ট্যানারি শিল্পে শৃঙ্খলা আনতেই হবে
আহসান এইচ মনসুর
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০
ট্যানারি শিল্পে শৃঙ্খলা আনতে হলে প্রথমেই বিসিক থেকে এ শিল্পকে পৃথক করতে হবে। সাভারে ট্যানারি শিল্পের পরিবেশগত ত্রুটি দূরীকরণ ও উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে অভিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। ব্যক্তি উদ্যোগে চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চামড়া সংগ্রহ করা গেলে চামড়ার মান নষ্ট হবে না। এর পাশাপাশি এ খাতে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভালো মানের উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। ট্যানারি শিল্পে গার্মেন্ট সেক্টরের মালিকদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। গার্মেন্টের সঙ্গে ট্যানারির অনেক মিল রয়েছে। গার্মেন্ট মালিকরা পণ্যের গুণগত মান, ব্যবসা, বাজার ও রপ্তানি সম্বন্ধে ভালো বোঝেন
বাংলাদেশে গরু-ছাগলের উৎপাদন বেশ ভালো হয় এবং এখানকার চামড়ার মানও ভালো। সাম্প্রতিককালে গরু-ছাগলের উৎপাদন আরও বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশ চামড়া শিল্পের বৃহৎ সম্ভাবনার দেশ এটা বলাই যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা এ শিল্পকে ঠিকমতো গুছিয়ে নিতে পারছি না। শৃঙ্খলার অভাবে বছর বছর এ খাতে অনেক লোকসান হচ্ছে। নূ্যনতম মূল্য না পেয়ে মানুষ মাটি চাপা কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে নষ্ট করছে মূল্যবান চামড়া।
আমাদের দেশে চামড়া সংগ্রহের কাজ ব্যক্তি পর্যায় থেকে হয়ে আসছে। আমরা এখনও কেন্দ্রীয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে পারছি না। উন্নত দেশে নির্ধারিত স্থানে পশু জবাইয়ের পর পেশাদার লোকদের মাধ্যমে চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে গ্রাম কিংবা শহরে পশু জবাইয়ের পর যার-তার মাধ্যমে কোনো রকমে চামড়া সংগ্রহ করা হয়। ফলে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। পেশাদার লোকদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা গেলে চামড়ার মান ভালো থাকত এবং রপ্তানির পরিসরও বাড়ত। এতে ট্যানারি শিল্পে বিরাজমান সংকটেরও অবসান ঘটত। ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর হয়েছে ঠিকই; কিন্তু চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে কোনো উন্নতি আসেনি। এমনকি পরিবেশগত সমস্যাগুলোও সমাধান করা হয়নি স্থানান্তরের পরে।
ট্যানারি শিল্পকে বিসিকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। বিসিক ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবস্থাপনার জন্য উপযুক্ত। রপ্তানিযোগ্য পণ্য ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য যে ধরনের ব্যবস্থাপনা দরকার হয় এবং যে ধরনের গাইডলাইন মানতে হয়, সে সম্বন্ধে বিসিক জানেও না, বোঝেও না, জানতে চায়ও না। চামড়ার মতো বড় ও সম্ভাবনাময় শিল্পে তাদের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। ট্যানারি শিল্পকে শুরু থেকেই কোনো ইকোনমিক জোন বা ইপিজেডের অধীনে দেওয়া উচিত ছিল। তারা এ কাজটা ভালোভাবে করতে পারত। এখন মানসম্মতভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ না হওয়ায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এর ফলে আমাদের দেশের চামড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকাসহ উন্নত কোনো দেশে রপ্তানি হয় না। আমরা রপ্তানি করি চীন ও ভারতে। ফলে তারাও সুযোগ পেয়ে বসে। কারণ, আমাদের দেশ সার্টিফায়েড চামড়া রপ্তানিকারক দেশ নয়। আমাদের প্রত্যাশা ছিল ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরের পর চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং চামড়ার গুণগত মান বাড়বে। এমনটা হলে আমাদের জন্য ইউরোপ ও আমেরিকায় চামড়া রপ্তানি সহজ হতো আর চামড়ার মূল্যও বহুগুণ বেশি পাওয়া যেত।
আমাদের দেশের চামড়ার মান বিভিন্ন স্তরে নষ্ট হচ্ছে। পশু জবাই বা কোরবানির পর চামড়া সঠিক প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করা হয় না। চামড়া সংগ্রহের পর লবণের ব্যবহার ঠিকমতো হয় না। অনেকে জানেনই না, কীভাবে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে হয়। এরপর কয়েক হাত ঘুরে চামড়াগুলো আসে সাভারে। সেখানে যে প্রক্রিয়ায় চামড়াগুলো প্রসেসিং করা হয় তাও আন্তর্জাতিক মানের নয়। এতে আমাদের দেশের চামড়া উন্নত মানের চামড়া বলে স্বীকৃতি পাচ্ছে না। ফলে এই চামড়া দিয়ে যদি দেশে আন্তর্জাতিক মানের পণ্যও তৈরি করা হয়, চামড়ার মানের কারণে সেটি রপ্তানি হবে না।
