ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে সাম্প্রদায়িকতার পেরেক
গৌতম রায়
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২০ | ২১:০৮
একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ধ্বংস করে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, সেই জমিটি অন্য একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট করে সেই জমির ওপর সরকারি বদান্যতায় 'রামমন্দির'-এর ভিত্তি স্থাপন করায় আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে ভারতকে একটি অসহিষুষ্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে দিল। ভারতের সংবিধানে '১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে চুক্তি হয়, সেই চুক্তিতে ভারতের সংখ্যালঘুদের আর্থ-সামাজিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রবহমান সংস্কৃতির নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী ভারতের সংবিধানে সংখ্যালঘুদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করা হয়েছিল। সেই সংবিধানের নামে শপথ নেওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ভাবনা থেকে রামমন্দিরের ভিতপূজা করেন, তখন এটা নিশ্চিত করেই বলতে হয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের সশস্ত্র এবং অহিংস- এই দুটি ধারা থেকে যে সম্প্রীতি, সহিষুষ্ণতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ভারত অর্জন করেছিল, যে অর্জন গোটা উপমহাদেশকেই প্রভাবিত করেছে, সেই অর্জনকে আজ ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হলো। ধর্মনিরপেক্ষ একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী অন্য ধর্মের মসজিদ ধ্বংসের মতো অপরাধের কোনো প্রতিবিধান করলেন না। সেই মসজিদটিকে স্থানান্তরিত করার কোর্টের রায়কে মান্যতা দিয়ে গোটা বিশ্বের কাছে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার ধর্মীয় পক্ষপাতিত্বকে কার্যত স্বীকৃতি দিলেন। আর মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর মন্দিরের শিলান্যাস নিজের হাতে করে আপামর ভারতবাসীকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে একটি সংহারক ভূমিকায় উপস্থাপন করলেন।
বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে, সেই জমি গ্রাস করার তাগিদে ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে যে আন্দোলনের নামে অরাজকতা চলেছে, সেটির মূল পরিচালক হচ্ছে আরএসএস এবং বিভিন্ন পর্যায়ের তাদের রাজনৈতিক দলগুলো। সেই লক্ষ্য পূরণে ভারতের অ-বাম রাজনৈতিক দলগুলো যে যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিল, তা ওই ভিতপূজাকে কেন্দ্র করে রাজীব গান্ধীকন্যা প্রিয়াঙ্কার টুইট এবং কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষনেতা কমলনাথের বক্তব্য থেকেই পরিস্কার হয়েছে। কংগ্রেস এখন বাবরি মসজিদের অবস্থানকালে পবিত্র মসজিদের ভেতরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তথাকথিত রামমন্দিরের ভিতপূজা করেছিলেন বলে প্রকাশ্যে দাবি করছে। ওই দাবি থেকে একটি কথা দিনের আলোর মতো পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে- ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটি রক্ষা করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, কংগ্রেসের পিভি নরসিংহ রাও আদৌ আন্তরিক ছিলেন না। ১৯৯২ সালে উত্তর প্রদেশে বিজেপি নেতা কল্যাণ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার ছিল। কল্যাণ সিং ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মসজিদ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, সেখানে 'ভজনপুজোন' হবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, তিনি নাকি কল্যাণ সিং সুপ্রিম কোর্টে যে হলফনামা দিয়েছিলেন, তাতে বিশ্বাস করেছিলেন।
নরসিংহ রাওয়ের সেদিনের বিবৃতি আর আজকের ভিত পূজাকে কেন্দ্র করে মোদি নন, রাজীব গান্ধী প্রথম ভিত পূজক- কংগ্রেসের এই প্রকাশ্য অভিমতের পর এই প্রত্যয়ই স্পষ্ট হচ্ছে যে, বাবরি মসজিদ ভাঙার বিষয়টি ঘিরে সবকিছু জেনে-বুঝেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও ইচ্ছাকৃতভাবে চুপ করে ছিলেন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। 'র'-এর পক্ষ থেকে মসজিদ ভাঙার জন্য গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি কী ধরনের ষড়যন্ত্র করছে, তা কি কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হয়নি? অযোধ্যার জমায়েত যে নিরীহ জমায়েত হচ্ছে নয়, এ সম্পর্কে কি উত্তর প্রদেশের তৎকালীন রাজ্যপাল (এই পদটি সাংবিধানিক পদ হলেও সব সময়ই এই পদে কেন্দ্রে যে দলের সরকার থাকে, তাদের আস্থাভাজন ব্যক্তিকেই নিয়োগ করা হয়। উত্তর প্রদেশের তৎকালীন রাজ্যপালও ছিলেন কংগ্রেসের আস্থাভাজন) কি কোনো রিপোর্ট পাঠাননি কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে? র-এর রিপোর্ট বা রাজ্যপালের রিপোর্ট- এর সবই কি গোপন করা হয়েছিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে?
ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত, তার পূর্বসূরি বালাসাহেব দেওরসকে উদ্ধৃত করে গত ত্রিশ বছর ধরে মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর তথাকথিত মন্দির তৈরিতে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের নিয়োজিত থাকার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এটা খুব দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হয় যে, ভারতের অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলো আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রকে ঘিরে আদৌ সামাজিক এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রশ্নে বিশেষ যত্নবান থাকেনি। বামপন্থিরা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে বা পরে এমনকি অটলবিহারি বাজপেয়ির শাসনকালে সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে যতখানি আন্তরিক এবং কর্মোদ্যম ছিল, সেই ভূমিকায় ততটা প্রত্যক্ষভাবে তাদের আমরা পরবর্তী সময়ে পাই না। এর পাশাপাশি বলতেই হয়, সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইটা কেবল রাজনৈতিক লড়াইতেই সীমাবদ্ধ নয়; একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন ব্যতীত সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করা যায় না। সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলায় বামপন্থিরা রাজনৈতিক আন্দোলনকে যতখানি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তার অর্ধেক গুরুত্বও তারা সামাজিকভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করার প্রশ্নে দেননি।
ভিতপূজাকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বক্তৃতায় ব্রিটিশ বশ্যতার সঙ্গে নাম না করে মুসলমান বশ্যতার যে উদাহরণ টানলেন, একটা সভ্য জগতের ভাষা তা হতে পারে না। মোদি তার বক্তৃতায় যেভাবে পাটনা শরিফ থেকে আজমির শরিফ পর্যন্ত রামের নাম প্রতিধ্বনিত হওয়ার কথা বললেন প্রকাশ্যে, তাকে সর্বতোভাবে ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে একটি ভয়ংকর হুমকিসূচক ইঙ্গিত বলেই ধরতে হয়।
ভারতীয় ইতিহাসবিদ
- বিষয় :
- ভারত