ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

রাজনীতিতে 'হাইব্রিড'

রাজনীতিতে 'হাইব্রিড'
×

হীরেন পণ্ডিত

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

আওয়ামী লীগকে তৃণমূল বিস্তৃত জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাসিত তার কন্যা শেখ হাসিনা চরম দুঃসময়ে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে হাল ধরেছেন। গণতন্ত্রের সংগ্রামে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন। বার বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। আওয়ামী লীগকে জনপ্রিয় দল হিসেবে ২১ বছর পর ক্ষমতায় এনেছেন এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য নিরলস কাজ করছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যার দুঃসময়ে যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন তারাই প্রকৃত আওয়ামী লীগার। কারণ তাদের ত্যাগ অনেক বেশি। তারাই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এবং ওয়ান ইলেভেনে ভূমিকা রেখেছেন। এটাই দলের কঠিন বাস্তবতা। সুবিধাবাদীরা যখন যে ক্ষমতায়, সেখানেই ভিড় করে। কিন্তু রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণ ও দুর্নীতির নেটওয়ার্কে সুবিধাবাদীরা যেভাবে নিজেদের জড়িয়ে আছে তাতে আদৌ কি সরানো যাবে। আওয়ামী লীগে বিভিন্ন দল থেকে এসে অনেকেই ক্ষমতা ভোগ করছেন। তারা আওয়ামী লীগার হতে পারেননি, দলের ত্যাগী কর্মীদেরও হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে পারেননি। সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের সামনে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগ এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তির পাশাপাশি সব রকম শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়, অবিচার, জুলুমের বিরুদ্ধে সবসময় রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার, প্রতিবাদী ভূমিকা রেখে এসেছে এবং এখনও রাখছে। এই দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটে। এ দলের জন্মকাল থেকে শুরু করে এই ৭০ বছরের ইতিহাস সেই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। এখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৃতীয় বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছেন।
কোথাও কোথাও দলের নামে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অন্যের জমি-জায়গা, বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করার খবরও পত্রিকায় আসে। যদিও আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব বিষয়ে দলের অবস্থান, সরকারের অবস্থান, মনোভাব জানিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তব্য দেন, সাংগঠনিকভাবে কখনও কখনও ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। কিন্তু পরিস্থিতির খুব যে উন্নতি হচ্ছে বা অবস্থান বদলাচ্ছে আপাতদৃষ্টে তা মনে হয় না। তাই আওয়ামী লীগের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। পরপর তিনবার ক্ষমতায় থাকার কারণে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। আওয়ামী লীগকে এর মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল সম্পর্কে বিশেষ করে জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণে গৃহীত কর্মসূচি দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে তুলে ধরা অপরিহার্য। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যতম কাণ্ডারি আওয়ামী লীগকে দলের তৃণমূলের কোন্দল ও বিরোধ মিটিয়ে স্থানীয় সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সমাজসেবা ও মানবসেবাধর্মী কাজে সবাইকে সম্পৃক্ত করা একান্ত দরকার। এতে স্থানীয়ভাবে উন্নয়ন কাজে গতি আসবে, কাজের মানও ভালো হবে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা ও সখ্য বাড়বে, বাড়বে দল ও সরকারের জনপ্রিয়তা। তবে হাইব্রিড বা নব্য আওয়ামী লীগারদের কারণে ত্যাগী নেতারা অন্তরালে চলে গেছেন যা ভবিষ্যৎ ও দলের জন্য অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিতে পারে। এটা আওয়ামী লীগের মনে রাখতে হবে।
করোনা পরিস্থিতি যেভাবে প্রধানমন্ত্রী নিজে তদারকি এবং মোকাবিলা করছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এমপি-মন্ত্রীদের অনেকেই সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে তেমন একটা সম্পৃক্ততা তৈরি করতে পারছেন না। প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যদি নিজেদের না শুধরে দাপটে বেড়ান, আর দল পরিচালকরা মহানন্দে সুখনিদ্রা যান, তবে দুঃস্বপ্নের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। জনগণকে ভালোবাসতে হবে এবং জনগণকে সবকিছুতে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ দায়িত্ব দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদেরই নিতে হবে এবং মানুষের আস্থার জায়গাটিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। হাইব্রিড ও নব্য আওয়ামী লীগারদের দিয়ে কাজ হবে নাকি ত্যাগীদের দায়িত্ব দিতে হবে- এই কথাগুলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যত দ্রুত বুঝতে পারবেন, ততই দেশের জন্য মঙ্গল, এদেশের মানুষেরও মঙ্গল হবে।
[email protected]

আরও পড়ুন

×