এ ছাড়া প্রতিবছর সিন্ডিকেট করে চামড়া কেনা হয়। এ বছর সরকার ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কাঁচা চামড়ার দাম কমিয়েছে। কিন্তু ট্যানারি ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখেনি। তাদের অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে অনেক চামড়া অবিক্রীত থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। এই অবস্থার জন্য ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী অব্যবস্থাপনাও। গত দুই-তিন বছর ধরে এ ধরনের সংকট চলে আসছে এবং তা ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে। কাঁচা চামড়া রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন। কারণ তাদের কাছে ছাড়া অন্য কোথাও চামড়া বিক্রি করার সুযোগ নেই। চামড়া কেনাবেচার ক্ষেত্রে দুটি পক্ষ খুবই দুর্বল। যারা দুই-একটি চামড়ার মালিক তারা দাম যা-ই হোক চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তারা সিন্ডিকেট নির্ধারিত মূল্যের বাইরে চামড়া কিনতে পারেন না। 
দেশের ট্যানারি ব্যবসায়ীরা এ শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে ধ্বংস করে চলেছেন। চামড়া শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সনাতনী ব্যবসায়ীদেরও ব্যবসায়িক কোনো লক্ষ্য নেই বলেই মনে হয়। তাদের একটিই লক্ষ্য- ঠকবাজি করে নিজেদের পুঁজি সঞ্চয় করা। তারা চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেন; কিন্তু সেই ঋণ আর পরিশোধ করেন না। প্রতিবছর কাঁচা চামড়া সংগ্রহে ঋণ দেওয়া হয়, কিন্তু ঋণের অর্থ ফেরত আসে না। তাদের এমন আচরণে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মোটকথা ট্যানারি শিল্পে কোনো শৃঙ্খলা নেই। ব্যবসায়ীরা তাদের বাণিজ্যে কোনো নীতির তোয়াক্কা করেন না। তারা একদিকে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করে না, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও চামড়ার উপযুক্ত মূল্য দেন না। এই ধরনের ব্যবসায়ী দিয়ে ট্যানারি শিল্প চলবে না। গত ৩০-৪০ বছর ধরে একই ধরনের ব্যবসা তারা করছেন, কিন্তু তাদের নিজেদের ব্যবসা ও এই শিল্পের কোনো উন্নতি দেখছি না। সরকারকে বড় বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে বসে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। ক্ষুদ্র ট্যানারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে লাভ নেই। যারা এই শিল্পে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন বা করেছেন, তাদের সঙ্গে বসতে হবে। রপ্তানির পরিকল্পনা সামনে রেখে পুরো ট্যানারি শিল্পের যথাযথ উন্নতির দিকে নজর দিতে হবে।
ট্যানারি শিল্পে শৃঙ্খলা আনতে হলে প্রথমেই বিসিক থেকে এ শিল্পকে পৃথক করতে হবে। সাভারে ট্যানারি শিল্পের পরিবেশগত ত্রুটি দূরীকরণ ও উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে অভিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। ব্যক্তি উদ্যোগে চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চামড়া সংগ্রহ করা গেলে চামড়ার মান নষ্ট হবে না। এর পাশাপাশি এ খাতে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভালো মানের উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। ট্যানারি শিল্পে গার্মেন্ট সেক্টরের মালিকদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। গার্মেন্টের সঙ্গে ট্যানারির অনেক মিল রয়েছে। দুটিই সেলাইজাত শিল্প। আবার যারা গার্মেন্ট পণ্য কেনেন তারা চামড়াজাত পণ্যও কেনেন। গার্মেন্ট মালিকরা পণ্যের গুণগত মান, ব্যবসা, বাজার ও রপ্তানি সম্বন্ধে ভালো বোঝেন। এগুলো প্রাইভেট সেক্টরই করতে পারবে। তবে পলিসি ও গাইডলাইন সরকারকেই দিতে হবে। মনে রাখতে হবে ট্যানারি শিল্পে শৃঙ্খলা এলে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে। সংকট দূর করে এ শিল্পকে গার্মেন্টের মতো লাভজনক এবং বিশাল পরিসরে রপ্তানিমুখী করা সম্ভব। বর্তমানে যেভাবে চলছে এভাবে চলতে থাকলে দেশের সম্পদ নষ্ট হবে, কর্মসৃষ্টি ব্যাহত হবে, রপ্তানি কমে যাবে- যা একেবারেই অর্থহীন।
নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