ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

দিবস

সবাই তো ভালোবাসা চায়

সবাই তো ভালোবাসা চায়
×

সুদীপ্ত সাইফুল

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৪:৫৭

চারদিকে সবকিছু কেমন বদলে গেছে। নতুন রূপে সেজেছে প্রকৃতি। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে বাগান। দেহ-মনে অদ্ভুত এক শিহরণ। হঠাৎ এতসব পরিবর্তনের একটিই কারণ, ফাগুনের আগমন। কবিগুরুর ভাষায় 'আজি দখিন-দুয়ার খোলা-/এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো...। আজ খ্রিষ্টীয় বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি, অভিষেক ঘটল ফাগুনেরও। সে হিসাবেই আজ উদযাপিত হচ্ছে বসন্ত উৎসব এবং ভালোবাসা দিবস।

ভালোবাসা হলো স্বার্থপরহীনতা, বন্ধুত্ব, মিলন ও বন্ধন। ভালোবাসা অপ্রতিরোধ্য শক্তি, যা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও থাকে অটল। ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত একটি আবেদন, দুরন্ত মানবিক অনুভূতি। ভালোবাসা না থাকলে পরিবার-সমাজ কিংবা সংসার কোনোটিই গড়ে উঠত না। ভালোবাসার সন্ধান মেলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ সর্বত্রই। ভালোবাসা চিরন্তন, অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে সব বয়সের সব শ্রেণির মানুষের হৃদয়ে। সবাই ভালোবাসতে চায়, ভালোবাসা পেতে চায়। ভালোবাসা হয় প্রাণে প্রাণে, প্রাণে প্রকৃতিতে। প্রাণে-বস্তুতেও ভালোবাসা হতে পারে। সে কারণেই মানুষ মানুষকে ভালোবাসার পাশাপাশি ভালোবাসে পাহাড়, নদী, সমুদ্র, সাগর, মহাসাগর, বন-বৃক্ষ, পানি, বায়ুসহ জীব-জন্তুকে। এতসব ভালোবাসার মধ্যে মানুষ মানুষে যে ভালোবাসা সেটাই কেবল পারস্পরিক। জীব-জন্তু ও প্রকৃতিকে আমরা ভালোবাসি। কারণ, সেগুলোর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আমাদের যেমন আকৃষ্ট করে, তেমনি আমাদের সুস্থ জীবন-জীবিকা প্রবাহেও অপরিসীম ভূমিকা রাখে।

বিশ্বব্যাপী ভালোবাসার অনেক নজির আমাদের সামনে দৃশ্যমান। সেই ভালোবাসা যেমন ছিল প্রিয়তমাকে ঘিরে তেমনি ছিল দেশ, ভাষাকে কেন্দ্র করেও। ১৯৫২ ও ১৯৭১ সালে বাংলা ভাষা ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বাঙালি জাতি তাদের সর্বোচ্চ প্রেম, ভালোবাসা ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত রেখেছে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতা ঢাকার রাজপথে আন্দোলনে নেমেছিল দেশকে ভালোবেসে। সেদিন আন্দোলনকারীদের অনেকেই হতাহতের শিকার হন। এরপর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। ভালোবাসা দিবসের দিনে ভালোবাসার বাস্তব নিদর্শন 'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস' পালনে যেন অবহেলা না করি।

সর্বজনীন ভালোবাসার ব্যাপ্তি সারাবছর, সারাদিন। ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভালোবাসা দিবস হিসেবে বিশ্ববাসী বেছে নিয়েছে তাদের ভালোবাসার বহুমাত্রিক রূপ প্রকাশের জন্য। দুনিয়াজুড়ে ভালোবাসা দিবসকে অত্যন্ত আগ্রহ ও আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও জাঁকজমকভাবে উদযাপিত হয় দিবসটি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে দিবসটি খুবই কাঙ্ক্ষিত। এ দিনে তারা ভালোবাসার মানুষকে প্রেম নিবেদন করে। সারাবছর জমিয়ে রাখা অব্যক্ত কথাগুলো ভাগাভাগি করে প্রিয় মানুষের সঙ্গে। অনেকেই পরিবার, বন্ধু ও স্বজনের কাছে তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটান আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়ায়।

ভালোবাসা দিবসে ভালোবাসা প্রকাশে কর্মসূচি আর আনুষ্ঠানিকতার শেষ নেই। এসব আনুষ্ঠানিকতার সিংহভাগের আয়োজক তরুণ-তরুণীরা। উদ্দেশ্য থাকে পছন্দের মানুষকে প্রেম নিবেদন। রীতিমতো ভালোবাসা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা দেখা যায় তরুণদের মাঝে। সেই ভালোবাসা কেবল যেন প্রেমিক বা প্রেমিকার জন্য যত্ন করে রাখা। প্রাণবৈচিত্র্য তো দূরের কথা, বাবা-মা, বন্ধু-স্বজনকেও যেন ভালোবাসার সুযোগ, সময় বা সামর্থ্য নেই। ফলে ভালোবাসার মতো সর্বজনীন হয়ে উঠছে না 'ভালোবাসা দিবস'। এতসব আনুষ্ঠানিকতা ও কর্মসূচি ভালোবাসার ব্যাপকতায় খুব বেশি প্রভাব ফেলছে না। ফলে পরিবার-সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে মানুষ। কাউকে ভালোবাসার অন্যতম মাপকাঠি হলো তাকে সম্মান জানানো বা তার সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা। কিন্তু ক্রমেই সমাজ থেকে পারস্পরিক সম্মান-শ্রদ্ধাবোধের মতো সুসংস্কৃতিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাড়ছে কলহ, প্রাণহানি, প্রতারণা কিংবা স্বার্থপরতা।

ভালোবাসা দিবস নিঃসন্দেহে একটি ভালো উপলক্ষ, খুবই ভালো একটি দিন। তবে দিবসটি একপক্ষীয়ভাবে উদযাপন না করে যদি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিশ্রুতিশীলতার সঙ্গে উদযাপন করা হয় তাহলে তা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে। বছরের এই নির্দিষ্ট দিনে মানুষ তাদের পরিচিত-অপরিচিত বন্ধু-স্বজনদের প্রতি আনুষ্ঠানিক ভালোবাসা প্রদর্শনের পাশাপাশি যদি ভালোবাসার এই নিদর্শনগুলো গোটা বছর বহন করে তাহলে দিবসটি আরও অর্থবহ যেমন হবে, তেমনি সমাজ ভাঙনের বিষক্রিয়া থেকেও আমাদের মুক্তি মিলবে। এই প্রত্যাশায় সকলকে জানাই ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা 'হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে'।

সাংবাদিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×