ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

ভূতুড়ে বিল ভয়ঙ্কর

ভূতুড়ে বিল ভয়ঙ্কর
×

যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভের সময় সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ফোর্স ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যের সঙ্গে তর্কে জড়ান এক আন্দোলনকারী। ফাইল ছবি।

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২০ | ১২:০০

করোনাকালে বিদ্যুৎ ও পানির অস্বাভাবিক বিল ক্ষোভ জাগানিয়া হলেও প্রবীণ নাগরিকদের কাউকে কাউকে যদি নস্টালজিক করে তোলে, তাতে দোষের কিছু নেই। বাংলাদেশের নাগরিক জীবনে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন বিল নিয়ে ভোগান্তি ও হয়রানি একসময় ছিল মাসিক ব্যাপার। প্রায় প্রতিমাসেই বিল নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলত। বিষয়টি এতটাই 'স্বাভাবিক' হয়ে উঠেছিল যে, নাটক, কবিতা, গান ও গল্পেও স্থান করে নিয়েছিল। হাতে হাতে সেলফোন শোভা পেতে থাকার পর সাধারণ নাগরিকের কাছে ল্যান্ডফোন যখন ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয়ই হয়ে উঠেছে; তখন বিল মানবিক না ভূতুড়ে, তা অপ্রাসঙ্গিক। গ্যাস বিল মাসিক ও চুলাভিত্তিক হয়ে যাওয়ার পর এ নিয়ে ভোক্তা ও কর্তৃপক্ষের হাঙ্গামা কমেছে। বাড়িতে বাড়িতে বৈদ্যুতিন মিটার এসেছে বটে, বিদ্যুতের মিটার 'রিড' করা নিয়ে রয়েছে অনেক কথা। কিন্তু বিল নিয়ে যে ভূতুড়ে কাণ্ড চলছে, তা আগের সব রেকর্ডও যেন ভঙ্গ করেছে।
বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ ও পানির বিল নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে 'অভিযোগের পাহাড়' জমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে নাগরিকদের বিস্ময় ও বিক্ষোভ। ঢাকার বাইরের শহরগুলোতেও পরিস্থিতি তথৈবচ। এমনকি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাভুক্ত এলাকাতেও এবার গেছে বেশি বিল। আলোচ্য প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ বিল কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই-তিন গুণ বেশি ধরা হয়েছে। পানির বিলের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও তা ৮-১০ গুণও বেশি। স্পষ্টতই এক্ষেত্রে রয়েছে গুরুতর অসঙ্গতি। কর্তৃপক্ষের দিক থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে যে, করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রথম দিকে মিটার রিডাররা বাড়ি বাড়ি না গিয়ে আনুমানিক বিল করায় কম এসেছিল। এখন প্রকৃত বিলের সঙ্গে আগের জেরও সমন্বয় করা হয়েছে। যে কারণে বিদ্যুৎ বা পানির বিল বেশি আসছে। তারা বলছে, কেউ অভিযোগ নিয়ে এলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং বেশি বিল আদায় হলে পরবর্তীকালে সমন্বয় করা হবে। এক্ষেত্রে আমাদের প্রশ্ন দুটি। প্রথমত, এক-দুই মাসের বিল সমন্বয় করতে গিয়ে এত বাড়তি আসার কথা নয়। আর এত গ্রাহকের বিলের ক্ষেত্রেই বা 'ভুল' হবে কেন। দ্বিতীয়ত, বিল বেশি কাটা হলে অভিযোগ নিয়ে যাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা আরও অবাস্তব। কতজন গ্রাহকের পক্ষে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব? বাড়তি বিলের অভিযোগ করতে গিয়ে যদি কেউ করোনা আক্রান্ত হয়, তার দায় কে নেবে?
আমরা বরং এই অভিযোগই আমলে নিতে চাই যে, বিল আদায়ের 'লক্ষ্যমাত্রা' পূরণ করতে গিয়ে বা 'পারফরম্যান্স' দেখাতে গিয়ে এমন ভূতুড়ে বিল করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এমন প্রবণতা কেবল অন্যায় নয়, অমানবিকও। নাগরিক সেবাদাতা কোনো সংস্থা একুশ শতকে এসে এভাবে নাগরিকদের হয়রানি করতে পারে না। আবার এমন সময়ে এই বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যখন মানুষের আয় কমেছে, এমনকি কেউ কেউ হারিয়েছে কর্ম। এই সময় বিলের বাড়তি বোঝা নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া আর কী হতে পারে? আমরা দেখতে চাই, অবিলম্বে সব ভূতুড়ে বিল বাতিল করা হয়েছে। ইতোমধ্যে যাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে, সেগুলো ফেরত দেওয়া হয়েছে কিংবা পরবর্তী বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। আর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই সময়ে এসে প্রাচীন পদ্ধতির মিটার রিডিং কবে যাবে? স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কেন্দ্রীয়ভাবে সব মিটার পাঠ করলেই হয়! বিলম্বে হলেও সর্বক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আর করোনাকালে যারা নাগরিকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করতে চাইছে, তারা কারোরই বন্ধু নয়। না নাগরিকের, না সরকারের। মহামারির সময়ে যখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা জরুরি, তখন ঘরে ঘরে অশান্তির বিল পৌঁছে দিতে চাইছে কারা?

আরও পড়ুন

×