ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

সুশাসন

নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হতে চায় কিনা

নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হতে চায় কিনা
×

এম হাফিজউদ্দিন খান

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:৪৪

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক 'গুরুতর অসদাচরণ'-এর অভিযোগ এনে যে চিঠি দিয়েছেন তা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের তাগিদেই করেছেন। ওই চিঠিতে শুধু নির্বাচন কমিশনের অসদাচরণই নয়, একই সঙ্গে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগও করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের অনুরোধ করা হয়েছে রাষ্ট্রপতিকে। আরও উল্লেখ করা হয়েছে, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা দায়িত্ব পালনে যেন বিরত থাকেন। এই কাজটি দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা হঠাৎই করেননি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কাজের ক্ষেত্রে নানা রকম অসঙ্গতি-অনিয়ম নিয়ে ইতোপূর্বে নানা মহল থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। আমিও এ নিয়ে এই কলামেই লিখেছি। কিন্তু আমাদের কোনো কথাই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা আমলে নেননি। এই উপেক্ষা-অবজ্ঞাসূচক মনোভাব দেশ-জাতির জন্য কল্যাণকর নয়।

দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক রাষ্ট্রপতিকে যে চিঠি দিয়েছেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের ৪৮ (৫) অনুচ্ছেদের আলোকে রাষ্ট্রপতি পদক্ষেপ নিতে পারেন। সাংবিধানিক পদে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত যে কেউ করতে পারেন না। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের এই এখতিয়ার রয়েছে। রাষ্ট্রপতি এই নির্দেশ দিতে পারেন বলেই তার কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় উল্লেখ করে যে চিঠি রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়েছে, তাতে বর্তমান সংকট সম্পর্কে যেমন বলা হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাদের অনেক কর্মকাণ্ড বিতর্ক সৃষ্টি করে। কমিশনের ভেতরের কেউ কেউ এসব নিয়ে নানা সময়ে কথাও বলেছেন। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা-প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তো বটেই, এর পর আরও কিছু খারাপ নির্বাচন হয়েছে এবং এর দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো আর্থিক অনিয়ম। আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন কিংবা কোনো আর্থিক অনিয়ম রাষ্ট্রের যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তো বটেই, বিশেষ করে সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত কারও কাছেই একেবারে অনভিপ্রেত-অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা এক সংবাদ সম্মেলনে ৪২ নাগরিকের অভিযোগ 'ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণেদিত' বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনে আর্থিক ও নির্বাচনী অনিয়ম দুই-ই হয়েছে। 'বিশেষ বক্তা' হিসেবে বক্তৃতা দেওয়ার নামে ২ কোটি টাকার অনিয়মের পাশাপাশি কমিশনে কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ৪ কোটি ৮ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর। নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টিও বিস্ময়কর। রাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কোনোভাবেই সাধারণ কোনো বিষয় নয়। শুধু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলই নয়, আমরাও অনেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে যে মতামত দিয়েছিলাম, কমিশন সেসব কানেই তোলেনি। বিগত জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কমিশনের অতি উৎসাহ এবং এ জন্য অতিরিক্ত খরচের বিষয়েও আমরা সুস্পষ্টভাবে তখন অভিযোগ জানিয়েছিলাম। পরে নির্বাচন কমিশনও স্বীকার করে নিয়েছিল, ওই নির্বাচনে ব্যবহূত ইভিএমে ত্রুটি ছিল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় স্বচ্ছ নির্বাচন গণতন্ত্রের বিকাশে অন্যতম অনুষঙ্গ। অথচ ওই নির্বাচনের ফলাফলে অনেক ক্ষেত্রে যে অস্বাভাবিকতা ও অসঙ্গতি দেখা গেছে, তা গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার বিষয়টি কি কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য? অনেক আসনে বৈধ ভোট কমা কিংবা বাড়ার যে চিত্র দেখা গেছে, তাও প্রশ্নবিদ্ধ। আরও বিস্ময়ের বিষয় ছিল, কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ঘোষিত ফলাফলের গরমিল। নির্বাচন তো কোনো তামাশা কিংবা খেলার বিষয় নয়। নির্বাচন যদি তামাশা কিংবা খেলার বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এ দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই আছে।

