এবারের শ্রাবণ মাসের বৈশিষ্ট্য
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০
এ বছরের শ্রাবণ মাসটা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে করোনা, প্লাবন, নদীভাঙন, দুর্নীতির উত্থান ইত্যাদির জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দুর্দৈব কাটিয়ে উঠতে পারে, তাহলে মুজিববর্ষের এই মাসটি ইতিহাসে চিহ্নিত হবে বাঙালি জাতির নতুন জীবন লাভের মাস হিসেবে
ইচ্ছে ছিল আজ শ্রাবণ মাসের বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিছু লিখব। ২২শে শ্রাবণ মারা গেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। তারপর এই শ্রাবণ মাসেই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ। কিন্তু এখন চারপাশে যা ঘটছে তাতে এই দুই মহামানবের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অতীতের শ্রাবণ মাসের কথা আপাতত মুলতবি রেখে বর্তমান শ্রাবণ মাসের বহমান ঘটনাবলি সম্পর্কে লিখতে হচ্ছে। এজন্য পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই।
এবারের শ্রাবণ মাসের শুরু ভয়াবহ খবর নিয়ে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। ব্রিটেনসহ ইউরোপের বহু দেশে আবার লকডাউন আরোপের (অঞ্চল বিশেষে) কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। আগের লকডাউন সম্পর্কে ব্রিটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াডের চিফ কমান্ডার রিচার্ড স্মিথ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, লকডাউনের সুযোগ নিয়ে জিহাদিস্ট ও অন্য ধরনের সন্ত্রাসীরা সংগঠিত হয়েছে। তাদের হামলা প্রতিরোধের জন্য স্কোয়াড প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লকডাউনের সময় শুধু মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা নয়, চোর-ডাকাতসহ বিভিন্ন সমাজবিরোধী গোষ্ঠীও শক্তি সঞ্চয় করেছে। লকডাউন উঠে গেছে। তারা আবার পূর্ণশক্তিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নামবে। লন্ডনে নাইফ ক্রাইম আবার শুরু হয়েছে। যেসব বুড়োবুড়ি একা তাদের বাসা বা ফ্ল্যাটে থাকে, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। এক কথায়, করোনাভাইরাস এবং ক্রাইম একযোগে বিশ্বে হামলা চালাবে মনে হচ্ছে।
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বাংলাদেশে করোনার প্রকোপের সঙ্গে মহাপ্লাবন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে এতবার প্লাবন ঘটেছে, কিন্তু এমন মহাপ্লাবন আর কখনও আসেনি। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। টেলিভিশনের খবরে এই প্লাবনের ছবি দেখি আর ভাবি, প্রচণ্ড ঝড়ে উত্তাল এক মহাসমুদ্রের মধ্যে খড়কুটোর ওপর বাংলাদেশের মানুষ ভাসছে। জাতির এই মহাবিপদের দিনে বিএনপি নেত্রী উন্নত চিকিৎসা লাভের নামে বিলাতে যেতে চাইছেন। কাগজে এই খবর পাঠ করে আমাকে এক বন্ধু টেলিফোন করেছেন, বললেন, ভাই, আমাদের মহাসৌভাগ্য যে, এই ভয়াবহ বিপদের সময় আমরা শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছি। এই সময় আমি প্রধানমন্ত্রী হলেও হয় পাগল হয়ে যেতাম, নয় দেশ ছেড়ে চলে যেতাম। তা খালেদা জিয়া করতে চাচ্ছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার কী সাহস, কী ধৈর্য- করোনা, মহাপ্লাবন, নদীভাঙন সব সমস্যা ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে চলেছেন।
