করোনারোধে আশার আলো
ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০
বিশ্বব্যাপী মরণঘাতী করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা থেমে নেই। মৃত্যুর এই মিছিল কবে থামবে তা এখনও আমাদের অজানা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাসের ক্রমাগত রূপ পরিবর্তন। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এনসিবিআই ডাটা ব্যাংকে এই নতুন সার্স কভ-২ ভাইরাসের ১৩৪১১টি জিন সিকোয়েন্স ও বাংলাদেশি গবেষকরা ১৭২টি জিন সিকোয়েন্স আপলোড করেছেন। যার অনেক ক্ষেত্রেই মিউটেশন দেখা যাচ্ছে। আসলে এই জিনগত পরিবর্তন ভাইরাসের বৈশিষ্ট্যে কী পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, সেটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিকোয়েন্সকৃত করোনার জিনোমেও স্পাইক প্রোটিনে মিউটেশন লক্ষণীয়। যে কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। স্পাইক প্রোটিনের এই পরিবর্তন দেশে বিদ্যমান করোনাভাইরাসকে হয়তো আরও বেশি সংক্রমণশীল করতে পারে, যা উদ্বেগের বিষয়। ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স ব্যবহার করে খতিয়ে দেখতে হবে কীভাবে জনগোষ্ঠীর শরীর ও আবহাওয়ার সঙ্গে ভাইরাসটি পরিবর্তিত হচ্ছে। এই কাজ সম্পন্ন করতে আমাদের বাংলাদেশে এলাকাভিত্তিক, বয়সভিত্তিক, মৃদু বা উপসর্গহীন এবং উপসর্গসহ ব্যক্তির নমুনা থেকে আরও অধিক সংখ্যক জিনোম সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন। ব্যাপক ভিত্তিতে জিনোম সিকোয়েন্সিং এই দেশে করোনার গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবনেও এর আবশ্যকতা রয়েছে।
ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি, করোনা রোগটি বেশিরভাগই মৃদু বা উপসর্গহীন। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে রোগটি শুধু ফুসফুসের নয়; রক্ত জমাট বাঁধাসহ মাল্টি অর্গানের অসুখে পরিণত হয়েছে। আক্রান্তদের সুস্থ হতে এখন সময়ও বেশি লাগছে। দেশভেদে বিভিন্ন আক্রান্ত মানুষের মধ্যে এ রোগের লক্ষণ ও মাত্রায় ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। এ জন্য গবেষকরা ব্যক্তি জিনের সংবেদনশীলতাকে দায়ী করছেন। গত ২০ জুলাই প্রকাশিত বিবিসি ফিচারে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে টি-সেলের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এখন এই ভাইরাসের ইমিউনো প্যাথলজি নিয়ে গবেষণা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল থেকে ব্যক্তির প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কভিড-১৯ হোস্টের আরএনএ সিকোয়েন্স বিশ্নেষণ প্রয়োজন।
আশার কথা হলো, এই জিনগত বিশ্নেষণের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী চলছে ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিবডি থেরাপি গবেষণা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিনটি দ্বিতীয় পর্যায় পেরিয়ে তৃতীয় পর্যায়েও সফলতা অর্জন করেছে। সবাই আশাবাদ ব্যক্ত করছে, এই মাস থেকেই বাজারে আসবে ভ্যাকসিনটি। তবে সব মানুষের জন্য এ ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা সময়সাপেক্ষ। সুস্থ ও উপসর্গহীন ব্যক্তিদের শরীরে এর বিপরীতে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় কিনা এবং কতদিন স্থায়ী হয়, সেটি এখন বেশ আলোচ্য বিষয়। প্রশ্ন হলো- একবার ভ্যাকসিন নিলে তা আমাদের কতদিন রোগটি থেকে প্রতিরোধ দেবে। ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো প্রতি বছরই কি ভ্যাকসিন নিতে হবে? আমাদের মনে হয়, আমরা অন্তত দু'বছর প্রতিরোধ করতে পারব। যদিও এর সঠিক উত্তরের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তাই ভ্যাকসিনের কোনো বিকল্প নেই।
আরেকটি বিবেচনার বিষয় হলো, সুস্থ হওয়ার পরে কি পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে? উত্তর হলো- সম্ভবত না। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ রোগীদের মধ্যে সুস্থ হওয়ার সময় তাদের ফুসফুসে ভাইরাসের কিছু অবশেষ থাকে, যা পুনরায় টেস্টে পজিটিভ দেখাতে পারে; তবে এটা নতুন করে সংক্রমণকে ইঙ্গিত করে না। আবার, ভুল স্যাম্পলিংয়ের কারণে ভুল রেজাল্ট আসতে পারে। চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনির্দিষ্টভাবে না বলা গেলেও নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম অথবা অল্প কিছু মানুষ আবারও আক্রান্ত হতে পারে।