যারা নির্বাচন কমিশনের অনিয়ম-দুর্নীতি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠির মাধ্যমে অভিযোগ জানিয়েছেন তা আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে- এটিই প্রত্যাশা। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের উল্লিখিত অনুচ্ছেদ অনুযায়ীই প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদে আলোচনার জন্য তা উপস্থাপন করতে পারেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের ব্যাপারেও তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এখন তিনি কী করবেন, তা দেখার বিষয়। বিশিষ্ট ৪২ নাগরিক সচেতন মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রের অভিভাবক রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন তাদের অধিকারবলেই। এই ৪২ নাগরিক তাদের জায়গা থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন যদি রাষ্ট্রপতি গুরুত্ব দেন তাহলে প্রতিকার নিশ্চিত হতে পারে। এত গুরুতর অভিযোগের ব্যাপারে কোনো মৌনতা কিংবা উপেক্ষা কাম্য নয়। শুধু যে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে, তা-ই নয়; স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনেও এমনটি হয়েছে। অভিযোগের পাল্লা ক্রমেই অনেক ভারি হয়েছে। যারা অভিযোগ করেছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে নানা বিষয় পর্যবেক্ষণ করেই বিবেকের তাড়নায় এ উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রক্তস্নাত এই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও কাঙ্ক্ষিত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে নানা সময়ে নানাভাবে অভিঘাত লেগেছে। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি নিয়ে বাহবা নেওয়া কিংবা আত্মতুষ্টিতে ভোগার প্রবণতাও নানাভাবে দৃশ্যমান। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে, আমাদের অর্জনের বিসর্জন কীভাবে ঘটেছে। দুর্নীতি নির্মূলে সরকারের অঙ্গীকার আমরা প্রায়শ শুনছি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাস্তবতা কী, তা আমরা অনেকেই যেমন জানি, তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও অজানা নয় নিশ্চয়। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। ঊর্ধ্বে নন জবাবদিহিরও। আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার- মতপ্রকাশ কিংবা মুক্তভাবে কথা বলার অধিকারের পথ যদি সংকুচিত করার মতো ক্ষেত্র তৈরি হতে থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের জন্য তা কোনোভাবেই মঙ্গল ডেকে আনবে না। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে আনেওনি। আমরা চাই, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। তাদের সৃষ্ট অনিয়-দুর্নীতির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে সংবিধান মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমরা অনেকেই সংবাদমাধ্যম, সেমিনার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের আস্থার সংকট কাটাতে অতীতে বহুবার পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কমিশন এসব আমলে নেয়নি।

অতীতেও বলেছি, যে কোনো নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুখ্য নিয়ামক শক্তি হলেন ভোটার। আর নির্বাচন কমিশন ও তাদের সহযোগীদের মুখ্য দায়দায়িত্ব হচ্ছে ভোটারের ভোটাধিকার সুরক্ষা করা। কিন্তু তা করতে দায়িত্বশীলরা অতীতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলেই আজ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে এত কথা উঠেছে। ভোটারের অধিকার প্রয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলাটা মোটেও স্বস্তির কোনো বিষয় নয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতে যেভাবে অনিয়ম হয়েছে, তাতে নির্বাচন কমিশন ও আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থা হ্রাস পেয়েছে এবং এ পরিস্থিতির সৃষ্টি একদিনে হয়নি। সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের নানা রকম ব্যর্থতা, স্ববিরোধিতা, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় কাজটি করতে না পারা, নিজেদের পক্ষপাতদোষে দুষ্ট হওয়ার মতো কাজ করার নানা রকম নজির রয়েছে। তারপরও প্রত্যাশা ছিল, তাদের দুর্নাম তারাই ঘোচাবে কথায় নয়, কাজের মধ্য দিয়ে; উপযুক্ততার প্রমাণ দিয়ে। তারা কি তা পেরেছে? আমরা এ প্রশ্নের নানা রকম ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ পাব। অতীতেও পেয়েছি। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে অর্থহীন। এই অপসংস্কৃতির গণ্ডিমুক্ত হতে না পারাটাও আমাদের অমঙ্গলের কারণ। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের হাতে যেটুকু ক্ষমতা রয়েছে, এর যথাযথ প্রয়োগ ও সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তারা যদি নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে নিষ্ঠ থাকে, তাহলে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করা যে মোটেও কঠিন কিছু নয়- এ দৃষ্টান্ত তো আমাদের দেশেই রয়েছে। যে কোনো নির্বাচনে প্রার্থীর হারজিত থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই হারজিতটা যদি স্বচ্ছতার নিরিখে কিংবা মানদণ্ডে নির্ণীত হয়, তাহলে কোনো প্রশ্ন থাকে না। নির্বাচন প্রক্রিয়া তো নির্দিষ্ট দু-একটি কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া বিস্তৃত।

আমাদের মনে আছে, এই নির্বাচন কমিশন নিজেদের ক্ষমতা হ্রাস করার ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিশন নিজেদের ক্ষমতা আরও পোক্ত করার জন্য তৎপর। এমতাবস্থায় আমাদের নির্বাচন কমিশন ক্ষমতা হ্রাসের চিন্তা করেছিল কেন? এই 'কেন' শব্দটি তখন আরও কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের অস্বচ্ছতা, নমনীয় মনোভাব, স্বচ্ছ ও প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করতে না পারা ইত্যাদি কারণে অনেক বিরূপতার মুখোমুখি দেশ-জাতিকে হতে হয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনীতি, ভিন্ন মতাবলম্বীদের অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও আমাদের দেশে কম ক্ষত সৃষ্টি হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা নানা মহলের তাগিদ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কখনোই দেখা যায়নি। সুশাসন নিশ্চিতকল্পে যা যা করণীয়, সেসব বিষয় কথার কথা হয়ে থাকলে চলবে কী করে? আর্থিক ও নির্বাচনী অনিয়মের ব্যাপারে কমিশনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর যথাযথ ব্যবস্থায় নিষ্পত্তি হবে- এটাই প্রত্যাশা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

আরও পড়ুন

×