আমি তাকে বলেছি, আরেকটি সমস্যার কথা আপনি বলেননি, সেটি আরও ভয়ংকর। তা হচ্ছে, দুর্নীতি। মহাদুর্নীতি। যা ভয়ংকর রাক্ষসের মতো সারাদেশকে গ্রাস করেছে। শেখ হাসিনার বহু কষ্টার্জিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সব ফসল খেয়ে ফেলছে। শেখ হাসিনা এখন যে সংকটে পড়েছেন, এ রকম চতুর্মুখী সংকটে বঙ্গবন্ধুও কখনও পড়েননি। বন্ধু বললেন, আপনার কথা মেনে নিচ্ছি। একদিকে করোনা, আরেক দিকে বন্যা, আরেক দিকে নদীভাঙন এবং শেষদিকে দুর্নীতির দানব। চারদিকে এই চার মহাদানব। অসম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন শেখ হাসিনা। এর কোনো তুলনা ইতিহাসে নেই।
এই কথাটা এখন সবারই মুখে। যারা শেখ হাসিনার শুভানুধ্যায়ী এবং যারা তার সমালোচক সবারই মুখে। আমি নিজে শেখ হাসিনার শুভাকাঙ্ক্ষী বলে এই কথা লিখছি না, বাংলাদেশের একেবারে গ্রাম পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ কথা লিখছি। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় একটা ধস নেমেছে একথা সত্য। কিন্তু শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়নি এ কথা বলা চলে। আরও বলা চলে, তার ওপর দেশের মানুষের নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। দেশের মানুষের মধ্যে তার একটা মাতৃসুলভ অভিভাবিকার ইমেজ গড়ে উঠেছে। সমস্যা জর্জরিত মানুষও ভাবে- শেখ হাসিনা মাথার ওপরে আছেন। তিনি একটা ব্যবস্থা করবেনই। 
আমার এলাকা মেহেন্দীগঞ্জের এক গ্রামের ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ করছিলাম। এখন দূরালাপনী সত্যই দূরালাপনী হয়েছে। লন্ডনে বসে বাংলাদেশের সুদূর গ্রামাঞ্চলেও কথা বলা যায়। ব্যবসায়ী জানালেন, তিনি সর্বস্বান্ত হয়েছেন। মহাপ্লাবনের ঢেউ শুধু তার ঘরবাড়ি ডোবায়নি, তার খামারের চল্লিশ হাজার মুরগির মধ্যে মাত্র চার হাজার বেঁচেছে। বললাম, তাহলে আপনাদের কী হবে? তিনি বললেন, দেশের সব মানুষের যা হবে, আমারও তা হবে। তবে একটা ভরসা, শেখ হাসিনা সরকার চালাচ্ছেন। তিনি একটা ব্যবস্থা করবেনই। এই নির্ভরতার কথা অনেকের মুখেই শুনেছি। হাসিনা কতটা কী করতে পারবেন জানি না। কিন্তু মানুষের দুর্গতি যতই হোক, তাদের মনে হাসিনার নাম একটা সাহস এটা কম কথা নয়।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় চার্চিল নাৎসি হামলায় বিপর্যস্ত ব্রিটেনের জনগণের মধ্যে এই সাহস জাগাতে পেরেছিলেন বলেই তারা নাৎসি হামলা রুখতে পেরেছিলেন। জাতি তাকে সেভিয়ার অব দ্য নেশন বা জাতির ত্রাণকর্তা খেতাব দিয়েছিল। হাসিনার রাজনৈতিক জীবনেও এটা একটা চরম পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে তিনিও সেভিয়ার অব দ্য নেশন হবেন, তাতে আমার সন্দেহ নেই।
