বৈরুত বিস্ফোরণে বাংলাদেশের করণীয়
×
তারিক আহসান- সংগৃহীত ছবি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২০ | ২১:৫৯
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে, তার প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে অস্পষ্টতার অবকাশ নেই যে, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর জন্য একটি কড়া সতর্কবার্তা ঘোষিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত যদিও বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে বৈরুত বন্দর এলাকায় কয়েক বছর ধরে মজুদ রাসায়নিক দ্রব্য অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের একটি গুদামকে নির্দেশ করা হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাবে। আমরা জানি, মধ্যপ্রাচ্যে লেবাননের ভৌগোলিক অবস্থান ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন রয়েছে যুদ্ধাবস্থায় পতিত সিরিয়া, অন্যদিকে বিবিধ অশান্তি ও অবিশ্বাসের উৎস ইসরায়েল। লেবাননে তৎপর চরমপন্থি কিছু দলের অবস্থানও ভুলে যাওয়া চলবে না। এর পাশাপাশি দেশটির জনমিতিক পরিস্থিতিও বিবেচ্য। আমরা মনে করি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্বশান্তির স্বার্থেই বিস্ফোরণটিকে নিছক 'দুর্ঘটনা' আখ্যা দিয়ে আশ্বস্ত থাকার সুযোগ নেই। বস্তুত প্রায় পারমাণবিক বোমার শক্তিসম্পন্ন এই বিস্ফোরণের ফলে এরই মধ্যে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা লেবাননে যে মানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তাতে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতেই হবে। তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা ছাড়াও অবকাঠামোগত পুনর্গঠনেও প্রয়োজন হবে ব্যাপক অর্থনৈতিক সহায়তা। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে যে রাজনৈতিক মেঘ বিস্ফোরণের আগেই ঘনীভূত হয়েছিল, তা যেন আরও গাঢ় না হয়, সে জন্য সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ওই হত্যাকাণ্ডের বিচারে জাতিসংঘ গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে প্রস্তুত রায় ঘোষণা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত সেদিক থেকে সংগত। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি সমন্বিত ও সময়োচিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমরা চাই, বাংলাদেশও সেই উদ্যোগে সক্রিয় অংশ নেবে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার লেবাননি প্রতিপক্ষকে যে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন, তাতে গোটা জাতির সমবেদনা প্রকাশিত হয়েছে। খাদ্যসামগ্রী, প্রাথমিক চিকিৎসা উপকরণ এবং চিকিৎসক দল পাঠানোর ঘোষণাকেও আমরা স্বাগত জানাই। মনে রাখতে হবে, বৈরুত বিস্ফোরণে বাংলাদেশেরও করণীয় কেবল সহমর্মী দেশ হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে না। ওই বিস্ফোরণে আমাদের অন্তত চারজন নাগরিক নিহত এবং কমবেশি একশ' নাগরিক আহত হয়েছেন। বৈরুত বন্দরে নোঙর করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসায় যাতে কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেকের প্রয়োজন হবে পুনর্বাসন। নিহতদের পরিবারের পাশেও দাঁড়াতে হবে। তারা যাতে ক্ষতিপূরণ পায়, সেই প্রচেষ্টা চালাতে হবে সরকারিভাবেই। এ ছাড়া দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি জনশক্তির নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। কেবল বিস্ফোরণ-পরবর্তী স্বল্প মেয়াদে নয়, এ পরিস্থিতি যাতে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশি জনশক্তির দীর্ঘ মেয়াদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে এখন থেকেই সজাগ ও সক্রিয় হতে হবে। এ পরিস্থিতি থেকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও শিক্ষা নেওয়ার রয়েছে। সমুদ্র বা নৌবন্দর এলাকা ছাড়াও এভাবে রাসায়নিক দ্রব্য দীর্ঘদিন মজুদ রাখার প্রবণতা বাংলাদেশেও রয়েছে। খোদ রাজধানীতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম ও কারখানা কম নেই। সেখানে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে বিপুল প্রাণহানির নজিরও রয়েছে। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে একাধিকবার কারখানা ও গুদামগুলো সুরক্ষিত এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছি। বৈরুতের বিস্ফোরণের পর বহুল প্রতিশ্রুত এই উদ্যোগে গতি আসবে- আশা করা যায়। এ ধরনের রাসায়নিক বিস্ফোরক তৈরি বা নাশকতায় যে ব্যবহূত হতে পারে, বৈরুতের অঘটনের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সে ব্যাপারে আলোচনা চলছে। আমাদেরও সতর্ক হওয়ার সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
- বিষয় :
- বৈরুত বিস্ম্ফোরণ