ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

প্রবাসী আয় ধরে রাখার কর্মপরিকল্পনা এখনই

প্রবাসী আয় ধরে রাখার কর্মপরিকল্পনা এখনই
×

হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০

করোনা শুরু হওয়ার পর পুরো পৃথিবীর চিত্র পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে বাংলাদেশের চিত্রও। জনবহুল ঢাকা নগরী ছেড়ে অনেক মানুষ এখন গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। কর্ম ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে থাকা শহরের বাসাবাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিচ্ছেন। সন্তানদের লেখাপড়া ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন পুরো বিশ্বের সার্বিক অবস্থার উন্নতি না হলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই ধরন আরও বৃদ্ধি পাবে। শহর ছেড়ে আরও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হবেন।
এ রকম পরিস্থিতিতেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রবাসী আয়। করোনাকালেও দেশে এসেছে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত জুনে রেমিট্যান্স এসেছে ১৮৩ কোটি ডলার, যা এ পর্যন্ত মাসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি। এদিকে ৩০ জুন শেষ হওয়া অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ বা ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। যা গত অর্থবছরের চেয়ে ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। দেশে যখন অর্থনৈতিক মন্দা আসন্ন, তখন সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রাপ্তি আশার আলো দেখায় বৈকি! পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ প্রবাসী আয়ের ওপর সরকার ঘোষিত ২ শতাংশ প্রণোদনা।
আমি মনে করি, আরও কয়েকটি বিশেষ কারণে গত জুনে রেমিট্যান্স সবচেয়ে বেশি এসেছে। প্রথমত, করোনায় চাকরি হারানোর কারণে অনেক কর্মী দেশে ফিরে আসায় তারা তাদের সঞ্চিত অর্থের পুরোটাই নিয়ে এসেছেন। দ্বিতীয়ত, করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেকেই চাকরি হারানোর ভয়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে তাদের কাছে যতটুকু সঞ্চয় ছিল এবং প্রাপ্ত অর্থের সবটুকুই তারা দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তৃতীয়ত, লকডাউনের কারণে গত কয়েক মাসে অনেকেই দেশে কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। জুন মাসে দেশে পাঠিয়েছেন। চতুর্থত, লকডাউন আরও দীর্ঘ হতে পারে- এ রকম অনুমান থেকে অনেক কোম্পানিই শ্রমিক ছাঁটাই করে ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকাপয়সা দিয়েছে। সেই টাকাও দেশে এসেছে। পঞ্চমত, অনেকেই হয়তো ভাবছেন বিদেশে থেকে আর লাভ নেই। এই উপলব্ধি থেকে নিজের কাছে যা ছিল তার পুরোটাই পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আসলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে তা আরও দুই-তিন মাস পর বোঝা যাবে। স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, করোনা শুরু হওয়ার পরপরই আমাদের জনশক্তির বাজারে এক বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রথমত, সব ধরনের জনশক্তি পাঠানো বন্ধ রয়েছে। যেহেতু কোনো দেশই এখন শ্রমিক নিচ্ছে না, সেহেতু যেসব শ্রমিক ভিসা পাওয়ার পর বিদেশ যাওয়ার জন্য পাইপলাইনে ছিলেন, তারাও আর যেতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, করোনা শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক হাজার শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অনেক শ্রমিক এখন চাকরিচ্যুত, তারা নতুন চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। তারাও দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রবাসী আয় ধরে রাখতে হলে জনশক্তি খাতের এ রকম পরিস্থিতিতে আমাদের করোনা-পরবর্তী কৌশল বা লক্ষ্য কী তা নির্ধারণ করতে হবে।
স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদেরও একটি বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। আমি মনে করি সেই প্রতিযোগিতার জায়গাটা হলো অতি দক্ষ কর্মী ও প্রফেশনালস তৈরি। আগে থেকেই খুবই গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে দক্ষ শ্রমিক তৈরির বিষয়টি। এখন আমাদের কাছে বিকল্প আর কোনো পথ নেই। এ কথা সত্য- একসময় কিছু কথিত জনশক্তি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান যেনতেনভাবে অদক্ষ শ্রমিক পাঠাতে উৎসাহ বোধ করত। অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর কারণে জনশক্তি খাতে আমাদের অনেক ধরনের খেসারতও দিতে হয়েছে। প্রাথমিক ভাষাজ্ঞান না থাকা, কাজ না জানা- এসব কারণে অনেক শ্রমিককেই পথে বসতে হয়েছে, তাদের স্বপ্ন চুরমার হয়েছে। এমনকি এসব কারণে যারা সরকারের বেঁধে দেওয়া অভিবাসন খরচসহ অন্যসব শর্ত সঠিকভাবে মেনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাঠিয়ে থাকে, তাদেরও অনেক ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়েছে।
দক্ষ শ্রমিক তৈরির পূর্বশর্ত হলো- দেশে বেশি করে অভিবাসী ইচ্ছুক শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের আধুনিক সুযোগ সংবলিত উচ্চমানের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা। যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শ্রমিক নিতে ইচ্ছুক সেসব দেশের শ্রমিক নিয়োগের চাহিদা বা শর্তাবলি মেটাতে সক্ষম হবে। এখনই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বায়রা এ ব্যাপারে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করুক। এ জন্য সরকারকে বৈধ জনশক্তি রপ্তানিকারদের জন্য বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রদানের স্কিম হাতে নিতে হবে। যেমন সহজ শর্তে জমি প্রদান, ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ যন্ত্রপাতি আমদানিতে ট্যাক্স-শুল্ক্ক সহনীয় মাত্রায় রাখা, ঋণ প্রণোদনা- এসব সুবিধার কথা ভাবা যেতে পারে। এটি করা না গেলে আমরা আরও বেশি দক্ষ জনশক্তি ও প্রফেশনাল প্রেরণ করতে পারব না।
মনে রাখতে হবে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন এখন আমাদের বড় প্রতিযোগী। জনশক্তির বাজারে জায়গা করে নিতে তারাও সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। করোনা প্রতিরোধে ভালো ও কৌশলী ভূমিকা রাখায় বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও নেপাল। ফলে সবকিছু স্বাভাবিক হলে এই দেশগুলো থেকে কর্মী নিতে জনশক্তি গ্রহণকারী দেশগুলো স্বভাবতই বেশি আগ্রহ দেখাবে। সামনে জনশক্তি বাজারে গণহারে নির্মাণ শ্রমিকের চাহিদাও কমে আসবে। সেক্ষেত্রে বেশি চাহিদা তৈরি হবে অতি দক্ষ প্রফেশনালদের।
অনেকেই বলছেন, শ্রমবাজারে কেয়ারগিভার, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মীর চাহিদা সামনে বাড়তে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট দিয়ে কাজ হবে না। এদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় এনে জনশক্তি গ্রহণকারী দেশগুলোর চাহিদা মোতাবেক দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এসব পরিকল্পনা এখনই ঠিক করা খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম খুঁটি হিসেবে বিবেচিত প্রবাসী আয়। এ খাত থেকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি প্রাপ্তি সবচেয়ে কম বিনিয়োগে। এই খাতের প্রতি আরও গভীর নজর দেওয়া প্রয়োজন। জনশক্তি খাতে অন্তত তিন-চার বছরের লক্ষ্য সামনে রেখে একটি 'মাইগ্রেশন প্ল্যান' তৈরি করা ও বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ গুরুত্ব দিয়ে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে।
[email protected]
শ্রম অভিবাসন বিশ্নেষক; চেয়ারম্যান
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

আরও পড়ুন

×