ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

শ্রীলঙ্কার সংকট থেকে বাংলাদেশের শিক্ষণীয়

শ্রীলঙ্কার সংকট থেকে বাংলাদেশের শিক্ষণীয়
×

মো. আইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০

তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে কঠিন এক সময় অতিক্রম করছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে এখন শুধুই হাহাকার। জ্বালানি তেল, খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ কেনার জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে সাধারণ মানুষ। ৭৪ বছর আগে ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কখনও এতটা দুরবস্থায় পড়েনি দেশটি।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বর্তমান দুরবস্থার পেছনে মোটা দাগে ছয়টি কারণ চিহ্নিত করা যায়, যা থেকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নকামী দেশগুলোর অনেক কিছু শেখার আছে। শ্রীলঙ্কার এ অবস্থার জন্য মূলত দায়ী- দেশটির অদূরদর্শী ও অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প গ্রহণ, বিপুল বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ, ঋণ পরিশোধে বেহাল অবস্থা, কর কমানো, পর্যটন ও প্রবাসী আয়ে ভাটা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অর্গানিক চাষের প্রবর্তন এবং এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা।
প্রথমত, ১৫ বছর ধরে শ্রীলঙ্কা বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের কাজ করছে, যার মধ্যে রয়েছে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, সড়কসহ আরও নানা ধরনের প্রকল্প। চীনের সঙ্গে মিলে রাজধানী কলম্বোর কাছে সমুদ্র থেকে ভূমি উদ্ধার করে কলম্বো পোর্ট সিটি নামে আরেকটি শহর গড়ে তোলা হচ্ছে, যার কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ২৫ বছর এবং বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। বলা হয়, হংকং, দুবাই ও সিঙ্গাপুরকে টেক্কা দিতেই নতুন এ শহর নির্মাণ করা হচ্ছে। দেশটির বিশ্নেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে এসব প্রকল্প লাভজনক নয়।
দ্বিতীয়ত, ঋণের ভারে জর্জরিত শ্রীলঙ্কার বতর্মান এ সমস্যা রাতারাতি তৈরি হয়নি। ১৫ বছর ধরে এ সমস্যা পুঞ্জীভূত। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে দেদার ঋণ নিয়েছে দেশটির সরকার, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সার্বভৌম বন্ড। ২০০৭ সাল থেকে দেশটির সরকার অর্থ সংস্থানের জন্য সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করছে। মূলত একটি দেশের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। শ্রীলঙ্কার ঋণের হার এখন জিডিপির ১১৯ শতাংশ।
এর মানে হচ্ছে, দেশটি সব মিলিয়ে এক বছরে যে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে, তার তুলনায় ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি।
তৃতীয়ত, চলতি বছর শ্রীলঙ্কাকে অন্তত ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণ ও ১ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড (আইএসবি) পরিশোধ করতে হবে। দেশটির গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছর এই পরিমাণ ঋণ কোনোভাবেই শোধ করতে পারবে না তারা। কারণ, তাদের হাতেই আছে মাত্র ২৩১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। সুতরাং ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, জনগণের দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা মেটাতে নতুন করে আরও ঋণ নিতে হচ্ছে।
চতুর্থত, কর কমানো। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ক্ষমতায় আসার পর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ করেন। ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর পেছনে যুক্তি ছিল অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার। ২০০৯ সালে তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের বড় ভাই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে (সদ্যবিলুপ্ত মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী) একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এতে তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে গতিও এসেছিল। সে আলোকে বর্তমান প্রেসিডেন্টও কর কমান। কিন্তু বৈদেশিক ঋণের ভার আর করোনা মহামারি দেশটির সব হিসাবনিকাশই উল্টে দেয়। কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শ্রীমাল আবিরত্নে বলেন, আয়কর ও ভ্যাট কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় এক লাফে ২৫ শতাংশ কমে যায়। বাজেটের অর্থ জোগান দিতে বাধ্য হয়ে সরকার বিভিন্ন সূত্র থেকে আরও ঋণ নিতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও অতিরিক্ত টাকা (শ্রীলঙ্কান রুপি) ছাপতে শুরু করে।
পঞ্চমত, পর্যটন ও রেমিট্যান্স খাতে বিপর্যয়। অধ্যাপক শ্রীমাল আবিরত্নে বলেন, করোনাভাইরাস শুরুর আগে পর্যটন এবং রেমিট্যান্স থেকে দেশটির ১২ বিলিয়ন ডলার আয় হতো। মহামারির কারণে প্রায় দুই বছর ধরে পর্যটন শিল্পের কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে আছে, যা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেকটি বড় খাত বিভিন্ন দেশে কমর্রত নাগরিকদের পাঠানো ডলার। কিন্তু মহামারির পর থেকে রেমিট্যান্সও ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া ষষ্ঠ কারণটি হচ্ছে জৈব বা অর্গানিক সারের পক্ষের লবিস্ট গ্রুপের পরামর্শ। এই গ্রুপের পরামর্শে গোটাবায়া রাজাপাকসে ২০২১ সালের মে মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ কমাতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক আমদানি নিষিদ্ধ করেন। এতে ফসলের উৎপাদন কমে যায়। চালের উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে যায়। উপায়ান্তর না দেখে এক সময়ের চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্রীলঙ্কা দ্রুত ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের চাল আমদানি করতে বাধ্য হয়। অর্গানিক কৃষির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশটির চা উৎপাদনেও। চা রপ্তানি করে শ্রীলঙ্কা সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। অবস্থা বেগতিক দেখে এ খাতের কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার ২০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দেয়। ততদিনে দেশজুড়ে খাদ্য ঘাটতিও প্রকট রূপ নিয়েছে।
এদিকে ২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার আগে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া শ্রীলঙ্কার করুণ এ পরিস্থিতি দেখে বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের আশঙ্কা- তারাও বুঝি একই দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে অন্যান্য দেশের প্রসঙ্গ না তুলে বলা যায়, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির কাঠামো একেবারেই আলাদা। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় বাড়ছে; কৃষি ভালো করছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রেকর্ড পরিমাণ রিজার্ভও রয়েছে। তা ছাড়া রপ্তানিও দিন দিন বাড়ছে। অর্থনীতিতে বিদ্যমান ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতিতে পড়ার শঙ্কা নেই।
তবে যে কোনো ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল বিষয়ই হলো, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের যতটুকু সম্পদ রয়েছে, তার যথার্থ ব্যবহারই কেবল এ ধরনের অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে দূরে রাখতে পারে।
ড. মো. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জবি এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

আরও পড়ুন

×