নতুন এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন পাওয়ার ব্যাপারে সবাই আশাবাদী; বাংলাদেশও আশাবাদী। তবে, আমাদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের মতো আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালগুলো বাংলাদেশে ভ্যাকসিন তৈরির ব্যাপারে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকার এফডিএ কর্তৃক পুরোপুরি অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে যেন উৎপাদনে যেতে পারে। দরকার হলে তাদের সঙ্গে মিলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেতে পারে। এর ফাঁকে আমরা দেশে জিনোম সিকোয়েন্স সংখ্যা বাড়ানো এবং তাদের বিশ্নেষণ করে দেশে বিদ্যমান ভাইরাসের ক্রমাগত রূপ পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারি। যদি সম্ভব হয়, আক্রান্ত ব্যক্তিদের জিন সংবেদনশীলতা দেখতে পারি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রিজেনারন ফার্মাসিউটিক্যাল এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ যৌথভাবে করোনাভাইরাস প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি থেরাপির তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং ব্রাজিল, মেক্সিকো, চিলি প্রভৃতি দেশে কয়েক হাজার রোগী এবং সুস্থ মানুষদের দেহে এই ট্রায়াল করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই অ্যান্টিবডি থেরাপি আগের ধাপগুলোতে আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। এই অ্যান্টিবডি থেরাপির উল্লেখযোগ্য উপকারিতা হচ্ছে, এটা দ্রুত ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ভূমিকা রাখবে এবং এটার প্রস্তুতিকাল ভ্যাকসিনের চেয়ে অনেক কম। এই ককটেলে আছে দুই ধরনের অ্যান্টিবডি; একটি ল্যাবরেটরিতে তৈরি, অন্যটি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের রক্ত থেকে পরিশোধিত। এই অ্যান্টিবডি ককটেল ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংক্রমণ নিবৃত্ত করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই অ্যান্টিবডি ককটেল আগে উল্লিখিত স্পাইক প্রোটিনের ডি থেকে জি মিউটেশনের ওপরেও কাজ করে।
পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে 'কভিড-১৯'। শুরু হয়েছে এক নতুন যুগ! আর তাই পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত করাসহ প্রাণ-প্রকৃতিকে ভালোবেসে আরও মানবিক ও মানবকল্যাণে গবেষণায় ব্রতী হবো। সবার আগে আমাদের বিজ্ঞান গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আমরা মনে করি, বিশ্বের অন্যান্য দেশের হাসপাতালের মতো ডাক্তারদের চিকিৎসা কাজে এবং অণুজীব বিজ্ঞানীদের রিসার্চ অফিসার হিসেবে হাসপাতালে নিয়োগ দিয়ে ল্যাব টেস্টিং, বায়োসেফটি, চিকিৎসা মডিউল ও গবেষণা কাজে লাগানো প্রয়োজন। আমরা যে ৮৩টি আরটি-পিসিআর ল্যাব করেছি, তা ভবিষ্যতে গবেষণাগারে রূপান্তর করা যেতে পারে। আমাদের দেশে যক্ষ্ণা নির্ণয় করার জন্য দুই শতাধিক জিন এক্সপার্ট মেশিন অব্যবহূত পড়ে আছে। বর্তমানে কভিভ-১৯ কার্টিজ নিয়ে এসে পয়েন্ট অব কেয়ারে অতি অল্প সময়ে সঠিকভাবে জিন এক্সপার্ট মেশিনে করোনা শনাক্ত করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে লেভেল ফোরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বলে গবেষকরা মনে করছেন। পবিত্র ঈদুল আজহার সময় আবার প্রচুর সংখ্যক মানুষ গ্রামের বাড়ি যেভাবে গেছেন, স্বাস্থ্যবিধি যেভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হয়েছে, তাতে বিশেষজ্ঞরা কোরবানির ঈদ-পরবর্তীকালে ও বন্যাজনিত কারণে কভিভ-১৯ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। আমরা মনে করি, সরকার কর্তৃক অনুমোদিত অ্যান্টিবডি কিট দিয়ে সেরো পজিটিভিটি, অ্যাপিডিমিওলজিক্যাল স্টাডি ও ভ্যাকসিন-পরবর্তী অ্যান্টিবডি টাইটার জানতে বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সেরোলজিক্যাল কিট কাজে লাগানো যেতে পারে।
অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডাক্তারদের মৃত্যু অনেক বেশি, যা চিন্তার কারণ। ইম্পেরিয়াল কলেজ অব লন্ডনের গবেষণামতে পিপিই বা মাস্কের মান ছাড়াও আরেকটি কারণ বায়োসেফটি সংক্রান্ত ট্রেনিং। হাসপাতালে আরটি-পিসিআর ল্যাব ও আইসিইউগুলোতে নেগেটিভ প্রেশার রুম ও সঠিকভাবে বায়ো-হ্যাজার্ড মেইনটেইন ও ডিসপোজাল না করা। একই সময়ে ৮৯ জন মাইক্রোবায়োলজিস্ট বিভিন্ন জায়গায় আরটি-পিসিআর ল্যাব সেটআপ, মান নিয়ন্ত্রণ ও ডাক্তারদের বায়োসেফটি ট্রেনিংয়ে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছে। আশার কথা, এদের একজনও আক্রান্ত হননি। এর কারণ মাইক্রোবায়োলজিস্টরা অণুজীবের জীবন এবং বংশবৃদ্ধিসহ প্রায়োগিক ধারণা রাখেন। অন্যদিকে ডাক্তাররা রোগটির চিকিৎসায় নিয়োজিত থাকেন।
সন্তোষজনক ব্যাপার হলো, যেখানে বিশ্বের সবাই হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে আমরা এখনও এটাকে কন্ট্রোলে রাখতে পেরেছি। বিশ্বে যেখানে মৃত্যুর হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, আমাদের সেখানে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। আমাদের সবাইকে কভিভ-১৯ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। আমেরিকার জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের গ্রাফ নিম্নমুখী। তবে, বিশ্বের অনেক জায়গায় ভাইরাসের দ্বিতীয় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সঠিক মাস্ক পরা ও সাবান দিয়ে হাত ধোয়া একটি কার্যকর পদ্ধতি। এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের কোনো ওষুধ নেই। তাই কার্যকর ভ্যাকসিন বা অন্যান্য থেরাপি না আসা পর্যন্ত আমাদের একে প্রতিরোধ করতে হবে। আপনার সুরক্ষিত হাতেই সুরক্ষিত দেশ।
অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রেষণে কোষাধ্যক্ষ, পাবনা বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