ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে নারী পাচার

শাস্তি দিন, নজরদারি বাড়ান

শাস্তি দিন, নজরদারি বাড়ান
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

নারী পাচারের গডফাদার আজম খানের যে 'কীর্তি' সোম ও মঙ্গলবারের সমকালে প্রকাশ হয়েছে, তা অনেকটা অভাবনীয়। তার নেতৃত্বে যেভাবে দুবাইয়ে সহস্রাধিক নারী পাচারের শিকার হয়েছে, তা আমাদের যেন হরর মুভিকেও হার মানায়। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আজম খান ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, আজম খান ও তার সহযোগীরা চাকরির প্রলোভনে সহস্রাধিক তরুণীকে দুবাইয়ে পাচার করে যৌনকর্মে বাধ্য করে। তরুণীরা তার কথামতো না চললে তাদের টর্চার সেলে আটকে রেখে দিনের পর দিন মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো বর্বরতা চালায় এই অপরাধী। আমরা দেখেছি, দুবাইয়ে তিনটি ফোরস্টার ও একটি থ্রিস্টার হোটেলের মালিক এই আজম খান। হোটেল ব্যবসার নাম করে বেশি বেতনে চাকরির প্রলোভনে তরুণীদের দুবাইয়ে তারা সহজেই পাচার করতে সক্ষম হয়। অবাক কাণ্ড, এ কাজে আজম খানকে সহযোগিতা করে দেশের অর্ধশতাধিক দালাল এবং দেশজুড়ে বিস্মৃত সেসব কমিশনভোগী দালালের নেটওয়ার্ক। আরও বিস্ময়, আজম খান ও তার সহযোগীরা বছরের পর বছর ধরে এ অপকর্ম চালিয়ে আসছে আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি টেরই পেল না! অথচ দুবাই পুলিশের তৎপরতার পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদন অনুসারে, সম্প্রতি আজম খানের নারী পাচার ও যৌন ব্যবসার বিষয়ে জেনে যায় দুবাই পুলিশ। তারা বিষয়টি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানায় এবং একই সঙ্গে তার পাসপোর্ট বাতিল করে দুবাই কর্তৃপক্ষ। এরপর একটি এক্সিট পাস নিয়ে আজম খান দেশে চলে এসে আত্মগোপনে চলে যান। দেশে ফেরার পর তাকে ধরতে অভিযান শুরু করে সিআইডি। গোপনে একটি পাসপোর্ট তৈরি করেন এবং পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার মধ্যেই দুই সহযোগীসহ আজম খানকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। আমরা জানি, আজম খানের বিরুদ্ধে দেশে ছয়টি হত্যা মামলাসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। এরপরও এতদিনে তার গ্রেপ্তার না হওয়াটা রহস্যজনক।
একা আজম খানই যদি সহস্রাধিক নারী পাচার করতে পারে, আমরা জানি না এরকম আরও কত মানব পাচারে নির্মম বলি হয়েছেন। ইতোমধ্যে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত কিছু কিছু চক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছে। তারপরও কিন্তু থেমে নেই আধুনিক এ দাসপ্রথা। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘুষের বিনিময়ে পাচারকারীদের সহায়তা করে থাকেন। আবার আমরা দেখছি, মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নজির অনেক কম। অনেকে ধরা পড়ে না, যারাও বা ধরা পড়ে তারা বেশিদিন আটকে থাকে না বরং আইনের কোনো না কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে। আমরা দেখতে চাই, আজম খানের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটবে না। আমরা জানি বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে, দুটি দেশের বিমানবন্দর ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এত নারী পাচার হলো? আবার ভিন্ন দেশে কাজ করার ক্ষেত্রে যে ওয়ার্ক পারমিট প্রয়োজন, সেটিই বা কীভাবে জোগাড় হলো। ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায়ও সতর্কতার বিকল্প নেই।
দেশ থেকে নারী পাচারের পশাপাশি তরুণ জনশক্তির পাচারও থেমে নেই। আমরা দেখেছি, গত মাসে মানব পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। বস্তুত তখন থেকেই নতুন করে বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে। ইতোমধ্যে লিবিয়ার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানব পাচার ও সন্ত্রাস দমন আইনে সারাদেশে বাইশটি মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে অপরাধীদের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়। আমরা মনে করি, প্রশাসন এভাবে জোরালো পদক্ষেপ নিলে পাচারের মতো এমন গুরুতর অপরাধ কমবে। দেশের ভেতর কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে কেউ যাতে না পড়ে, সেজন্য সচেতনতাও জরুরি। উন্নতি যেখানে দেশের নিয়তি, সেখানে আমাদের জনগোষ্ঠী এভাবে পাচার চক্রের শিকারে পরিণত হতে পারে না।

আরও পড়ুন

×