ব্যাংক খাত
ঋণখেলাপিদের আর কত ছাড়?
মো. আইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২২ | ১২:০০
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে অফিস শুরু করার পাঁচ কার্যদিবসের মাথায় আব্দুর রউফ তালুকদার খেলাপি ঋণ ঠেকাতে গণছাড়ের ঘোষণা দিয়ে এক নির্দেশনা জারি করেছেন, যেখানে ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে চারবার ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বড় পর্দায় দেখলে, এতে একজন ঋণখেলাপি ঘুরে-ফিরে সর্বোচ্চ ২৯ বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবেন।
নির্দেশনার ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, গণছাড় নয়; খেলাপি ঋণ কমাতেই পুনঃতপশিলের নীতি শিথিল করে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো ও পেমেন্ট কমানো হয়েছে। আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমবে।
খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে এখন আড়াই থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ অর্থ জমা দিলেই চলবে, যা আগে ছিল ১০ থেকে ৩০ শতাংশ। পাশাপাশি এসব ঋণ পাঁচ থেকে আট বছরে পরিশোধ করা যাবে, যা আগে ছিল সর্বোচ্চ দুই বছর। অধিকন্তু নতুন করে ঋণও পাওয়া যাবে। আর খেলাপি ঋণে কী সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকবে। আগে তা অনুমোদন দিতেন গভর্নর নিজে। অর্থাৎ নতুন গভর্নর তাঁর দায়িত্ব হালকা করে ক্ষমতার পুরোটাই ব্যাংকগুলোর হাতে তুলে দিয়েছেন।
বিশ্নেষকরা বলছেন, নতুন নীতিমালার কারণে ব্যাংকের ঋণ আদায় আরও কঠিন হবে; তারল্য ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দেবে; বাড়বে আমানতের সুদ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যাংকগুলো অন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণ মন্থর হয়ে পড়বে; বিনিয়োগ কমে যাবে এবং ব্যাংকগুলোর ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
কালো টাকা, ঋণখেলাপি, দুর্নীতি, সুশাসনহীনতা যে কোনো দেশের ভাবমূর্তির জন্য বিপজ্জনক। সরকার তাই এসবের চিত্র ভালো রাখতে নানাভাবে উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনঃতপশিলের নতুন সিদ্ধান্ত এ রকমই এক উদ্যোগ। ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। এই ধারা চলতে থাকলে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাড়তি খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যাবে।
করোনায় ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে ঋণ পরিশোধে ছাড় দিয়েছিলেন সাবেক গভর্নর ফজলে কবিরও। সে সুযোগে ব্যবসায়ীরা ঋণ শোধ না করে দুই বছর ব্যাংকের খাতায় ছিলেন ভালো গ্রাহক। ভালো গ্রাহকের ভাবমূর্তি নিয়ে তাঁরা ব্যাংক থেকে আরও ঋণ নিয়েছেন। ওই সুবিধা উঠে যাওয়ার পর সামর্থ্য থাকলেও তাঁরা অভ্যাসবশত ঋণ শোধ করেননি। তাই নতুন ঋণ পেতে তাঁদের সমস্যা হচ্ছিল। ঋণ পুনঃতপশিলের নতুন নির্দেশনায় খেলাপি ঋণের চিত্র অবস্থাদৃষ্টে আগের চেয়ে ভালো হবে। তবে ব্যবসায়ীদের চাপে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে শুধু ব্যবসায়ীরাই লাভবান হবেন; ব্যাংকের জন্য নতুন সংকটের সৃষ্টি হবে।
সচরাচর বিদেশি ব্যাংক ও ঋণদাতা সংস্থাগুলো ঋণসংক্রান্ত এসব ছাড় ভালোভাবে নেয় না। কিন্তু আইএমএফের উচ্চক্ষমতাধর এক প্রতিনিধি দলের সফরের মাঝপথে বাংলাদেশের গভর্নরের এই ঘোষণায় এটাই প্রতীয়মান- হয় দুই পক্ষের মধ্যে আগেই বোঝপড়া হয়েছে, নয়তো রিজার্ভ কমে যাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার প্রয়োজন নেই।
বৈশ্বিক মহামন্দার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্রগুলোয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির জোয়ার চলছে। সে কারণে দুর্নীতি, কালো টাকা ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দেশে দেশে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে এই কঠোর হওয়ার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সুফলও পাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক দেশ চীনে খেলাপি ঋণের হার কমে ১ দশমিক ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। মালয়েশিয়ায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ ও ফিলিপাইনে রয়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যে। ৩ শতাংশের নিচে খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন উল্লেখযোগ্য দেশের মধ্যে ভিয়েতনাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ, থাইল্যান্ড ২ দশমিক ৯ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ২ দশমিক ৯ শতাংশ, কম্বোডিয়া ২ দশমিক ৫ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কা ২ দশমিক ৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে অবস্থান নিয়েছে। অথচ দেউলিয়া আতঙ্কে থাকা পাকিস্তানে খেলাপি ঋণ ৯ দশমিক ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১১ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে টাকার অঙ্কে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা এবং ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। তবে নিরপেক্ষ বিশ্নেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আরও বেশি। প্রকৃত হিসাব করলে এর পরিমাণ সরকারি হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ হবে। 
আগের নিয়মে খেলাপি মেয়াদি ঋণ নিয়মিত হলে তা পরিশোধে ৯ থেকে ২৪ মাস সময় দেওয়া হতো। নতুন নীতিমালায় ১০০ কোটি টাকার কম ঋণে ৬ বছর, ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণে ৭ বছর ও ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধে ৮ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়া যাবে। বিশেষ এসব সুবিধা নিয়ে যেসব ঋণখেলাপি নিয়মিত হবেন, তাঁরা ব্যাংক থেকে আবারও ঋণ নিতে পারবেন। এ জন্য তাঁদের বকেয়া ঋণের ৩ শতাংশ জমা দিলেই চলবে, আগে যা ছিল ১৫ শতাংশ। যেসব মেয়াদি ঋণ নিয়মিত রয়েছে, তাও নতুন করে পুনর্গঠন করা যাবে। এতে বিদ্যমান মেয়াদের অবশিষ্টের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সময় বাড়ানো যাবে, যা আগে ছিল ২৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী ঋণখেলাপিরা এখন উন্নয়নের দুশমন হিসেবে পরিচিত। তাই তাঁদের আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বয়কট করা হচ্ছে। তৃতীয় বিশ্ব, উন্নয়শীল এবং উন্নত রাষ্ট্রে উন্নয়ন-গতি ধরে রাখতে ঋণখেলাপিদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বয়কটের জন্য জোরালো আওয়াজ উঠেছে। জনকল্যাণকামী কোনো সরকারই তাঁদের বিন্দুমাত্র ছাড় দিচ্ছে না। আর্থসামাজিক-রাজনৈতিকভাবে ঋণখেলাপিদের একঘরে করে ফেলা হচ্ছে।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনঃতপশিল সংক্রান্ত উদ্যোগকে পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য বলা না গেলেও দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান এভাবে হবে না- তা হলফ করেই বলা যায়। কারণ, এ রকম উদ্যোগ অতীতেও অনেক নেওয়া হয়েছে। কাজের কাজ কিছু হয়নি।
ড. মো. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি
- বিষয় :
- ব্যাংক খাত
- ঋণখেলাপি
- মো. আইনুল ইসলাম