গ্রামাঞ্চলের অনেক সম্পন্ন মানুষের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে দেখেছি, আওয়ামী লীগের ওপর তাদের আস্থা কম। কিন্তু শেখ হাসিনার ওপর তাদের আস্থা ও নির্ভরতা অসীম। আমার গ্রামের বাজারের আরেক বৃদ্ধ ব্যবসায়ী বলেছেন, বাবা, তোমাকে কী বলব, এই মেয়েটা (হাসিনা) বহু কষ্ট করে আমাদের জন্য যা আনেন, তা তার দলের লোকেরা, আমলারা, বড় ব্যবসায়ীরা সব লুটপাট করে খেয়ে নেয়। একা মেয়ে মানুষ কত দিক সামলাবেন। তার পরই গলার স্বর খাটো করে বলেছেন, বাবা, শুনেছি, তুমি খবরের কাগজে লেখো। হাসিনা তোমার লেখা পড়েন। তুমি বাবা একটু জোর কলমে লেখো না, হাসিনা যেন তার চারপাশ থেকে চোর-বাটপার খেদায়। তুমি একটু লেখো না বাবা, শেখ হাসিনা তোমার কথা শুনবেন।
আমার ওপর তার বিশ্বাস ও আস্থা দেখে ব্যথিত হয়েছি। কারণ, জানি তার আশা পূরণের ক্ষমতা আমার নেই। শেখ হাসিনার চারপাশে শুধু একদল দুর্নীতিবাজ নয়, তাদের যে সিন্ডিকেটগুলো শক্ত ব্যারিকেড গড়েছে, সেই ব্যারিকেড ভেঙে তার কাছে যাব এমন সাধ্য আমার নেই। শেখ হাসিনাও এ কথা জানেন। আমলাতন্ত্রের এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের যে দুর্নীতিবাজ অংশ তার চারপাশে জুটেছে তার বাঁধন ভাঙতে হলে দুর্বল ওয়েস্টমিনস্টার শাসন নয়, তার হাতে আরও ক্ষমতা দরকার। তিনি সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করলে সুশীল সমাজ হায় হায় করবে গণতন্ত্র গেল, গণতন্ত্র গেল। শেখ হাসিনা দেশের শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, পুরোনো আমলাতন্ত্রেরও অনেক উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। পুলিশ ব্যবস্থাকে উন্নত করেছেন। দেশে অসাধু ব্যবসায়ীদের অভ্যুত্থান রুখতে হলে তাকে আরও সময় দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু যে সময়টা পাননি, সে সময়টা তাকে দিতে হবে।
করোনাভাইরাস সারাবিশ্বেই এক ভয়ানক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটাবে। বাংলাদেশেও তা ঘটবে। শেখ হাসিনাও তা জানেন। এজন্য সেই বিপর্যয় রুখতে তিনি আগেভাগেই প্রস্তুত হচ্ছেন। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, দেশে যে অসাধু ব্যবসায়ীদের অভ্যুত্থান ঘটেছে, তাদের দুর্নীতির চক্র তা কতটা সফল হতে দেবে? দেশে এখন শুধু জলের প্লাবন ঘটেনি, দুর্নীতিরও প্লাবন ঘটেছে। একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শেষ না করে দুর্নীতিবাজরা লক্ষ লক্ষ টাকা আগেই তুলে নিয়েছে। এই করোনাভাইরাসের সময়েও এটা যারা করতে পারে তারা কি মানুষ? শেখ হাসিনা একা কত দিক সামলাবেন? তার দল, ছাত্রলীগ, যুবলীগ সুসংগঠিত হলেও একটা কথা ছিল। আমি প্রধানমন্ত্রীর অসহায়ত্বের কথা অনুভব করি আর প্রার্থনা করি, তিনি যাতে প্রায় আগত অর্থনৈতিক মন্দার রাক্ষসের কবল থেকে দেশকে বাঁচাতে পারেন।
এ বছরের শ্রাবণ মাসটা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে করোনা, প্লাবন, নদীভাঙন, দুর্নীতির উত্থান ইত্যাদির জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দুর্দৈব কাটিয়ে উঠতে পারে, তাহলে মুজিববর্ষের এই মাসটি ইতিহাসে চিহ্নিত হবে বাঙালি জাতির নতুন জীবন লাভের মাস হিসেবে।
[লন্ডন, ৭ আগস্ট, শুক্রবার, ২০২০]
- বিষয় :
- কালের আয়নায়