমপ্লেক্সের একটি ভবনে করোনা নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করেই দায় সারছে! আমরা আরও বিস্মিত হয়েছি এই দেখে যে, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার ব্যবস্থাই নেই! অথচ করোনা আক্রান্তরা বক্ষব্যাধি সংক্রান্ত জটিলতাতেই বেশি ভোগেন। শ্বাসকষ্ট কিংবা ফুসফুসের জটিলতায় যেখানে হাসপাতালটি সম্মুখসারিতে থাকতে পারত, সেখানে দেখা যাচ্ছে খোদ পরিচালকই নিয়মিত হাসপাতালে আসছেন না 'করোনা আতঙ্কে'। এই স্বাস্থ্য-দুর্যোগে যেখানে বাংলাদেশের শিশুরা বৈশ্বিক মাত্রার তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে; সেখানে শিশুর চিকিৎসায় দেশের প্রধান বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ঢাকা শিশু হাসপাতাল কেবল একটি 'আইসোলেশন ইউনিট' করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। এসব চিত্র আমাদের কাছে অবিশ্বাস্যই মনে হয়। বিপদের দিনে যদি কাজেই না আসে, তাহলে এত বড় বড় ভবন, অবকাঠামো, বরাদ্দ ও সুবিধার উপযোগিতা কী? বিষম পরিস্থিতিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি উক্তি বহুল উদ্ধৃত- এই জীবন লইয়া কী করিব? রাজধানীর বড় বড় হাসপাতালের অবস্থাদৃষ্টে আমাদেরও বলতে হয়- এই বৃহৎ ভবন লইয়া কী করিব!
বিএসএমএমইউ বা বড় বড় হাসপাতাল কীভাবে তাদের খ্যাতি ও মর্যাদার প্রতি অবিচার করেছে, তার প্রমাণও রয়েছে আলোচ্য প্রতিবেদনে। সেখানকার চিকিৎসকরা নিজ হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে পারছেন না। এই প্রশ্ন সঙ্গত যে, যে হাসপাতাল আপৎকালে নিজের চিকিৎসকের চিকিৎসা দিতে পারে না, তারা জাতিকে কী দেবে? মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অবশ্য সমকালকে বলেছেন যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে করোনা রোগীর চিকিৎসা শুরু হবে। আমরা দেখতে চাই, জরুরি এই উদ্যোগ আর আর দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যাচ্ছে না। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, দেশের শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমাদের প্রত্যাশা কেবল করোনা চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ নয়। আমরা চেয়েছিলাম, করোনা শনাক্ত কিটের মতো জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী উদ্ভাবনে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে আসবে। আমরা চেয়েছিলাম, টিকা বা প্রতিষেধক আবিস্কারে চিকিৎসা ও ওষুধ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাপী যে তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে, সেই সারিতে অন্তত আমাদের দেশের শীর্ষ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটির নাম থাকবে। দুর্ভাগ্যবশত, করোনার প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও আমরা দেখতে পাইনি। ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় যে প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে এবং অনেক জটিল অস্ত্রোপচারে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করছে; করোনায় তারা কেন পিছিয়ে থাকল, দীর্ঘমেয়াদে হলেও এর কারণ অনুসন্ধান জরুরি। আমরা চাই, করোনাকালে উন্মোচিত অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা সম্পর্কেও চিন্তাভাবনা করুন চিকিৎসা খাতের নীতিনির্ধারকরা।

আরও পড়ুন

×